চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছোটদের হাত ধরে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়

ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। কোটি প্রাণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে আকবর আলীর দল। ব্যাট হাতে অধিনায়কের বীরত্বে ফাইনালে ১৭০ রানে লক্ষ্যে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৩ বল আগেই পৌঁছে যায় জুনিয়র টাইগাররা।

ভারত ১৭৭ রান তুললেও শেষদিকে বৃষ্টির কারণে ডাকওয়ার্থ ও লুইস মেথডে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাড়াঁয় ৪৬ ওভারে ১৭০। আকবর ৪৩ ও রাকিবুল ৯ রানে অপরাজিত থাকেন। অষ্টম উইকেট জুটিতে অবিচ্ছিন্ন থেকে তারা যোগ করেন ২৭ রান।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ জিতবে, এই আপ্তবাক্যটি উচ্চারিত হয়ে আসছিল অনেক আগে থেকেই। বড়দের ঘিরে সে স্বপ্নে আঘাত এসেছে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে অষ্টম হয়ে ফেরায়। মাশরাফী-সাকিব-মুশফিকরা হোঁচট খেলেও তরুণরা থেকেছেন কক্ষপথে। বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়েই সাউথ আফ্রিকা থেকে ফিরছে রাকিবুল-মাহমুদুল-তানজিদরা।

ফাইনালে টস জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠাতেই বিশ্বকাপ জয়ের আশার ভেলায় চড়ে বাংলাদেশ। টাইগারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ভারত ১৭৭ রানে গুটিয়ে যেতেই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার প্রতীক্ষার শুরু। ওপেনিং জুটির ৫০ রানে আশায় বুক বাধতে থাকেন সবাই।

ইমন-আকবর-তানজিদদের ব্যাট থেকে আসা একেকটি রানের যোগফলে রচিত হয় ইতিহাস। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে প্রথম শিরোপায় নাম লেখায় বাংলাদেশ। গগনবিদারী চিৎকারে ফেটে পড়ে জুনিয়র টাইগাররা। তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অনুরণন মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাংলাদেশে।

মাঝারি লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা হয় দুর্দান্ত। ওপেনিং জুটিতে চলে আসে ৫০ রান। তানজিদ হাসান তামিম ১৭ রান করে লেগস্পিনার রবি বিষ্ণোইয়ের বলে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। এ বাঁহাতি ওপেনার খেলেন ২৫ বল, মারেন দুটি চার ও একটি ছক্কা।

তানজিদ ফেরার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি মাহমুদুল হাসান জয়। বিষ্ণোইয়ের গুগলিতে বোল্ড হয়ে যান এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ননস্ট্রাইকে থাকা পারভেজ হোসেন ইমনের হ্যামস্ট্রিংয়ে টান লাগলে ছাড়তে হয় মাঠ। দারুণ খেলতে থাকা ওপেনার ২৫ রানে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে ফেরেন। একই ডেলিভারিতে দুই ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

লেগস্পিনে তেজ দেখাতে থাকেন বিষ্ণোই। পরের ওভারে এলবিডব্লিউতে তুলে নেন তৌহিদ হৃদয়ের (০) উইকেট। পরের আবার আরেক ধাক্কা। বিষ্ণোইয়ের বলে স্ট্যাম্পিং হয় যান শাহাদাত হোসেন (১)।

বিনা উইকেটে ৫০ থেকে স্কোরটা হয়ে যায় ৬৫/৪। শামিম হোসেনকে নিয়ে জুটি গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যান অধিনায়ক আকবর আলি। বাঁহাতি পেসার সুশান্ত মিশ্রর বলে শামিম ক্যাচ তুলে দিলে ভাঙে ২০ রানের জুটি। ৫ উইকেট পড়ে ৮৫ রানে।

বিজ্ঞাপন

ষষ্ঠ উইকেট জুটিও দেখাতে থাকে ভালো কিছুর আশা। দলীয় শতরান পাড়ি দিতেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন অভিষেক দাস। আগের বলে স্পিলে ক্যাচ ফসকালে জীবন পান এ ব্যাটসম্যান। পরের বলেই স্লো-বাউন্সারে হুক করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। মিশ্রর দ্বিতীয় শিকার হওয়ার আগে করেন ৫ রান। জুটিতে আসে ১৭ রান।

