চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘কলমপিষে খাওয়া’র একযুগে বাবাকে স্মরণ

এই নিবন্ধের শিরোনামে কিছুটা প্ররোচনার আভাস আছে। এটি মূলত দু’টি ভাবকে প্রকাশ করে। ‘কলমপিষে খাওয়া’ বলতে এখানে আমার লেখালেখির জগতকে বুঝিয়েছি। আর ‘বাবাকে স্মরণ’ বলতে সেই লেখালেখির জগতে আসার পেছনে অনুপ্রেরণা দেয়ার মানুষ বাবাকে স্মরণ করছি। আজ আমার লেখালেখি ও সাংবাদিকতার একযুগ পূর্তি। আবার, আজ আমার পিতার মৃত্যুর পাঁচশতম দিন। কাকে-তালে তাই এই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।

২০০৮ সালে এই রকম জুন মাসের বর্ষণক্লান্ত এক দিনে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিকতার আনুষ্ঠানিক হাতে খড়ি হয় আমার। যদিও পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স লেখালেখি আমি আরো চারবছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই শুরু করি। বিগত একযুগের মধ্যে প্রত্যক্ষ সাংবাদিকতা করেছি (চার বছর) দেশের তিনটি জাতীয় দৈনিকে। ২০১২ সালে অধ্যাপনায় যুক্ত হলে শুরু হয় পরোক্ষভাবে সাংবাদিকতা; তথা কলাম, নিবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখালেখি।

বিজ্ঞাপন

মিন্টু লাল নন্দী, আমার বাবা বিদায় নেওয়ার পাঁচশতম দিন আজ, ১১ই জুন, ২০২০। আমার জীবনে কী এক ভয়াবহ তারিখ, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯! আজ পাঁচশটি দিন, কাউকে বাবা ডাকতে পারিনি। কাউকে হঠাৎ দূর থেকে আবছা মনে হয়, বাবার মতো! খুব ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরি। খুব ইচ্ছা করে প্রতিমাসের ২৮ তারিখ যেকোন অজুহাতে বাবার মতো কারো পাশে গিয়ে সময় কাটাই। কিন্তু পেলাম কই?

বিজ্ঞাপন

আমার বাবা ছিলেন হাটহাজারীর মির্জাপুর গ্রামে বেড়ে উঠা একজন সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। সাহিত্যপ্রতিভা ও সামাজিক পরিচিতি এবং পেশাগত সততার চর্চায় তিনি এলাকায় শিক্ষানুরাগী ও সামাজিক সজ্জন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন কৃতিপ্রাক্তনী ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়। বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষাবিভাগের একজন কর্মী হিসেবে দীর্ঘ কর্মময় জীবন অতিবাহিত করেছেন। নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে জীবন থেকে বিদায় নেয়ার ক্ষণে যমে মানুষে টানাটানি ছিলো তীব্র। আমরা সপরিবারে বাবার পাশে ঝাঁপ দিয়ে বহুবার মেডিকেলের আইসিইউ থেকে বিজয়ীর মত ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু বিধিলিপি কে খণ্ডাতে পারে? সবাইকে যেতে হবে, অমর কে বা রবে? তিনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজ এই করোনাক্রান্তির বদলে যাওয়া নিঃসঙ্গ পৃথিবীটি তাঁকে দেখতে হলো না। যদি তিনি বেঁচেও থাকতেন, হয়তো হৃদরোগ-শ্বাসকষ্ট-ডায়াবেটিস তাঁকে করোনায় কাবু করে আরো জটিল মৃত্যুযন্ত্রণা দিতে পারতো। তবুও আমি তো বাজারের সেরা মাক্সটি কিনে তাঁকেই দিতাম, তাঁর যত্ন নিতাম, অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে রাখলে এইরকম কোন একটি চিঠি লিখতাম!

