চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘গড়পড়তা কিছু হলে দুনিয়ায় দাম থাকে না’

‘দুঃসময়ের অন্ধকার কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তটির দ্বার খুলে দেয়।’ আপ্তবাক্যটি পুরোপুরি খেটে যায় মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের বেলায়। জাতীয় দলে তরুণ পেস-অলরাউন্ডারকে শুরুর সময়ের অন্ধকারই দেখিয়েছে আলোর পথ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে ঠিকভাবে প্রমাণ করতে না পারায় চলে গিয়েছিলেন বাইরে। সেই হতাশাই হয়েছে তার জন্য উন্নতির পাথেয়।

নতুন উপলব্ধি নিয়ে সাইফউদ্দিন করে গেছেন কঠোর পরিশ্রম। একদিন লর্ডসে খেলবেন, সে স্বপ্ন দেখেছেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আসার পরই। তিন বছর পর ইংল্যান্ডের মাটিতেই খেলে ফেললেন বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের শেষ ম্যাচটা খেলেছে ঐতিহাসিক লর্ডসে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই ম্যাচে সাইফউদ্দিন নেন ৩ উইকেট। বিশ্বকাপে ব্যাটে-বলে প্রমাণ করে আদর্শ এক পেস অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন নিজেকে!

বিজ্ঞাপন

প্রতিভাবান অলরাউন্ডারের তকমা নিয়ে ২০ বছর বয়সে বাংলাদেশ দলে এসে সাইফউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন আন্তর্জাতিক মঞ্চ কতটা কঠিন। পথচলার শুরুটা ভালো না হওয়ায় বাদও পড়েন দল থেকে। তখন মনের ভেতরে আসে ভিন্ন উপলব্ধি-গড়পড়তা খেলোয়াড় হয়ে লাভ নেই। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়ে নেমে যান নিজেকে তৈরি করতে। উন্নতির ছাপ দেখা যায় বিপিএলে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও দেখান ধারাবাহিকতা। বিশ্বকাপ দলে উঠে যায় নাম।

আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে পরে হয়ে উঠলেন দলের আস্থাভাজন একজন। বিশ্বকাপে ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকে। ব্যাটে দুটি ফিফটি, বল হাতে ১৩ উইকেট। এমন পারফরম্যান্সের পর ঘুচে গেছে আদর্শ একজন পেস অলরাউন্ডারের অভাব! বিশ্বকাপে ভালো করার আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করে সাইফউদ্দিন প্রতিনিয়ত থাকতে চান উন্নতির ধারায়। ২২ বছর বয়সী তরুণ এখন অবশ্য লড়াই করছেন চোটের সঙ্গে। যে কারণে যেতে পারেননি শ্রীলঙ্কা সফরে। সে কারণেই সাক্ষাতকার পর্বে বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ ধরেই এগোল কথার গাড়ি।

যে লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলেন সেটি কতটা পূরণ হয়েছে?
যদি ব্যক্তিগতভাবে বলেন, ভালোর তো শেষ নেই। আরও ভালো করা যেত। মিচেল স্টার্ক ২৭ উইকেট পেয়েছে। জিজ্ঞেস করলে হয়তো দেখবেন তার ক্ষুধা আরও বেশি ছিল। হয়তো ৩০ উইকেট চাওয়া ছিল। আমার মাত্র ১৩ উইকেট। তৃপ্তির কিছু নেই। যদি ১৮-২০ উইকেট পেতাম, ভালো লাগত। ব্যাটিংয়ের কথা যদি বলেন, এক-দুইটা ম্যাচে ভালো খেলেছি, কিন্তু আরও একটা ম্যাচ ভালো খেলার সুযোগ ছিল। পারিনি। যাই হোক, ভালোর তো কোনো শেষ নেই। প্রতিনিয়ত নিজেকে যত ছাড়িয়ে যাব তত ভালো খেলোয়াড় মনে হবে।

