চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও মেডিক্যাল ল্যাবরেটরিতে করণীয়

কোভিড-১৯ একটি সংক্রামক রোগ। এই ভাইরাস মূলত গলা ও ফুসফুসে সংক্রমণ করে। আক্রান্ত রোগীর মাধ্যমেই এ রোগ ছড়ায়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যে উপসর্গগুলো নিয়ে রোগী আসতে পারে সেগুলো হল:

১.জ্বর,হাঁচি,কাশি
২.নাক দিয়ে পানি পড়া,নাক বন্ধ
৩.গলা ব্যথা
৪.পেট ব্যথা,পাতলা পায়খানা
৫.গা,হাত-পা ব্যথা
৬. শ্বাসকষ্ট
৭ .বুকে চাপ,ব্যথা
৮.খাবারের স্বাদ কমে যাওয়া

বিজ্ঞাপন

উপরোক্ত উপসর্গগুলোর রোগীরা চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি- বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কনসালটেন্ট ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসেন। তখন চিকিৎসকরা রোগীকে রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপদেশ দিয়ে থাকেন।এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার বেশিরভাগই বিভিন্ন হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরিতে করা হয়ে থাকে। পরীক্ষার নমুনা হিসেবে ল্যাবরেটরিতে রক্ত, সিরাম, কফ, মল, প্রসাব, বডি ফ্লুয়িড, নাকের সোয়াব, ট্রাকিয়াল সোয়াব, থ্রোট সোয়াব ইত্যাদি আসে। এসব নমুনা নিয়ে কাজ করার সময় ল্যাবরেটরিতে কর্মরত চিকিৎসক, বায়োকেমিষ্ট, মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট, টেকনিসিয়ান, ল্যাব এটেনডেন্ট ও অন্যান্য ল্যাব স্টাফরা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। যে সমস্ত কারণে ল্যাবরেটরির স্টাফদের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলো হল:
১.ভর্তিকৃত কোভিড-১৯ রোগীর রুটিন হেমাটোলজী টেস্টের নমুনা হতে
২.রুটিন বায়োকেমিস্ট্রির সিরাম বা প্লাজমা হতে
৩. জ্বরবিহীন আক্রান্ত রোগী যিনি এখনো জানেন না তিনি আক্রান্ত,তার হাচিঁ-কাশি,সংস্পর্শের মাধ্যমে
৪.আক্রান্ত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন যারা ওই ব্যক্তির সংস্পর্শ এসেছেন
৫. কোভিড-১৯ আক্রান্ত কিন্তু উপসর্গবিহীন ব্যক্তি যিনি অন্য রোগের জন্য নমুনা দিতে এসেছেন।

ইতিমধ্যে কমিউনিটি সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে সীমিত আকারে, ক্লাষ্টার আকারে।তাই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

কারণ ল্যাবরেটরি স্টাফদের কেউ আক্রান্ত হলে যারা ঝুঁকিপূর্ণ:
-সে নিজে, সহকর্মীরা, অন্য রোগী বা তার আত্মীয়স্বজন, তার পরিবার, কমিউনিটি সংক্রমণ।

ল্যাবে কাজের সময় যে সমস্ত কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় সেগুলো হল:

বিজ্ঞাপন

১.আক্রান্ত ব্যক্তির শিরাতে সিরিন্জ অথবা সুঁই ঢোকানোর সময়।
২.টিউব টপার বের করার সময় টিউব ভেঙ্গে গেলে।
৩.মুখ দিয়ে পিপেটিং করার সময়।
৪.চর্ম ও মিউকাস মেমব্রেনের উপর নমুনা ছিটকে পড়লে।
৫. বডি ফ্লুইড পরীক্ষার সময়।
৬.কফ স্মিয়ার বানানোর সময়।
৭.রক্তের স্মিয়ার বানানোর সময়।
৮.জীবাণুযুক্ত হাত দিয়ে পিপেটিং করার পর সেই হাত দিয়ে মুখ,চোখ স্পর্শ করলে।
৯.গ্লোভস সংক্রমণযুক্ত হলে।
১০. সেন্ট্রিফিউজ মেশিন হতে অ্যারোসল বের হলে।

ল্যাবরেটরিতে সংঘটিত দূর্ঘটনা হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য সতর্কতার কোন বিকল্প নেই। সতর্কতাই সুরক্ষা দিতে পারে।এক্ষেত্রে নিজেকে সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই।নিম্নোক্ত উপায়ে ল্যাবে কর্মরত স্টাফরা নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