আজ থেকে পাঁচশতম দিন আগের কথা, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯। নিশি রাত, চারিদিকে নিস্তব্ধতা। একটা এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলছে। এই সাইরেনের চেয়ে ভয়ঙ্কর শব্দ আর কিছু হতে পারে না। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দগুলোর একটা এম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ। কিছুটা ফিকে হয়ে আসা জীবন্মৃত স্বপ্ন স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন বাবা। স্ট্রেচার ছুঁয়ে ইস্টনাম জপ করে চলছে আমাদের পরিবারের তিনটি আতঙ্কিত মুখ। ধাবমান এম্বুলেন্সের ভেতর শ্লথ দেহটি যেন ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ঢুকতে পারলেই নবজীবন প্রাপ্তি হবে, এমনটাই ভাবছিলাম। কিন্তু বৈপরীত্যও তো জীবন। রবি ঠাকুরের গানটি খুব মনে পড়লো- ‘জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে’।

বাবার জীবনটি বাঁচানোর তাড়নায় মাঝরাতে একটি ধাবমান এম্বুলেন্স ছুটছিলো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা। কিন্তু, কে জানতো উনার অস্তিত্বসংকটের মৃত্যুকূপ খনন ছিলো কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে! সেখানেই অনিবার্য নিয়তির জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বাবা রওনা হলেন পারলৌকিক জগতে। ‘ভ্রমণপিয়াসী’ বাবা চলে গেলেন গন্তব্য ‘অসমাপ্ত’ রেখে, মাঝপথেই। সেই থেকে এম্বু্লেন্সের সাইরেন আর ভোরের আলো আমার কাছে অসহ্য! একটি চমৎকার মানুষ কোন কিছু না বলে সুন্দর সকালটি না দেখে, মাঝপথে নেমে যাবেন? এটা আমি এখনো বিশ্বাস করিনা! করবো না কখনোই।

স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা বাবা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলছিলো, “রাজু আমি উঠে বসবো।” তখন ভোর পৌনে পাঁচটা। জগৎ সংসার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাইকে জাগাবে বলে। নীরব নিশি তব চরণ নিছায়ে, আঁধার-কেশভার বিছায়ে বাবাকে ছিনিয়ে নিতে পথরোধ করলো! আমরা এম্বুলেন্সের ভেতর চারজন, হঠাৎ ‘তিনজন’ হয়ে গেলাম! বাবা আর কথা বললো না, উঠে বসলো না। নিখিল প্লাবিয়া মুখর থাকা বাবার জীবন বীণার সুর থেমে গেলো। রবি উঠছে পুব আকাশে, আমাকে যেন উদ্দেশ করে গাইছে, ‘ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে, গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে’!

সেই থেকে আজ পর্যন্ত এম্বুলেন্সের শব্দ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। আজ সেই দিনের স্মরণে শোকে আর স্মরণে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। আজ আমার জীবনের পরাজয়ের দিন, গতিশীল ধাবমান এম্বুলেন্সের ভেতর আমার গলিত স্থবির ব্যাঙ হয়ে যাওয়ার দিন। এম্বুলেন্সের শব্দ আমাকে তাড়া করে ফেরে। প্রিয়জনের নিথর মরদেহ নিয়ে এম্বুলেন্স যাত্রার মতো অসহায় পরিস্থিতি খুব কম আছে জীবনে। এম্বুলেন্স আমাদের জীবনের একটি অংশ। এম্বুলেন্সের ভেতর একটি মানুষ নীরব থাকেন বলেই, সকল মানুষের সরব হওয়া থমকে যায়। তখন কেবল সরব হয়ে উঠে ধাবমান এম্বুলেন্সের মাথার ওপর সশব্দ সাইরেন। জীবন আর মৃত্যুর সীমানায় মরুভূমির মতো নীরবতা জেগে উঠে এম্বুলেন্স এর ভেতর সকলের মধ্যে। হয়তো কখনো এম্বুলেন্স তার যাত্রা শেষ করে, কখনো বা পুরো যাত্রা জুড়ে নীরবতার ভেতরেই শেষ বিদায় নেয় প্রিয়জন! একটি মানুষ, হয়ে উঠে ‘ডেডবডি’! এভাবেই এম্বুলেন্সের ভেতর যাত্রীরা মৌনব্রত পালন শেষে বোধিপ্রাপ্ত হয়। তখন বুঝি, নশ্বর এই ধরণীতে অস্থায়ী বসবাস শেষ হবে একদিন। শেষ হবে, হতেই হবে। অমর কে বা রবে?