উইকেট পেয়েছেন রানও দিয়েছেন। ইকোনোমি (৭.১৮) কম হলে নিশ্চয়ই আরও ভালো লাগত…
আসলে এটা ক্রিকেট। যেটা চলে গেছে সেটা মনে রেখে লাভ নেই। আরেকটা জিনিস আমি কোন সময়ে বোলিং করেছি সেটা দেখতে হবে। পাওয়ার-প্লে আর স্লগে করেছি। কঠিন সময়ে বোলিং করেছি। যখন ব্যাটসম্যানরা কাজে লাগাতে চায় নতুন বল আর শেষ সময়ে পাঁচ ওভার। আরেকদিক থেকে হিসেবে করলে আসলে ভালো করা যায়। ভারতের বুমরাহ করেছে নতুন বলে ও ডেথ ওভারে। তার ইকোনোমি চারের (৪.৪১) কিছু উপরে। ওভাবে যদি চিন্তা করি আমার আরও ভালো করা উচিত ছিল। চেষ্টা করব ভবিষ্যতে, যখন ম্যাচ খেলব মাথায় থাকবে রান কম দিয়ে বোলিং করার। বিশেষ করে ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টিতে।

বিশ্বকাপে ভালো করার পর বাংলাদেশ দল নিশ্চয়ই চাইবে আগামীতে আপনার কাছ থেকে এমন সার্ভিস পেতে। সর্বোচ্চটাই প্রত্যাশা করবে সেটি মাথায় আছে কিনা?
সত্যি কথা বলতে সবচেয়ে বড় গর্বের ব্যাপার হল, দেশের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। যখন অনূর্ধ্ব-১৫ দলে খেলি তখন থেকেই আমার ভেতর প্রাউডনেস কাজ করে। জাতীয় দল আরও বড় একটা জায়গা। সবসময় শতভাগ চেষ্টা করি। এমন না শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচে, পাড়ার ক্রিকেট বলেন আর ঘরোয়া ক্রিকেট। কেননা এটা আমার ‍রুটি-রুজি। তাই চেষ্টা করি ভালো করার। আর জাতীয় দলের ক্ষেত্রে খুব বেশি রোমাঞ্চ কাজ করে। যদি ভালো করতে পারি, দেশকে যদি ভালো কিছু দিতে পারি, নিজের মধ্যে ভালো লাগে। পরিবার, পরিচিত মানুষেরও কাছ থেকেও প্রশংসা পাওয়া যায়। ভবিষ্যতের কথা যেটি বললেন, অবশ্যই আমার ভবিষ্যত আছে। দলের মধ্যে একজন আছে ভালো কিংবদন্তি বলা যায় সাকিব ভাই, উনি দিন দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আমরা সেটা দেখি, আসলে অনুসরণও করি। মুখে বললে তো আর হয় না, চেষ্টা করতে হয় অনেক। সাধনা করতে হয়। দেখা যাক ভবিষ্যতে কি করি।

