চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চিত্রজগতের বাইরেও রিয়াজ-ফেরদৌসের একটি জগত আছে

অ্যারিস্টটলের পলিটিকস গ্রন্থটি লেখা হয়েছে আজ থেকে দুই হাজার ৩০০ বছর (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৫-৩২২) আগে। অথচ তাঁর এ গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা আজও শেষ হয়নি। এই যেমন ধরুন আজকের প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষকে আবারও মনে করিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। কেন সে বিষয়ে একটু পরে আসছি।

অ্যারিস্টটলের বিচারে প্রতিটি নগররাষ্ট্র মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনযাপনের স্বাভাবিক সভ্য রূপ এবং সর্বোত্তম ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে মানুষের মানবিক সামর্থ্যের বাস্তবায়ন ঘটবে। মানুষ সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের এটি বিখ্যাত উক্তি ‘ম্যান ইজ অ্যা পলিটিক্যাল অ্যানিমেল’-এর তাৎপর্য হলো, ব্যক্তিমানুষ স্বভাবতই একটি রাজনৈতিক সমাজের অংশ হতে চায়, যে সমাজের লক্ষ্য সব মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলসাধন।

একজন শিল্পী নিজের মননে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে যদি তার রাজনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে তার প্রিয় প্রার্থীর জন্য ভোট চান তাতে কোন দোষের কেন হবে? একজন রিয়াজ ও একজন ফেরদৌসের চিত্রজগতের বাইরেও একটি মনোজগত আছে। সেখানে ভাল মন্দ বিচারের স্বাধীনতা আছে। মহামতি অ্যারিস্টটলের বিচারে তারা একটি সমাজে বাস করেন। সেই সমাজে বেশ কিছু রাজনৈতিক ধারা বর্তমান । তারা কোন মঙ্গল গ্রহের প্রাণীও নয়। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই ভুখণ্ডে তাদের জন্ম ও বসবাস। এবং তারা স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব।

আজকে যখন একজন মাশরাফি হয়ে উঠেন তার নিজ জেলা নড়াইলের গণমানুষের প্রতিনিধি তখন আপনার চিত্তের এত জ্বলন কেন? একজন রিয়াজ ও একজন ফেরদৌস যখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে জয়ী করে সমাজের দেশের মঙ্গল কামনা করেন, ভোট চান তখন আপনার এত হৃদয় যাতনার কারণটি কী? কিছু কিছু মানুষের কথা শুনলে মনে হয় আর যাই হোক, যত কিছুর অভাবই হোক এই ভুখণ্ডের বিচারক সমাজের কোনদিন আকাল পড়বে না। এরপরও কেন যে আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা কষ্ট করে আইন নিয়ে পড়ে, আমার মাথায় ঢুকে না!

কেউ আবার প্রশ্ন করে বসবেন না, কেন? তার আগেই উত্তর দিয়ে দেই, আমি অতিশয় ক্ষুদ্র মানুষ, আমার মাথায় অত বড় বিদ্যা প্রবেশ করে না। আর আপনাদের অতি উন্নত মস্তিষ্কের বিচার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহসও আমার নেই। আমি একজন সাদামাটা শিক্ষক। যত না শিখাই তার থেকে শিখি বেশি। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব, এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি।

গল্পটা হল, একজন আমি কী করে একজন সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব হয়ে উঠলাম তা নিয়ে। আমার ছোটবেলার কথা। প্রথম শ্রেণি থেকেই শিশু একডেমিতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম। ছবি আঁকা শিখতাম বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ, মিনা দিবস, শহীদ দিবস, বিজয় দিবস এই নানারকম উপলক্ষে প্রতিবারই সেই একই ছবি গ্রামের দৃশ্য আঁকি । জল রঙ আর পেন্সিলে। রচনা লিখি আমার গ্রাম নিয়ে। উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক করি শিক্ষা, ক্ষমতায়ন এসব নিয়ে। নিজের কথা বেশি বলা হয়ে যাচ্ছে যদিও তবু বলি, আমার বাসার লাইব্রেরীর একটা বইও আমার কিনতে হয়নি। সবই প্রতিযোগিতার পুরস্কার। আমাদের বাসার সংস্কৃতি সব সময়েই অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। আমার বাবার মুখে শুনতে শুনতে  জেনেছি ইতিহাস।