২৫ রানে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরা ইমন নেমে জুটি বাধেন অধিনায়কের সঙ্গে। সাবলীল ব্যাটিংয়ে আগাতে থাকেন জয়ের পথে। দলীয় সংগ্রহ দেড়শ ছোঁয়ার আগে ইমন কাভারে ক্যাচ তুলে দিলে নতুন করে জাগে শঙ্কা। ফিফটির কাছে গিয়ে সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে এ বাঁহাতি ওপেনার যখন আউট হন জয় থেকে বাংলাদেশ ৩৫ রান দূরে।

আকবর ও রাকিবুলের বীরত্বে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে জয়ের কাছে চলে যায় বাংলাদেশ। ৫৪ বলে যখন ১৫ রানের দরকার তখনই হানা দেয় বৃষ্টি। কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকায় ডাকওয়ার্থ ও লুইস মেথডে বাংলাদশের লক্ষ্য কমে হয় ১৭০।

পচেফস্ট্রুমের রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে শুরুতেই ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের চেপে ধরেন জুনিয়র টাইগাররা। উইকেট থেকে বাউন্স, মুভমেন্ট পেয়ে কাজে লাগান দারুণভাবে। বোতলবন্দী করে রাখেন দলটির টপঅর্ডারকে। ২২ গজে মূল ব্যাটসম্যানদের প্রায় সবাই ধুঁকলেও একদমই আলাদা ছিলেন যশভি জয়সাল। এ বাঁহাতি ওপেনার খেলেন ৮৮ রানের দারুণ এক ইনিংস। ১২১ বল খেলে ৮টি চার ও এক ছক্কায় সাজান ইনিংসটি।

সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন জয়সাল। টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরির আশা জাগিয়ে সাজঘরে ফেরেন ৪০তম ওভারে শরিফুল ইসলামের বলে। পরের বলেই সিদ্দেশ ভিরকে এলবিডব্লিউ করে এ বাঁহাতি পেসার জাগান হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা। স্লগের শুরুতে পরপর দুই উইকেট হারিয়ে লড়াইয়ে ফিরতে পারেনি ভারত। ১৬ বল আগেই অলআউট হয়ে যায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

ফাইনাল ম্যাচের শুরুতে ধুঁকলেও উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেয় ভারতীয়রা। শতরান পেরিয়ে যাওয়ার পর দ্রুত দুই উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। তিলক ভার্মাকে ফিরিয়ে ৯৪ রানের জুটি ভেঙেছেন পেসার তানজিম হাসান সাকিব। পরে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক প্রিয়াম গার্গকে (৭) তামিমের ক্যাচ বানান রাকিবুল।

৬.৪ ওভারে ৯ রানে প্রথম উইকেট হারানো দলটি নির্বিঘ্নেই ছুঁয়ে ফেলে তিনঅঙ্ক। ডানহাতি পেসার সাকিবের শর্ট বলে পুল করেছিলেন তিলক। ডিপ মিডউইকেটে সীমানা দড়ির কাছ থেকে লাফিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন শরিফুল। তিলক ৩৮ রান করে ফেরেন সাজঘরে।

টস জিতে আগে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত কেনো, আকবর আলীর দল সেটির প্রমাণ দেয় শুরুতেই। মাত্র ২ রান করে সাজঘরে ফিরে যান ওপেনার দিব্যনাস সাক্সেনা। এ বাঁহাতিকে ফেরান পেসার অভিষেক দাস। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা মাহমুদুল হাসানের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন দিব্যনাস। ভারতের সংগ্রহ তখন ৯ রান।

শুরুর মতোই শেষটা করেছে বাংলাদেশ। রীতিমতো ডট বলের মহড়া দিয়ে গেছেন বোলাররা। ২৮৪ ডেলিভারির মধ্যে ১৬৯টি ছিল ডট বল। তাতে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা অল্পতেই আটকে যায়। অভিষেক নিয়েছেন সর্বোচ্চ তিন উইকেট। শরিফুল ও সাকিব নেন দুটি করে উইকেট। রাকিবুল নেন একটি উইকেট। ভারতীয় দুই ব্যাটসম্যান হন রানআউট।