চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

টি-টুয়েন্টি ঈদ

প্রবাসে ঈদ কেমন করেন আপনারা?

এই প্রশ্ন জীবনে বহুবার শুনেছি দেশের মানুষের মুখ থেকে। আজ যেহেতু কোরবানির ঈদ- রোজার ঈদের কথা না-ই বললাম এই লেখায়। উন্নত বা পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানের অভাব নাই। আমি যেখানে আছি সেখানে মানে কানাডার মন্ট্রিয়লে প্রতি বিশ-বাইশ জনে একজন মুসলমান পাওয়া যাবে। এটা কোনো পরিসংখ্যান না। কাছাকাছি অনুমান।

Reneta June

যদিও গড়ে সারা কানাডায় প্রতি পঁয়ত্রিশ জনে একজন মুসলমান (কানাডার লোকসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির কিছু বেশি, যার মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী দশ লাখের মতো)। মুসলিম সম্প্রদায়ের এই মানুষেরা এখানে এসে বসতি গড়েছে সারা বিশ্ব থেকে।

বিজ্ঞাপন

এদেশে বাংলাদেশি মুসলমান যেমন আছে, আছে ভারত-পাকিস্তান, ইথিওপিয়া-সুদানেরও। আলজেরিয়া-মরক্কো’র মুসলমান দেখবেন সর্বত্র। পাবেন বহু বসনিয়ান। এমনকি ইন্দোনেশিয়ান, মালয়েশিয়ান। আফ্রিকার ঘানা, নাইজেরিয়ার মুসলমান তো আছেই যত্রতত্র ,আছে ওই মহাদেশের প্রায় সব দেশের মানুষ। এমনকি চাদ থেকেও মুসলমানরা এসে ঘাঁটি গেড়েছে এখানে। খেয়াল করবেন, যে চাদের কথা লিখলাম তাতে চয়ের উপরে চন্দ্রবিন্দু নাই! এইদেশের নাম তো সচরাচর শোনা হয় না আমাদের, তাই একটু মজা করলাম!

এখানকার ঈদটা দ্রুত আসে দ্রুত চলে যায়। অনেকটা টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের মতো। ছুটি নাই বলে কথা। এদেশে ঈদের দিন অবশ্যই সরকারি ছুটির দিন না। যদি শনি-রবিবার ঈদ পড়ে যায় তাহলে বেশিরভাগ মানুষ লম্বা সময় নিয়ে ঈদ করতে পারে।

এই দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, বেশিরভাগ কল-কারখানা বন্ধ থাকে। কিন্তু সাতদিনই খোলা থাকে এমন সরাসরি পাবলিক বা কাস্টমার সার্ভিসে যেমন রেস্টুরেন্ট, দোকানপাটে যারা কাজ করেন তাদের জন্য শনি, রবি ছুটি পাওয়া খুব কঠিন।

এদের অনেকেই ঈদ করতে পারেন না উইকেন্ডে ঈদ পড়লে। এই ওয়ার্কারদের ছুটির দিন সাধারণত সোম বা মঙ্গলবার। যাদের দুপুর বা বিকাল থেকে চাকরিতে ঢুকতে হয় তারা কোনরকমে সকালে ঈদের জামাতটা সেরে ফেলেন, তারপর নাকে-মুখে কিছু গিলে ছুট।

কাজ থেকে মাঝরাতে ফিরে এসে ঈদের কিইবা বাকি থাকে আর! ঈদের দিন ছুটি না থাকলে অনেকে আবার এক, দুই বা তিনদিন পরে নিজের ছুটির দিনে তা শিফট করে ফেলেন! সেদিন নিজের পরিবারকে নিয়ে কয়েক পরিবারকে দাওয়াত দিয়ে এনে উৎসব করেন। আর যা-ই হোক এটাকে কি ঈদ বলা যাবে?

কেউ কেউ ছুটি যে নেন না বা ছুটি নিতে পারেন না- তাও না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছুটি নেওয়া হয়ে যায় ব্যক্তিটির জন্য উইদাউট পে’ ডে। বেতন কাটা! তবে যারা কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন অনেক বছর তাদের খুব একটা সমস্যা হয় না ছুটি নিতে। কাজে না গিয়েও বেতন পেতে সমস্যা হয় না। উচ্চপদস্থ হলে তো কথাই নাই।

এখানে যেহেতু রাষ্ট্রের ধর্মীয় উৎসব বলতে ক্রিসমাস ডে, ছুটি ও উৎসব ভাতা ওই দিন বরাদ্দ থাকে ফুলটাইম চাকরিজীবিদের জন্য।