দোসরা মে ২০১৩, টানা ত্রিশ বছর বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা বিভাগে চাকুরি শেষে অবসর নিলেন। বাবার ছিলো সেদিন মন খারাপ! এদিকে আমি তখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টারি জীবনে প্রবেশ করেছি। অবসরের প্রথম দিনই তিনি শোনাচ্ছিলেন সদ্য চাকরি জীবনে প্রবেশ করা সন্তানকে- পেশাগত সততার মূল্য, সহকর্মীদের সাথে মেলামেশার কৌশল, সময়জ্ঞান, নিষ্ঠা ইত্যাদি। এইসব কথা শুনে মনে হচ্ছিলো, দ্বাপর যুগের কিছু সত্যভাষণ শুনছি; কলিযুগে যা ভীষণ অচল। সেই অচল ভাষণের জন্যই বোধহয় পিতারা আকাশের চাইতেও উচুঁ।

বিজ্ঞাপন

তিনি ছিলেন আমার জীবনের প্রথম নায়ক, প্রথম বন্ধু, প্রথম শিক্ষক এবং একমাত্র মানুষ; যিনি আমাকে বুঝতে পারতেন, তাই খুব মিস করি। বাবা খুব রান্নাপ্রিয় ছিলেন। ছিলেন ভোজন রসিকও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় আমার পড়ালেখার খোঁজ নিতেন, অথচ নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার হলাম, তখন আমি কী পড়াই ক্লাসে- সেসব খোঁজও নিতেন। কখনো অবাক হতাম, কখনো খুশি হতাম। বাবারা কী, সেটি ছেলেরা হারিয়েই বোঝে কিংবা সে যতক্ষণ না বাবা হচ্ছে!

এখন আর কেউ বাবার মত কেউ বলে না, আয় বোকা আয়! অবসরের পরদিন ওনার লাখ লাখ টাকার হিসাব দিচ্ছিলেন আমাকে। বাবা বলেছিলেন, তুই কী চাস? আমি বলেছিলাম, একটা হুডখোলা জিপ! সারা বাংলাদেশ ঘুরবো, খাবো আর বেড়াবো। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘শখের জিনিস নিজের কষ্টের পয়সায় কেনা উচিত’। বাবা অপ্রয়োজনে একটা পয়সা দেননি, কিন্তু কিভাবে পয়সা ঘরে আসে সেসব কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন।

বিখ্যাত লেখক অদ্রীশ বর্ধনের মা নাকি সব জানতো। তিনি তিনটি বই লিখেছিলেন ‘আমার মা সব জানে’ নামে। কিন্তু, আমি বলি, আমার বাবা সব জানে। শীতকাল আসলে খুব মনে পড়ে, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে বাবা গ্রাম থেকে শহরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় নিয়ে আসতেন আমাকে। বাদাম চিবুতে চিবুতে আমি বাবার হাতের তর্জনী ধরে মেলায় ঘুরতাম। কখনো ছাড়তাম না বাবার হাতটি, যদি ভিড়ে হারিয়ে যাই? বিজয় মেলার আলোচনা মঞ্চে আমাকে কোলে-কাঁধে নিয়ে বাবা দেখাতেন বক্তাকে। চট্টগ্রাম আউটার স্টেডিয়ামে তখন বইমেলা হতো। বই কিনে দিতেন।‍ তাঁরই অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো বিরাট আকারের একটি লাইব্রেরি।

বাবা ছিলেন ভ্রমণপ্রিয়। ভ্রমণে বের হলে ভ্রমণক্লান্তিতে তিনি বলতেন, ‘তীর্থযাত্রা পরিশ্রম, সকলি মনের ভ্রম’। কী অসম্ভব এক মনের বল ছিলো বাবার। সরকারি চাকরির সুবাদে দেশের বহু জায়গায় ঘুরেছি তাঁর সাথে। আমার শৈশবের একটি সময় কেটেছে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে চা বাগান এলাকায়। এছাড়াও তিন পার্বত্যাঞ্চলকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর পেশাজীবনের কারণে। বাবা খুব লিখতেন, নীরবে। ডায়েরিতে। কখনো বাবা তাঁর লেখা প্রকাশ করেননি। আমার লেখালেখির জগতে আসার পেছনে প্রধান উৎসাহদাতা আমার বাবা। ‘কেন আমরা লিখি’ এই প্রশ্নের উত্তরে আমার খুব প্রিয় লেখক শাহাদুজ্জামান এক সাক্ষাতকারে কিছু উক্তি বলেছেন। যেমন- আঁদ্রে জিদ বলেছিলেন, ‘লিখি কারন না লিখলে হাত ব্যাথা করে’। গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, ‘লিখি যাতে আমার বন্ধুরা আমাকে আরো একটু বেশী ভালোবাসে।’