বিজ্ঞাপন

ব্যাটে-বলে সমান পারদর্শী হলেন সাকিব আল হাসান। আপনিও তার মতো অলরাউন্ডার। দুই দিকেই অবদান রাখার যে দাবি মেটানোর ব্যাপারটা কীভাবে দেখেন?
অলরাউন্ডার হলে একটাতে খারাপ করলে আরেকটাতে প্রমাণ করার করার সুযোগ থাকে। ভারতের সঙ্গে যেমন বোলিংয়ে উইকেটহীন ছিলাম, রানও দিয়েছিলাম অনেক। চিন্তা ছিল বোলিং আজ হয়নি, ব্যাটিংয়ে কিছু করতে হবে। এসব চিন্তা মাথায় নিয়েই আসলে খেলি। চেষ্টা করি দুইদিক থেকেই অবদান রাখতে। একটাতে খারাপ করলে আরেকটাতে চেষ্টা করি। আমার ক্যারিয়ারে প্রথম উইকেট পেতে পাঁচটা ম্যাচ খেলতে হয়েছে। কারণ যখন আয়ারল্যান্ডে যাই তখনো সাত ম্যাচে আমার দুই উইকেট ছিল। ত্রিদেশীয় সিরিজ ও বিশ্বকাপ খেলে এখন আমার ২০ ম্যাচে ২৪ উইকেট। এটা ভালো ব্যাপার। উইকেট পাওয়ার অভ্যাসটা শেষ কয়েকটা ম্যাচ ধরে হচ্ছে। একজন বোলারের আত্মবিশ্বাস তখনই বাড়ে যখন নিয়মিত উইকেট পায়। আর ব্যাটিং, জাতীয় দলের ব্যাটিংটা সত্যিই খুব উপভোগ করি। বোলিংটাতে যেরকম একটু চাপ থাকে নতুন বলে ও স্লগ ওভারে। কিন্তু ব্যাটিংয়ে তেমনকিছু অনুভব করি না। খুব উপভোগ করি। টুকটাক রান করেছি। আরও করতে হবে। সেই লক্ষ্য আমার আছে।

জাতীয় দলে নিজের ভিত শক্ত করে ফেলেছেন। মিরাজ-মোসাদ্দেক-মোস্তাফিজ আগেই সেটি করেছে। আগামীতে আপনাদের মতো তরুণদের কাঁধেই বাংলাদেশকে উপরে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়বে। সে ভাবনা কাজ করে?
স্বপ্ন বড় দেখলে তার কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। যখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলি, আমাদের পরিকল্পনা ছিল, সাকিব ভাইদের একটা রেকর্ড ছিল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সেরা পাঁচে খেলার। আমরা যখন দেশের মাটিতে খেলি, শান্ত, মিরাজ, জাকির আমরা চেয়েছিলাম ওনাদের রেকর্ড ভাঙব। ফাইনাল খেলব, চ্যাম্পিয়ন হব- এমন একটা লক্ষ্য ছিল। হয়তবা সেটি হয়নি, কিন্তু তিন নম্বর দল হয়েছিলাম। সাকিব ভাইদের চেয়ে এগিয়েছিলাম। আমরাও ওই স্বপ্ন দেখি সাকিব ভাইরা অবসরের পর যে জায়গায় রেখে যাবে বাংলাদেশ দলকে, চেষ্টা থাকবে সেখান থেকে র‌্যাঙ্কিংয়ে দলকে আরও উপরে তুলতে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে বাংলাদেশ দলকে টপ ফাইভ বা থ্রি-তে দেখার। টেস্ট ক্রিকেট ও টি-টুয়েন্টিতে আরও উন্নত করার।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল ঘিরে নিজের লক্ষ্য কি ছিল?
ভারত ম্যাচ পর্যন্ত আমাদের সেমিফাইনালে যাওয়ার একটা সুযোগ ছিল। হয়তো পাকিস্তানের বিপক্ষে ওভাবে খেলতে পারিনি। বাংলাদেশ দলে আমরা যেভাবে খেলি সেভাবে খেলতে পারিনি। বিশ্বাস ছিল সেমিফাইনাল খেলব, ওই ম্যাচটা হেরে যাওয়ার পর আমাদের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। সবাই চেষ্টা করেছিল। সবার মধ্যে সেই বিশ্বাসটা দেখেছি। শেষ পর্যন্ত হয়নি।

