চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গাঁজার আছর কার ওপর, অর্থমন্ত্রী নাকি গণমাধ্যমকর্মীর?

কানে হাত দেন, চিলের পেছনে ছোটা বন্ধ করেন। গণমাধ্যমের একজন কর্মী হিসেবে সহকর্মীদের উদ্দেশে বিনীত অনুরোধ। জানি কেউ বিরাগভাজন হতে পারেন। চলেন আত্নসমালোচনার ঝুঁকিটা নিয়েই ফেলি।

বিজ্ঞাপন

ধান ভানতে শিবের গীত বন্ধ। কাজের কথায় আসি। বলছি, গেলো কয়েকদিনে প্রথম সারির সংবাদপত্র, অনলাইন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বাংলা বিভাগের একটি খবর এবং মতামতের বিষয়ে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বরাত দিয়ে অনেকেই লিখেছেন  ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কানাডার সমান’। বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ প্রবন্ধ লিখেছেন। এমনকি হাসি তামাশাও চলছে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অর্থমন্ত্রীর সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছু চলছে।

প্রথমেই যে কথাটা বলতে চাই, অর্থমন্ত্রী কখনোই বলেননি বাংলাদেশের অর্থনীতি কানাডার সমান হয়ে গেছে, কিংবা প্রবৃদ্ধিতে আমরা কানাডার সমান।

বিষয়টির অবতারণা গত ৯ মে বৃহস্পতিবার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অফিসে বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর দানদান চে’র সাথে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তার জনসংযোগ কর্মকর্তার পাঠনো প্রেস রিলিজ খবরটির উৎস।

ওই অনুষ্ঠানের আগে পরে গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত না থাকায় সবাই ভরসা করে প্রেস রিলিজের ওপর। সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আইএমএফ এর একটি প্রতিবেদন এবং ব্লুমবার্গ এর বিশ্লেষণ থেকে তথ্য নিয়ে বলেন যে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ব জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবে এমন শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে কানাডা এবং বাংলাদেশ একই পরিমাণ অবদান রাখবে .৯%। আর এর পরই অবদান রাখবে ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব। প্রসঙ্গক্রমে স্পেনের নামও বলেন তিনি।

এখন ভাবুন, মন্ত্রী বললেন কী, আর আমরা লিখলাম কী! বিশ্ব জিডিপিতে বাংলাদেশ এবং কানাডার সমান অবদান রাখা, আর দুটি দেশের অর্থনীতি সমান হয়ে যাওয়া কি এক বিষয়? কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ, কানাডার সমান হয়ে গেছে – একথা কি বলা যায়?

এই যে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলো, এই দায় আমরা কি মেনে নেবো? কেনো নেবো না? কেবল গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে না, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে একাধিক দৈনিক সংবাদপত্র, অনলাইন সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং আন্তর্জাতিক মাধ্যমে প্রকাশিত, প্রচারিত সংবাদ পড়ি, শুনি। সেই সুবাদে বলছি ৯ মে আমরা একটা ভুল করলাম। দু’দিন বাদে ১১ মে আরও বড় ভুল করলাম। বিষয়টি পরিষ্কার করছি।

শুক্রবার, ১০ মে রাতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানতে চাইলাম তিনি আদতে কী বলেছিলেন? তাকে যারা চেনেন, নিশ্চয়ই একমত হবেন, তথ্য এবং পরিসংখ্যান দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন তিনি। বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কে বেশ ভালো দখল তার।

তিনি কিনা বলবেন বাংলাদেশ আর কানাডার অর্থনীতি সমান! খানিকটা বিরক্ত, বুঝলাম, কিছটা হতাশও বটে। স্পষ্ট বললেন, ‘তোমরা যা মন চায় লিখে দাও। আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’

বারবার অনুরোধের পর বললেন, ‘ঠিক আছে আগামীকাল সকালে (শনিবার) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর যাবো, ওখানে আসো, কথা বলবো।’

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব, পদাধিকারবলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো: মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার অফিসে বাজেট পূর্বক সভার আগে কয়েকজন টিভি রিপোর্টার এর সঙ্গে ৮-১০ মিনিট কথা বললেন অর্থমন্ত্রী। অনেক বিষয়ের সাথে বিশ্ব জিডিপিতে কানাডা এবং বাংলাদেশ কিভাবে, কতো অবদান রাখবে আবারও ব্যাখ্যা দিলেন।

অর্থমন্ত্রনালয়ের তথ্য কর্মকর্তাও ছিলেন সেখানে। আমার জানামতে তিনি, অর্থমন্ত্রীর রেকর্ডকৃত অডিওটি রিপোর্টারদের সরবরাহ করেন, কোন প্রেস রিলিজ পাঠাননি। যাই হোক পরের দিন রোববার জাতীয় দৈনিক এবং প্রথমসারির অনলাইন পত্রিকার বেশ কয়েকটির কাছাকাছি শিরোনাম। বহুল পঠিত, দৈনিক প্রথম আলোর হেড লাইন ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কানাডার সমান: অর্থমন্ত্রী।’ বিডিনিউজটুয়েন্টিফোর.কম লিখলো ‘প্রবৃদ্ধিতে আমরা কানাডার সমান: অর্থমন্ত্রী।’

বাংলাদেশ প্রতিদিনের শিরোনাম ‘প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ কানাডার সমান।” বিবিসি বাংলা আরও এগিয়ে, তারা  ‘বাংলাদেশ ও কানাডা: দুই দেশের অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য কতটা?’