Advertisement

যাই হোক যে কথা বলছিলাম, হঠাৎ একবার শিশু একাডেমি থেকে একটা অন্যরকম প্রতিযোগিতার চিঠি এল। প্রতিযোগিতা হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণের প্রথম ১২ চরণ ভাষণ দেয়া। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। বঙ্গবন্ধুর কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা আমাদের পঠিত বিষয় হয়ে উঠেনি তখনও। কেন হয়নি তা আপনারা সবাই জানেন। চক্রান্তকারীরা ইতিহাসের সত্য-আগুনকে বহু বছর ছাই চাপা দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আগুনকে কখনোই ছাই চাপা দিয়ে রাখা যায় না। তাই ইতিহাস আবার ফিরে এসেছিল বঙ্গবন্ধু কন্যার আগমনে। আমাদের প্রজন্মের চিরতরে মিথ্যা ইতিহাস মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় বমি করে বড় হবার কথা ছিল। নব্বই এর দশকের শেষে এসে সেই পাপ মুচনের সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ফিরে আসি আবার শিশু একাডেমির বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণ প্রতিযোগিতায়। সেসময় বাবা শুক্রবার সারাদিন আমাকে দিয়ে ভাষণ মুখস্ত করালেন। তার উপর যেখানে ১২ চরণ মুখস্ত করলেই হবে আমার বাবা সেখানে প্রায় পুরো ভাষণটি মুখস্থ করালেন। সেইদিন আমার স্কুলের বাড়ির কাজ, পড়া কিছুই করতে হয়নি। এজন্য অবশ্য আনন্দের সাথে মুখস্ত করার চেস্টা করলাম।

বাবার এই চেষ্টা দেখে মা বললেন, মুখস্ত করার তো দরকার নেই। দেখে দেখেও ভাষণ দেয়া যাবে। বাবা একবারে না। বাবা বললেন, তাহলে সেটা পাঠ হবে ভাষণ নয়। প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে সেটা কোন উচ্চতা থেকে বলতে হবে, কতখানি জোর দিতে হবে কোন শব্দে তা বার বার ক্যাসেট প্লেয়ারে থামিয়ে থামিয়ে শোনালেন। অবশেষে ছোট্ট বঙ্গবন্ধু তৈরি। বিপত্তি ঘটল কোন ভিডিও না থাকায় কেবল শুনে শুনে তো ভাষণ মুখস্থ হল, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছবিতে দেখলাম তিনি তর্জনী উঁচু করে আছেন ভাষণের সময়। এখন উনি কখন, কোন কথার সাথে তর্জনী নির্দেশ করেছেন সেটা কীভাবে বুজব? এই প্রশ্ন করাতে বাবা বললেন, তুমি যখন সাদা পাঞ্জাবী আর কালো কোট পরে ভাষণ শুরু করবে তখন তোমার তর্জনী আপনা আপনিই বুঝে যাবে তার নির্দেশনা। আমি প্রথমবারের মত আয়োজিত সেই প্রতিযোগিতায় আমার জেলা থেকে প্রথম হয়েছিলাম। আমি আজও ভুলিনি সেই চমৎকার দিনটি । শিশু একাডেমি থেকে বঙ্গবন্ধুর ২টি অসাধারণ বই পেয়েছিলাম। সেই বই দুটির দাম আমার কাছে কোটি টাকা। এরপর বাবা আরো বই কিনে দিয়েছেন, আরো উপহার পেয়েছি, নিজে টাকা দিয়ে কিনেছি। কিন্তু সেই বই দুটির তুলনা হয় না।

এত কথা কেন বলেছি? বলেছি এ কারণে যে, আমাদের বাংলাদেশটি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের থেকে আলাদা। কারণ আমাদের মায়ের ভাষার জন্য রাজপথ রক্তে ঋণী হয়েছে। এ দেশের ঘাসে মাটিতে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত দাগ লেগে আছে। ২ লাখ মা বোনের সম্মান আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্ম যে চেতনায়, সে চেতনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই চেতনা নৌকার চেতনা। যে চেতনায় আমার জন্মপরিচয় সেই চেতনার প্রকাশ অবশ্যই মিনমিনে হবে না। অবশ্যই বলিষ্ঠ হবে। সে আমার পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হোক, চলচ্চিত্রের অভিনতা হোক কিংবা জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন হোক। সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব পরিচয়ের পাশাপাশি একটি জাতীয় পরিচয় আছে, সেটি হল, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে। আমি আমৃত্যু এই পরিচয়ে এদেশের ঘাসে মাঠে নিজের অস্তিত্বের কথা চিৎকার করে জানান দিতে চাই। এটি আমার রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।

আমার চিৎকার করে জানান দেয়ার সাহস আছে, কিন্তু আপনার কেন নেই? আয়নার সামনে দাঁড়ান এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন। তাহলে আর একজন মাশরাফী, একজন ফেরদৌস, একজন রিয়াজ যখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করতে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করে তখন আপনি আসলে ভীত হয়ে পড়েন। তখন আয়নায় আপনার নিজের চেহারা দেখে নিজেই ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েন। এখনো সময় আছে পাপ মোচনের। আপনার পূর্ববর্তী প্রজন্মের পাপ মোচন করুন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আস্থা রাখুন। নৌকাকে বিজয়ী করুন। বঙ্গবন্ধু কন্যাকে বিজয়ী করুন। জাতির পিতাকে বিজয়ী করুন। বাংলাদেশকে বিজয়ী করুন। জয় বাংলা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)