চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কষ্ট, হতাশা বুকে চেপে বিচারের আশায় জুলহাজ-তনয়ের পরিবার

হত্যার দুই বছর পরেও তদন্তে অগ্রগতি নেই

আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের এক সন্ধ্যায় রাজধানীর কলাবাগানে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইউএসএইড কর্মকর্তা ও সমকামী অধিকার কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তারই বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে। দীর্ঘ এই সময়েও হত্যাকারীরা অধরা। ঘটনা তদন্তে নেই উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এরই মধ্যে তারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছেন, যাদের মধ্যে তিনজন হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য নিহতদের পরিবারের সদস্যরা আক্ষেপের সুরে বলছেন, তদন্তকারী সংস্থার কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলতে আসেনি। দুই বছর পরেও কেন তদন্তের অগ্রগতি ফলাফল শূন্য হবে – সেটা তারা ভেবে পান না।

দুইপক্ষের এমন বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়; চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সুরাহা এখনো করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের কথায় ফাঁক রয়েছে।

কয়েক বছর ধরে দেশজুড়ে উগ্রপন্থিদের একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের মধ্যে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল কলাবাগানের লেক সার্কাস রোডের বাসায় ঢুকে জুলহাস মান্নান ও মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

ওই ঘটনা দেশে-বিদেশের গণমাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসে। হত্যাকাণ্ডের পর জুলহাসের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান ইমন বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় একটি মামলা করেন।

এছাড়াও কলাবাগান থানার এসআই মোহাম্মদ শামীম আরেকটি অস্ত্র মামলা করেন। মামলা দুটি প্রথমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করলেও সম্প্রতি পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট তদন্ত করছে।

জুলহাজ তার ফেসবুকের ওয়ালে নিজের জন্মদিন কিংবা যে কোন বিশেষ দিবসে এখনো বন্ধুদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন

সিটিটিসি’র উপ-কমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম খান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব আমরা পাই।এখন পর্যন্ত আমরা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছি, এরমধ্যে দুইজন ডিবি কর্তৃক আগেই গ্রেপ্তার ছিল।

‘এদের মধ্যে তিনজন দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নিয়েছিল। আরও তিন-চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

এখন পর্যন্ত তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, জুলহাজ তনয় হত্যাকাণ্ডে শরীফুল ইসলাম ওরফে কেরামত অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। তাকে ২০১৬ সালের ১৫ মে কুষ্টিয়ার কুমারখালী গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়াও ব্লগার নাজিম উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর সায়েদাবাদ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রশিদুন্নবী ভূঁইয়া নামে আরেক যুবককে। পরে তাকে জুলহাজ-তনয় হত্যা মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাদের।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর তুরাগের বাউনিয়া বাঁধ এলাকা থেকে মোজাম্মেল হোসেন সায়মন ওরফে শাহরিয়ার ও ২৫ নভেম্বর সাভারের আমিনবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরাফাত রহমান নামে দুই যুবককে। তাদেরকে প্রথমে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হলেও পরে দুজনকেই জুলহাজ-তনয় হত্যায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ডেমরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা ইয়ামিন মিয়া ওরফে জাভেদ নামে আনসার আল ইসলামের এক সদস্যকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ছিলেন জুলহাজ, তিনি ছিলেন মেধাবী ও বন্ধু অন্ত:প্রাণ

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, গ্রেপ্তারদের তথ্য ও আমাদের তদন্তে বের হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের একটি ‘স্লিপার সেল’ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। তবে আনসার আল ইসলামের ‘স্লিপার সেল’ এর সদস্যরা দলের উচ্চ পর্যায়ের সাংগঠিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত থাকে না। আনসার আল ইসলামের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেপ্তার করা গেলে জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানা যাবে।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে লেখক, ব্লগার বা ভিন্ন চিন্তাধারার বেশ কিছু ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করা হচ্ছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের উপ-কমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম খান বলেন, জুলহাজ-তনয়সহ অন্যান্য ব্লগার-লেখক-প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য মদতদাতা ও মাস্টারমাইন্ড হলো সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। তাকে ধরতে প্রতিনিয়ত আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জিয়াউলকে ধরতে পারলে তদন্তটি আরো অগ্রসর হবে।

নিহত জুলহাজ বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনার প্রটোকল কর্মকর্তা ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের আগে সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ‘রূপবান’ নামের একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদনার পাশাপাশি জুলহাস উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইডে কাজ করতেন।

জুলহাজের সঙ্গে নিহত তনয় নাট্যদল লোক নাট্যদলের শিশু সংগঠন ‘পিপলস থিয়েটার’ এ জড়িত ছিলেন।

নিজেদের সহকর্মী ও বন্ধুকে ভুলেনি ইউএস অ্যাম্বাসি

হত্যা মামলা প্রতিবেদন পিছিয়ে ২০ মে:
জুলহাজ ও তনয় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন করে আগামী ২০ মে দিন ধার্য করেছেন আদালত। চলতি মাসের ১৫ তারিখ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম প্রতিবেদন দাখিল না করায় ঢাকা মহানগর হাকিম মাহমুদা আক্তার এ নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।

বিশ্বস্ত বন্ধুকে স্মরণ করল ইউএস অ্যাম্বাসি:
জুলহাজ হত্যার দুই বছর পার হলেও বিশ্বস্ত এ বন্ধুকে ভুলে নি ঢাকার ইউএস অ্যাম্বাসি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জুলহাজ মান্নানকে স্মরণ করে একটি পোস্ট দিয়েছে তারা।

সেখানে লেখা হয়েছে, ‘দুই বছর আগে আমরা আমাদের প্রিয় সহকর্মী বন্ধু ও একজন ভালো মানুষকে হারিয়েছে, আমরা সব সময় তাকে স্মরণ করি। জুলহাজ ছিলেন আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু, কর্মঠ ও কর্মক্ষেত্রে নিবেদিত প্রাণ। মানবাধিকার বিষয়ে তিনি ছিলেন সাহসী একজন, খু্ব সুন্দর একটি জীবন অতিবাহিত করতেন জুলহাজ যেখানে ছিল বন্ধুত্ব আর ভালবাসা। আজ এবং সবসময় আমরা তার কর্মস্পৃহা ও তার যোগ্যতাকে সম্মান জানাই।’

স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিজেদের কষ্ট বাড়াতে চায় না পরিবার:
নিহত জুলহাজ মান্নানের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমাদের কষ্ট আর হতাশার কথা বলে কি লাভ? ভাই হারানোর পর বিচার ব্যবস্থা নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি শূন্য, তদন্তকারী সংস্থার কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলতে আসেনি। কারণ আসলে আমাদের কাছে তথ্য ভিত্তিক কথা বলতে হবে।

তিনি আরো বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের মোবাইলসহ বেশ কিছু জিনিস জব্দ হয়েছে, তারপরও তদন্তকারী কর্মকর্তারা কিছু খুঁজে পায় না, বিষয়টা কষ্টদায়ক। এটি একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড এসব নিয়ে কথা বলে নিজেদের কষ্ট আর বাড়াতে চাই না।

Bellow Post-Green View