চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘গাভী’তে চড়ে ‘উদ্ভট উটের পিঠে’ বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটির শিরোনাম ধার করা হয়েছে একজন প্রথাবিরুদ্ধ লেখক এবং একজন নিঃসঙ্গ শেরপা কবির দুটো বইয়ের নাম থেকে। আহমদ ছফা- এরশাদ সরকারের সামরিক আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কার্যকলাপ দেখে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন ‘গাভী বিত্তান্ত’।

নাগরিক কবি শামসুর রাহমান এরশাদ আমলের শেষে মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় জামায়াত ইসলামীর শক্তিশালী হওয়া ও প্রতিক্রিয়াশীলদের উল্লম্ফন নৃত্যের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বর্তমান কীর্তিকলাপে একালে তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো লিখতেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়’।

বিজ্ঞাপন

কবি আল মাহমুদ ৮০’র দশক শেষে অস্ত্রের ঝনঝনানির বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকাতদের গ্রাম বলেছিলেন। উপাচার্য চরিত্র নিয়ে বাংলা ভাষায় কমপক্ষে তিনটি উপন্যাস পাওয়া যায়। তিন উপাচার্যকে নিয়ে উপন্যাস লেখা হলেও এমন অনেকেই ছিলেন এবং আছেন এবং বর্তমানে যাদের চরিত্র নিয়ে উপন্যাস হতে পারে আরো বেশি। ‘মহব্বত আলীর একদিন’ উপন্যাসে বর্তমান উপাচার্যদের কারো নাম নেই। কিন্তু আপনি দলীয়করণ ও দুর্নীতির এবং কর্মে ফাঁকি দেয়ার উপাচার্যদের অনায়াসে নাম বসিয়ে চালিয়ে দিতে পারবেন।

লেখক আহমদ ছফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল মান্নানের কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখেছিলেন ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাস। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন আবদুল মান্নান। ছাত্রদের গোলাগুলির মাঝখানে পড়লে ‘বিশেষ যোগ্যতায়’ নিয়োগ পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উপাচার্যের গর্ভবতী গাভীটি নিহত হয়। সত্য এ ঘটনাকে উপজীব্য ধরে রচিত ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসের প্রকাশ হয় ১৯৯৫ সালে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পর গাভী উপাচার্য আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী মেয়েদের হল শামসুন্নাহারে মধ্যরাতে পুলিশ ঢুকিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন চৌধুরী ভিসি।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ না করেই এ উপন্যাসে ছফা বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির ছিল গৌরবময় অতীত। অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গোটা দেশের আত্মার সঙ্গে তুলনা করে গর্ববোধ করতেন। …অতীতের গরিমার ভার বইবার ক্ষমতা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই।’

উপন্যাসের মূল চরিত্র উপাচার্য মিঞা মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ। বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো নাম উচ্চারণ না করলেও তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের সবচাইতে প্রাচীন এবং সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়।’ আবু জুনায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ব্যক্তি হলেও নিজের ঘরে বেগম নুরুন্নাহার বানুর কাছে তিনি বড় অসহায়। শ্বশুরের টাকায় আবু জুনায়েদ লেখাপড়া করেছেন, এই খোঁটা নুরুন্নাহার বানু উঠতে বসতে তাকে দেন।

কৃষক পরিবারের সন্তান আবু জুনায়েদ নিতান্ত গোবেচারা এবং সহজ-সরল মানুষ। জমির প্রতি প্রচণ্ড লোভ। তিনি ঢাকা শহরের আশপাশে জমির দালালের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান সস্তায় জমি কেনার আশায়। আরেকটা শখ তিনি মনে মনে পোষণ করেন, সেটি হলো একটি গাভী পুষবেন। একপর্যায়ে উপাচার্য আবু জুনায়েদের জীবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ সবটাই হয়ে পড়ে গোয়ালঘরকেন্দ্রিক। এই গোয়ালঘরকে রঙ্গমঞ্চ বানিয়ে আহমদ ছফা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দৈন্যদশা এবং শিক্ষকরাজনীতির নোংরা বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের অনেক চরিত্রই পাঠকদের তাই চেনা-পরিচিত মনে হয়।