কেন আমি লিখি? এ প্রশ্ন করা খুব সহজ। কিন্তু উত্তর দেয়া জটিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে যে সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানাবার জন্য লিখি’। বাবার সাথে সাহিত্য বিশেষত মিথলজি নিয়ে আলোচনায় বুঝতাম, বইয়ের অক্ষরের ভেতর দিয়ে এক মায়াবী ভালোবাসা বিলিয়ে যাচ্ছে তার মুখর মুখটি। চোখ বন্ধ করে আত্মার গভীর উপলদ্ধি থেকে বাবা পাঠ করতেন মহাভারত, গীতা, চৈতন্যচরিতামৃত। বাবাকে দেখে দেখে সেই ঘোর, সেই নেশা পেয়ে বসে আমাকে। বাবা সাহিত্যের পাঠক ছিলেন। ২৩ বছর বয়সে শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ কিনে খুব সুন্দর করে টাইপোগ্রাফি করেছিলেন, ১৯৭৭ সালে কেনা বইটিতে তাঁর সাক্ষর আছে এখনো। তিনি প্রচুর পড়তেন। তৎকালীন সময়ে ‘আপনার জন্য খবর’ নামের একটি সাময়িকী খুব জনপ্রিয় ছিলো। তিনি ছিলেন তার নিবিষ্ট গ্রাহক ও পাঠক। আমাদের বাসায় গড়ে উঠেছিলো ব্যক্তিগত লাইব্রেরি।

ছাত্রাবস্থায় প্রচুর পড়েছেন তিনি। যার পরম্পরায় ছাত্রাবস্থায় আমিও উত্তরসুরীর অভ্যাসমত রাজনীতি ও সাহিত্যের ভূবনে চলে আসি। বাবার মতো পড়ার অভ্যাস পাই। পড়তে পড়তে বইয়ের ভেতর দিয়ে জীবনকে বোঝার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠি। বাবাই আমাকে দেখিয়েছেন, মহাভারতের পাতায় পাতায় প্রতিটি মানুষের জীবন রহস্য লুকিয়ে আছে। আজকের এই মায়াবী জগতের সকল সংকট মহাভারতেই বলা আছে। কেবল কৌতূহলী মন ও বিশ্লেষণী চোখ নিয়ে সাহিত্যকে পাঠ করতে হয়। সরকারি চাকুরে হিসেবে তিনি দেশময় ঘুরেছেন, আমিও তারঁ ভ্রমণসঙ্গী হয়ে উঠি। ফেসবুক ও ব্লগের মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটে এবং কাগজের সাংবাদিকতার সুবাদে লেখালেখিতে হাত পাকানো শুরু করি। স্বদেশের পড়াশোনা শেষে কিছুটা বিদ্যাশিক্ষা শেষে ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করি। নিজেকে অধ্যাপনায় নিজেকে যুক্ত করলে লেখালেখির চর্চা ভিন্ন মোড় নেয়। সমাজের ভেতরকার যোগাযোগ প্রবাহকে বিশ্লেষণী মন নিয়ে দেখার চেষ্টা করি। গবেষণার ভেতর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যিক ঘোর সমানতালে আমাকে পেয়ে বসে।

আজ অধ্যাপনা ও লেখালেখি এই দুটি কাজ আমার দ্বিতীয় সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। বাস্তবতা আর কল্পনা নিয়ে কখনো কখনো আমার মধ্যে সংশয় চলে। বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতি তার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। চার বছরের সাংবাদিকতা ও আট বছরের শিক্ষকতা জীবনের ‘কলমপিষে খাওয়া’ একযুগ পার করছি। বিস্ময়ের সঙ্গেই লক্ষ্য করি, আজ আমার সঙ্গী অনেক শিক্ষার্থী-পাঠক-পাঠিকা। তাঁদের কেউ কেউ আগ্রহের সঙ্গে পড়েন, সমালোচনা করেন, পরামর্শ দেন; যা আমার অধ্যাপনা ও লেখালেখি জীবনের জন্য যা ভীষণ প্রয়োজনীয়।

