চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঠিক সেদিনের মতোই রাস্তার দু’ধারে শিশুরা দাঁড়িয়ে আছে

৮০ দশকের শেষ ভাগের কথা। আমি থ্রি কি ফোরে পড়ি ঢাকা ক্যান্ট বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি স্কুলে। চৈত্র মাস ছিলো কিনা তা ঠিক মনে নেই তবে আজকের মতোই তীব্র গরম ছিলো। সকালে স্কুলেই গিয়েই দেখলাম সব কিছু একটু অন্যরকম। স্যার ম্যাডামরা সবাই বেশ পরিপাটি হয়ে এসেছেন। ক্লাস হবে না, হবে না একটা ভাব। ভেতরে শীতল আনন্দ বন্যা বয়ে গেলো। রোজকার নিয়মে কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হলো অ্যাসেম্বলি। আমাদের হেড স্যার সাধারণত এ সময়ে উপস্থিত থাকেন না। সেদিন ছিলেন। জাতীয় সংগীত ও শপথ পাঠ শেষে তিনি জাতীয় পতাকার জন্য নির্ধারিত উঁচু জায়গাটিতে দাঁড়ালেন। আমাদের আর বোঝার বাকী রইলো না যে আজ বিশেষ একটি দিন। কারণ কেবলমাত্র বিশেষ দিনেই তিনি ওই যায়গায় দাঁড়ান। তাঁর দীর্ঘ আবেগঘন বক্তৃতা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পল্লীবন্ধু মেজর জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের স্কুলে সামনের পথ দিয়ে যাবেন। যাওয়ার পথে কিছুটা সময় তিনি আমাদের সাথে কাটাবেন।

কোনভাবেই ডিসিপ্লিন ভাঙা যাবে না। আমাদের এখন থেকেই সে প্রস্তুতি নিতে হবে। অ্যাসেম্বিলি ভেঙে গেলে আমরা ছুটাছুটি শুরু করলাম মাঠে। পিটি স্যার ক্ষিপ্ত হয়ে বেত্রাঘাত শুরু করলেন। ভয়ে কিছুটা শান্ত হলাম। এবার আমাদের দুই হাতে ধরিয়ে দেয়া হলও চিকন বাঁশের কঞ্চিতে কাগজের লাল সবুজ পতাকা। আমি প্রথম সুযোগে তাড়াহুড়োই নিতে গিয়ে হাত কেটে ফেললাম। পিটি স্যার বড়ই বিরক্ত হয়ে আমার পশ্চাদেশে দিলেন দু ঘা কশিয়ে। আমি দিলাম ছুট। ততক্ষণে সূর্য মাথার ওপরে চড়ে বসেছে। আমাদের সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো হলও স্কুলের সামনের রাস্তার দুই ধারে। কিছুক্ষণ পরপর রিহার্সাল দিতে লাগলাম প্রেসিডেন্ট মহাদয় আসলে কিভাবে পতাকা নাড়াতে হবে। একই সাথে গাইতে হবে  ‘নতুন বাংলাদেশ গড়বো মোরা নতুন করে আজ শপথ নিলাম’ এটি প্রেসিডেন্টের নিজের লেখা গান। কোন ভাবেই ভুল করা চলবে না। আমরা প্রতি আধাঘণ্টা পরপর প্রেকটিক্স করতে লাগলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। দরদর কমে ঘাম পড়তে লাগলো। কেউ কেউ ক্লান্ত হয়ে বসে পড়তে চাইলেই পিটি স্যার তেড়ে আসতে লাগলেন। এর মধ্যে এক মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লো। তাকে দ্রুত স্কুলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলও। এবার হেড স্যারকেও বেশ চিন্তিত মনে হলও। দুপুর গড়িয়ে গেলো । হেড স্যার বোর্ড অফিসের লোকের সাথে কানাঘুষা করতে লাগলেন। হটাৎ সাড়ে তিনটার দিকে বিকট শব্দে সাইরেন বাজতে লাগলো। আমরা সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। তুমুল বেগে পতাকা নাড়তে লাগলাম আর গাইতে লাগলাম নতুন বাংলাদেশ গড়বো মোরা। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেলো গাড়ি বহর। আমি এক পলক দেখলাম . রোদ চশমা পড়া ধবধবে ফর্সা একজন গাড়ির ভেতর থেকে হাত নাড়ছেন। কিছুক্ষণ পরে হেডস্যার জানালেন প্রেসিডেন্ট জরুরি কাছে আজ সময় দিতে পারেননি । তবে উনি ভবিষ্যতে আসবেন বলে কথা দিয়েছেন। তবে বাচ্চারা কেউ যাবে না, তোমাদের জন্য বিরয়ানির ব্যবস্থা আছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আমি দু’গাল খেয়ে আর খেতে পারলাম না। গরমে কেমন জানি খাবারটা নষ্ট নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। বাসায় চলে গেলাম। সেদিন রাতেই আমার প্রচণ্ড জ্বর আর বমি হলো। মা, আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগলেন। আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা প্রেসিডেন্টের গুষ্টি উদ্ধার করতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, “বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে দেশের আজ এই অবস্থা হতো না। ছোট ছোট বাচ্চাদের সারাদিন রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখে, এরা কি মানুষ!” ইত্যাদি ইত্যাদি….. মা বললেন আমি আর আমার ছেলেকে এই স্কুলেই পড়াবো না। এভাবেই দু তিন দিন গেলো। আমি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলাম। আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসলো।

আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার সময় আমাদের দরিদ্র রাষ্ট্র ছিলো। এখন আমরা স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছি। আজ সেই উৎসবই চলছে গোটা দেশে। সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছি এক ধরনের অহংকার বুকে নিয়ে যে আমরা আর কারো দয়ায় চলি না। কিন্তু বড় রাস্তায় এসে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। রাস্তার দু ধারে শিশুরা দাঁড়িয়ে আছে সেদিনের সেই আমার মতো করে। আজও ঠিক সেদিনের মতোই তীব্র গরম!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)