কিন্তু, বাংলাদেশে যেমন ঈদ-উল-আজহাকে তিনদিন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারবেন (টিভি দর্শক হলে সাতদিনেও শেষ হবে না!) এখানে তার উপায় নাই। একদিন গরহাজির থাকলেও পরের দিন ফিরতে হবে চাকরিতে, স্কুল-কলেজে। আগের দিনের স্মৃতিচারণ করারও জো নাই কাজের চাপে।

তাও আনন্দ হয় অনেক, যতটুকু সময় পাওয়া যায়। মসজিদে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় মানুষ। মুনাজাত করে। মুলাকাত-আলিঙ্গন করে। বুকে বুক মেলায়। নতুন নতুন পোষাক পরে। মজার মজার খাওয়া খায়। একজন আরেকজনের বাসায় যায়। কেউ কেউ রাতভর পার্টি করে। ঘরে বসে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলে লাগাতার বিজ্ঞাপন দেখে। ফাঁকে ফাঁকে ঈদের বিশেষ আয়োজনও দেখে। বাংলাদেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন করে। স্কাইপে পরিবার-স্বজনকে লাইভ দেখে। ঈদ আনন্দ শেয়ার করে।

কোরবানি ঈদে দেশের মানুষের বড় একটা আনন্দের নাম ‘গরুর হাট’। ঈদের আগে হাটে হাটে ঢুঁ মারা, গরু কিনতে যাওয়া, আকাশ-পাতাল দামদর করা, তারপর কিনে নিয়ে দলবেঁধে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরার যে আনন্দ তার ছিটাফোঁটাও নাই প্রবাসে।

কানাডায় শহরের ভিতরে পশু জবাইর কোনো সুযোগই নাই, এটা বেআইনী। শহর থেকে অনেক দূরে গ্রামের ফার্মে কসাইরা গরু-ছাগল জবাই করে। শহরের মুসলমান দোকানদাররা সেখানে গিয়ে মৌলবীকে নিয়ে হালাল তরিকায় কোরবানি করে। কোরবানি দেওয়া গরু-ছাগলের মাংস শহরে নিয়ে এসে ‘অর্ডার’ দেওয়া মুসলমানদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসা হয়, কেউ কেউ মাংসের দোকানে এসে নিজের ভাগ নিয়ে যায়।

ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করে বলি। এখানে কোরবানি দিতে চাইলে স্থানীয় গ্রোসারি স্টোরে (উন্নতমানের মুদি দোকান যেখানে মাছ-মাংশও বিক্রি হয়) কয়েকদিন আগে নাম ও ডলার জমা দিয়ে আসতে হয়। তারপর দোকানীরা অর্ডার বা ভাগের পরিমাণ অনুযায়ী ফার্ম থেকে পশু কোরবানি করিয়ে নিয়ে আসে। ঈদ বা তার আগের দিন তা গ্রাহকদের হাতে পৌঁছেও দেয়। (বিদেশে যাদের পরিবার জ্ঞাতি-গোষ্ঠি অনেক বড় তাদের কেউ কেউ নিজেরাই ফার্মে গিয়ে নিজেদেরটা সেরে ফেলেন। এদের সংখ্যা অবশ্য নগণ্য )।

তার মানে কি দাঁড়ালো? যিনি বা যে পরিবারটি কোরবানি দিচ্ছেন তারা নিজেরাই জানতে পারেন না কাকে কোরবানি দিচ্ছেন তারা, প্রাণীটার স্বাস্থ্য কেমন ছিলো, গায়ের রঙই বা কি ছিলো!

কোরবানিদাতাদের জন্য অস্বস্তিকর আরেকটা ব্যাপার হলো, এত মাংস কোথায় রাখবেন! এই দেশে কাকে দিবেন মাংস! গরীব মিসকিন ফকির পাবেন কই? প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনকে দিবেন? ওদেরও তো ডিপফ্রিজ টইটুম্বুর। বাড়তি মাংস রাখার একটুও জায়গা নাই! তারপরও একজন আরেকজনের ঘরে যায়। মাংসের পোটলা দিয়ে আসে। সেই পোটলা পেয়ে কেউ আনন্দে আত্মহারা হয় না। ফ্রিজারে জোর করে ঢুকিয়ে রাখে।

তবু ঈদ তো ঈদই। কি কোরবানি দিলাম তা হয়তো দেখলাম না, একদিনের বেশি দুইদিন আনন্দ করতে পারলাম না, মাংশ বিলিয়ে গরীব-দুঃখীর সেবা করতে পারলাম না; ঈদ তো করলাম! একদিনের জন্য হলেও তো শত্রুকে বুকে টেনে নিলাম। হিংসা-দ্বেষ, দলাদলি ভুলে গিয়ে বুকে বুক মেলাতে পারলাম।