বাবাকে নিয়ে এই স্মৃতিচারণটি শেষ করছি একটি সিনেমার গল্প দিয়ে। বাবার সাথে দেখা একটি সিনেমার স্মৃতি আমাকে আবিষ্ট করে রাখে। তখন আমার শৈশব। ‘তাহাদের কথা’ নামের বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত (১৯৯২ সালের পুরস্কার বিজয়ী বাংলা ভাষার ভারতীয় সিনেমা) সিনেমাটি একসাথে বসে দেখছি আমরা বাপ-বেটা। যেখানে বাবার অভিনয় করেন মিঠুন চক্রবর্তী। বাবার অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি এবং চলচ্চিত্রটি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ভারতে। সিনেমায় শিবনাথ নামের বাবা চরিত্রটি আন্দামান ফেরত সাম্যবাদী বিপ্লবী। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন মুক্তিযোদ্ধা। শিবনাথ কারারুদ্ধ হওয়ার এগারো বছর পর কারাগার থেকে বের হয়ে প্রথম দেখে তাঁর এগারো বছরের সন্তানকে। কারণ, সন্তান যখন মাতৃগর্ভে পিতা শিবনাথ কারাগারে গারদের মধ্যে। একজন সুস্থ মানুষ ও বিপ্লবী শিবনাথ সমাজের বদলে যাওয়া চারপাশকে দেখে মেনে নিতে পারে না। সমাজ তাঁকে পাগল বা অপ্রকৃতস্থ আখ্যা দেয়। কিন্তু সন্তানের কাছে বাবা পাগল নয়। সিনেমার ৩৭ মিনিটের মাথায় বাবা সন্তানকে বলছে-যদি জানতাম পৃথিবী এরকম, হয়তো তোকে আমি আনতাম না। কারাগারে কাগজ আর কালি পেলে তোকে একটি চিঠি লিখতাম- ‘লেটার্স টু এ সান ফ্রম এন আননোন ফাদার’!

বাবা চলে যাওয়ার আজ পাঁচশতম দিন। দিন যায়, দিন আসে, রাত যায়-আসে; বাবা আর আসে না। বাবা আর আসবেও না। ছোটবেলায় আমার মনে হতো, বাবারা খুব নিষ্ঠুর হয়। প্রথম যেদিন পুকুরে সাঁতার শেখালেন, ইচ্ছে করেই হাবুডুবু খাইয়েছিলেন, যাতে সাঁতরানোর শক্তি পাই। ইচ্ছে করেই পানির নিচে চুবিয়ে রেখেছিলেন, যাতে দম জিনিসটা কী, সেটা বুঝতে পারি! মহাভারতে বনকাণ্ডে বকরূপী যক্ষের প্রশ্নের জবাবে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন- ‘পিতা আকাশের চাইতেও উঁচু’। সেই আকাশের চাইতেও উঁচু একটি মানুষের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার দম নিয়ে চলছি আমি। মনে প্রশ্ন জাগছে, সব বাবারাই কি একসময় লিখতে চায়- ‘লেটার্স টু এ সান ফ্রম এন আননোন ফাদার’? কারণ, সন্তান থেকে সাংসারিক ক্রমপরির্তনের ধাবাবাহিকতায় আমিও আজ আমার সন্তান বিশাখা’র বাবা। একটি পরিবারে ‘মা’ হচ্ছেন খুঁটি, আর ‘বাবা’ হলেন ছাদ। খুঁটি না থাকলে ছাদ ভেঙ্গে পড়ে, আর ছাদ ছাড়া খুঁটি আশ্রয়হীন। ছাদ আর খুঁটি ছাড়া পরিবারের সদস্যরা ‘জানলা’। যে জানালা দিয়ে বদ্ধ ঘর থেকে হয়তো পৃথিবী দেখা যায়, কিন্তু ছাদ আর খুঁটি হারালে বোঝা যায়, এই দুটি জিনিস কী ছিলো!