ল্যাবরেটরিতে সাধারণ নিয়ম:
১.ল্যাবের নিয়মকানুনগুলো কঠোরভাবে মানতে হবে।
২.SOP মেনে চলতে হবে।
৩.পর্যাপ্ত পিপিই থাকতে হবে(মাস্ক,রেসপিরেটর,ল্যাব কোট,গগলস,গ্লোভস প্রভৃতি)।
৪. পিপিই ব্যবহার সম্পর্কে ট্রেনিং দিতে হবে।
৫.সুরক্ষার সব সরন্জাম একটা নির্দিষ্ট রুমে রাখতে হবে।
৬.অসুস্থ স্টাফ সনাক্তকরণ ও করণীয়।
৭.হাঁচি-কাশি -পরিচ্ছন্নতার নিয়ম পর্যালোচনা করতে হবে,স্টাফদের উপদেশ দিতে হবে।
৮. সামাজিক দূরত্ব মেনে কাজ করতে হবে।
৯. কাজ সম্পর্কিত স্ট্রেস কমাতে হবে।
১০.পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
১১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
১২.সামাজিক দূরত্ব মেনে নিয়মিত মিটিং,ব্রিফিং করতে হবে।
১৩.অতিরিক্ত কর্মঘন্টা (স্বান্ধ্যকালীন, রাত্রীকালীন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন) নির্ধারণ করতে হবে।
১৪.রোস্টার অনুযায়ী কর্মঘন্টার ব্যবস্থা করতে হবে যেন একসাথে সকল স্টাফ এক্সপোসার না হয়।
১৫.ল্যাবরেটরিতে খাওয়া ও পানীয় নিষেধ।

ল্যাবরেটরিতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা:
১.লং স্লিভ পোষাক পড়তে হবে।
২.চুল বাঁধতে হবে।
৩. ক্রিম ব্যবহার বা মেকআপ করা যাবেনা।
৪.বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সাবান বা সেনিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে বের হতে হবে।
৫.ব্যক্তিগত জিনিসপত্র অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল দ্রবণ দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে একটি আলাদা ব্যাগে নিতে হবে।
৬.গণপরিবহণ এড়াতে হবে।
৭.ল্যাবে ঢোকার সময় সাবান বা সেনিটাইজার দিয়ে হাত ধুতে হবে।
৮.ল্যাবরেটরি পোষাক পড়তে হবে(পিপিই হলে ভালো)।
৯.মাস্ক পড়তে হবে(N-95 হলে ভালো না হলে সার্জিক্যাল মাস্ক),গ্লোভস,গগলস,এ্যাপ্রোন পড়তে হবে।
১০. সুকভার পড়তে হবে।
১১.প্রত্যেকবার নমুনা দেখার পর গ্লোভস বদলাতে হবে এবং ঢাকনাযুক্ত বিন বা ডিসপোজবল ব্যাগে ফেলতে হবে।
১২.একটি টিস্যু একবারই ব্যবহার করে ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলতে হবে।
১৩.ল্যাবের ফোন,রিমোর্ট,ফিল্টার ও অন্যান্য জিনিসপত্র দায়িত্বরত অবস্থায় ধরলে হেক্সিসল বা সেনিটাইজার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
১৪.কাজশেষে পিপিই ডিসপোজবল ব্যাগে ফেলতে হবে
১৫. এ্যাপ্রোন ও অন্যান্য জিনিসপত্র ল্যাবে রেখে আসতে হবে।
১৬.হাত না ধুয়ে মুখ ও চোখ স্পর্শ করা যাবেনা।
১৭.ঘরে পৌছার পর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রগুলো জীবাণুমুক্ত করে আলাদা ব্যাগে রাখতে হবে।
১৮.পৌছামাত্র গোসল করতে হবে ও কাপড়গুলো আলাদা করে সাবান দিয়ে ধুতে হবে।
১৯. টাকা ধরা যাবেনা,ধরলে হাত জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
২০.হাত ধুয়ে ল্যাব থেকে বের হতে হবে।

বেশিরভাগ ল্যাবরেটরিতে একত্রে হেমাটোলজী,ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজী,বায়োকেমিষ্ট্রির কাজগুলো করা হয়।তাই সংক্রমণযুক্ত নমুনা আসতে পারে। তাই সাবধানতা অবলম্বন না করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ সংক্রামিত হলে পুরো ল্যাব স্টাফকে আইসোলেশনে যেতে হতে পারে।তখন সাধারণ রোগীদের রোগ নির্ণয় ঝুঁকির মুখে পড়বে। রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হবে। জীবন হুমকির মুখে পড়বে।তাই এ অবস্থায় সংক্রমণ এড়াতে ল্যাবরেটরিতে ব্যক্তিগত সুরক্ষাই কোভিড-১৯ কে প্রতিরোধ করতে পারে।ফলে ল্যাবরেটরি স্টাফরা নিরাপদে থাকবে, সুস্থ থাকবে।

ডা: মোসা: সায়লা ইয়াসমিন
সহকারী অধ্যাপক
ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।