ভারতীয় পেসারদের সামলে অসাধারণ ফিফটিটি (৫১ রানের অপরাজিত ইনিংস) ঐতিহাসিক একটা ইনিংস হতে পারতো যদি দল জিতত। এখনো কি আফসোস হয় ম্যাচটা নিয়ে?
যেটা চলে যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করি না। সামনে কি করব তা নিয়ে ভাবি। হ্যাঁ, বুমরাহ, সামি, ভুবনেশ্বরদের মতো বিশ্বমানের গতিময় বোলারদের খেলেছি সেটা বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয়। সামনে ১৪০ কিলোমিটার গতির বল খেলতে সমস্যা হবে না। এই অভিজ্ঞতা সঙ্গে করে এগিয়ে যেতে চাই। যদি সামনে সুযোগ পাই আরও ভালো করব, এই লক্ষ্য থাকবে। আসলে ক্রিকেট এমন একটা জিনিস সবাই চায় দলকে স্মরণীয় কিছু উপহার দিতে। ভারতের সঙ্গে দলকে জেতাতে পারলে হয়তো তেমন কিছুই হত। আরও অনেককিছু শেখার বাকি আছে। স্কিল যত শিখতে পারব তত সহজ হবে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার।

বোলিং আগের চেয়ে অনেক ধারালো হয়েছে। আসছে সাফল্য। উন্নতির পেছনে কোনো রহস্য আছে?
মানসিক ব্যাপার। কারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরুর দিকে একটা জড়তা কাজ করছিল, খারাপ খেললে যদি বাদ পড়ে যাই কী হবে তখন! যখন জাতীয় দলের বাইরে চলে গেলাম, আট-নয় মাসের জন্য তখন এইচপিতে (হাই-পারফরম্যান্স ক্যাম্প) অনেক পরিশ্রম করেছি। সায়মন হেলমট (হেড কোচ), জাফরুল এহসান স্যার, কয়েকজন পেস বোলিং কোচের অধীনে কাজ করেছি। তখন মনের ভেতর একটা জিনিস এসেছিল, হলে একস্ট্রা অর্ডিনারি কিছু হব। অ্যাভারেজ কিছু হলে দুনিয়ায় দাম থাকে না। সেটা শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বলেন, ব্যবসায় কিংবা চাকরিতে বলেন। মাথার ভেতর ওই জিনিসটা নিয়ে আসছি যেখানেই আমার জায়গা হবে সেখানেই সর্বোচ্চটা করব। ভয়ডরহীন থাকার মনোভাব তখনই এসেছে। বিশেষ করে এবার (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে) যখন বিপিএল খেলেছিলাম, হয়তো দেখেছেন, আন্দ্রে রাসেলকে আউট করেছি। বিপিএল আমার জন্য ভালো একটা অভিজ্ঞতা ছিল। ওখান থেকেই অভ্যাসটা হয়েছে নতুন বলে দুই ওভার, স্লগে দুই ওভার করার। ওই জিনিসটা বিশ্বকাপে কাজে লাগিয়েছি।

চোট থেকে ফিরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী?
অনুশীলন তো করতে হবে। যেহেতু দুই সপ্তাহের বেশি হল বোলিং করি না। সহজাত জিনিস থাকে কয়দিন? হার্ডওয়ার্ক থাকে চিরদিন। প্র্যাকটিস করতে হবে। যত নিয়ন্ত্রণ আসবে, তত সুফল পাব, ভালো করব।

চোখ বন্ধ করলে বিশ্বকাপের কোন মুহূর্তটি সামনে আসে?
অনূর্ধ্ব-১৯ দলে যখন আসি তখন স্বপ্ন ছিল লর্ডসে খেলার। এত তাড়াতাড়ি এই সুযোগটা পাব ভাবিনি। ফেসবুক কাভার ফটোতে একটা ছবি দেয়া আছে। মাঠে নামার আগে লর্ডসের ড্রেসিংরুমে শিশুদের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। ওরা আমাদের উইশ করছে। জানি না ছবিটা ওয়ালে কতদিন থাকবে তবে এটি আমার কাছে বিশেষ কিছু। এছাড়া ব্যালকনিতে (লর্ডসের) বসে তোলা ছবিট আর বিশেষ করে ওই মাঠে খেলা, উইকেট পাওয়া।

Bellow Post-Green View