বিজ্ঞাপন

শিরোনামে আমরা কানাডার থেকে কত পিছিয়ে আছি তা তথ্য উপাত্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ‘সাপ্তাহিক’ সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা আবার গোটা দুনিয়ার ধনী দেশের বাজারদর, শ্রমিকের বেতন ইত্যাদি দিয়ে ডেইলি স্টার পত্রিকার বাংলা বিভাগে মতামত লিখে প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশ কোথায়, আর কানাডা কোথায়?

কারো পক্ষ নেয়া কিংবা বিপক্ষে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য না। নেহাতই পেশার দায়বদ্ধতা থেকে কিছু বলার চেষ্টা। আমাদের লেখা বা বলার মাধ্যমেই মানুষ সহজে তথ্য পেয়ে থাকেন। তো আমরা যদি বক্তব্য উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে সতর্ক না হই তাহলে অবস্থাটা কি দাড়াতে পারে অনুমান করেন।

প্রসঙ্গত, সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? তার বক্তব্য হরহামেশা ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের ট্রল হয়েছে তার বক্তব্য।

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করার পরের দিন আমরা ২ জন টিভি রিপোর্টার তাকে বললাম, আবুল হোসেন তো পদত্যাগ করেছে, এখন নিশ্চয়ই আপনার জন্য পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দরকষাকষি করতে সুবিধা হবে? মুহিতের সপ্রতিভ জবাব ছিলো ‘ওয়েল, হি ইজ ইন টাউন, ইউ ক্যান আস্ক হিম। ‘

একটি সংবাদ সংস্থা ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমের রিপোর্টার সেখানে ছিলো না। তো তার কাছ থেকে রেকর্ডটি ধার করে এবং আমি আর এটিএন বাংলার সেসময়ের রিপোর্টার গোলাম পারভেজের সাথে কথা বলে সবাই নিউজটা করলো। মজার ব্যাপার হলো, প্রথম আলো এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার পরের দিন শিরোনাম করলো ‘আবুল ইজ ডাউন’। যাই হোক আবুল মাল আবদুল মুহিতের খাঁটি ব্রিটিশ উচ্চারণ এবং কথা বলার বিশেষ স্টাইলের মারপ্যাঁচে পড়ে প্রায়শই আমরা ভুল-ভাল কোট করতাম। এই ভুলের তালিকা বেশ লম্বা। সুযোগ পেলে আরেক দফায় লিখবো।

বক্তব্য ভুল-ভাল উদ্ধৃত করার প্রথম সংকটটি তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের, যিনি গণমাধ্যমের ভুলের বলি হলেন। তার পক্ষে তো জনে জনে গিয়ে বলা সম্ভব না যে আমি এটা বলি নাই, গণমাধ্যমের কর্মীদের ভুল।

আমার মনে হয় তার চেয়ে বড় সংকট- গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা। আমরা হয়তো ভাবছি এ আর এমনকি ব্যাপার, লিখে দিয়েছি, ছাপাও হয়ে গেছে। মনে রাখা দরকার, পাঠক বা দর্শক মাত্রই বোকা হবে এমন ভাবাটা অযৌক্তিক। জানা-বোঝায় তারা আমার আপনার চেয়ে অনেক এগিয়ে। আর ইন্টারনেটের এই সময়ে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ যথেষ্ট অবারিত।

কাজেই অন্য কোন উৎস থেকে পাঠক যদি পেয়ে যায় আমি ভুলভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেছি, তাহলে আমি যে মাধ্যমে কাজ করছি, তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে নিশ্চয়ই।

পত্রিকায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং কানাডার বিশ্ব জিডিপিতে অংশগ্রহণ বা অবদান রাখার খবর বা মতামতের নীচের মন্তব্যগুলো দেখলে হাস্যরসের অনেক খোরাক পেয়ে যাবেন।

কেউ কেউ লিখেছেন, কানাডায় গাঁজা বৈধ হয়েছে, তার ইফেক্ট পড়েছে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর ওপর। স্যাটায়ার হিসেবে খারাপ না!

কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে গাঁজার ইফেক্ট আদতে পড়লো কার বা কাদের ওপর? অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ওপর নাকি আমরা যারা তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করলাম এবং পরবর্তীতে কলাম বা মতামত লিখে পাঠককে বিভ্রান্ত করছি তাদের ওপর?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View