বিজ্ঞাপন

এখন যেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা এক একজন জুনায়েদ, এক একজন আল মাহমুদের ডাকাতদের গ্রামের নেতাতে পরিণত হয়েছেন। তাদের কাজ কী এ নিয়ে রীতিমতো লিখতে বাধ্য হচ্ছেন বিদগ্ধজনেরা। তাদের কাজ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত চিন্তার ধারাকে বিকশিত করা নয়। বরং নানা ধরণের বিধি-নিষেধের ঘেরাটোপে, শিক্ষার্থীদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে মুক্ত চিন্তাকে রুদ্ধ করা।

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নোটিস জারি করেছিলো টিএসসির চায়ের দোকানগুলো রাত ৮টার পর খোলা থাকবে না। কী অদ্ভুত আদেশ। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতের নিয়ন আলোয় শিক্ষার্থীরা মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়িয়ে কবিতা, গানের চর্চা করেন। ৫ টাকার চা পান করতে করতে যেখানে দেশ বদলে যাওয়া আন্দোলনের জন্ম হয়। সেখানে টিএসসিকে রাত ৮ টায় মধ্যযুগীয় আঁধারে পাঠাতে চায় প্রশাসন। সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত এই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিষয় পড়ানো হয়। ওম্যান অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিস তার নাম। সেখানে নারী শরীরকে পড়ানো হয়। শরীরকে ছাড়িয়ে চিন্তা করতে শেখানোর জন্য এই পাঠ। এক শিক্ষক এ বিষয় পড়িয়ে রীতিমতো নাকানি চুবানি খেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন বললেন, কেনো এসব অশ্লীল বিষয পড়াতে হবে। কী অদ্ভূত অশ্লীলতার সংজ্ঞা। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গর্বের কিছু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ‘১০ টাকায় চা-সমুচা সিংগারা পাওয়া যায়’ বলে রীতিমতো হাস্যস্পদ ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের যখন এই অবস্থা তখন অন্যান্যগুলো সহজেই অনুমেয়।

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য রীতিমতো শিক্ষার্থীদের সথে যুদ্ধ ঘোষণা করেন গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ক্ষমতাবান ছাত্রসংগঠনের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে ক্ষেতে নামালেন। কী দারুণ গাভী কাণ্ড!!

আরেক উপাচার্য রংপুরের নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও ঠিকই ঢাকা শহরে সেমিনার সিম্পোজিয়ামে বিচিত্র নীতিবাক্য আওড়ে বেড়ান।

আমার এক বন্ধু দেশের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। শুধু ফেসবুকে ভিসির কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করে ন্যায্য প্রমোশন বঞ্চিত হলেন। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষককে রীতিমতো জেলে পাঠালেন তার কলিগরাই। এতটা অন্ধ দলবাজ আর লোভের বৃত্তে আটকে গেছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। 

কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক প্রফেসর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যে ভেজালের উপস্থিতি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলেন। জাতি তার এই গবেষণার জন্য বাহবা দিলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আমলারা দারুণ ক্ষেপেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূত ভাষায় চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন। নিজ শিক্ষককের গবেষণাকে স্বীকার করেনি ঐ শিক্ষকের বিভাগ। তারা ঐ গবেষণার দায় নিতে চান না। কী অদ্ভূত মেরুদণ্ডহীন বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার বিভাগ। তারা বুঝতেই পারেনি গবেষক শিক্ষককে নয়, ঐ চিঠিতে চপেটাঘাত করা হয়েছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষককে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে মুক্ত চিন্তার চর্চা করতে পারে সেই জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেক ভালোবাসা দিয়ে ১৯৭৩ অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন যেখানে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। অথচ মাত্র ৪৫ বছরে ‘গাভী’ উপাচার্যদের ভারে কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মৃত্যু হলো। দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন জ্ঞান ও গবেষণার উপর জোর দিচ্ছেন, তখন উপাচার্যরা উল্টো রথ টেনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান বলা বাহুল্য?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View