চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা কীভাবে ‘আশীর্বাদ’ হয়?

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ে জরুরি সেবাদানে নতুন নিয়োগ পাওয়া দুই হাজার চিকিৎসকের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেছেন, ‘কোভিডভাইরাস আপনাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। কারণ কোভিড-১৯ যদি না আসতো আপনাদের হয়তো নিয়োগ দেয়া সম্ভব হতো না। কাজেই কোভিড আপনাদের জন্য একটি আশীর্বাদ হিসেবেই এসেছে…কোভিডের কারণেই আপনারা এ নিয়োগ পেয়েছেন।❜ [বিবিসি বাংলা, মে ১৩, ২০২০] বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর মহাখালীর বিসিপিএস মিলনায়তনে ৩৯তম বিসিএসের অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে সদ্য নিয়োগ পাওয়া দুই হাজার চিকিৎসকের অরিয়েন্টেশন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেছেন।

এটা ঠিক বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত মজবুত করতে দ্রুততম সময়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। করোনার চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া হলেও এটাকে ‘আশীর্বাদ’ বলা অন্যায় এবং অমানবিক। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমান। নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা নিজ যোগ্যতায় সরকারি এই চাকরি পেয়েছেন। তারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে লেখাপড়া করেছেন, পেশাগত মানবিক ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন। তাদের এই নিয়োগকে স্রেফ করোনার কারণে নিয়োগ হিসেবে দেখা একদিকে যেমন এই পেশাজীবীদের প্রতি অন্যায়, অন্যদিকে তাদের যোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

সরকার দ্রুততম সময়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এজন্য তাদেরকে ধন্যবাদ, কিন্তু এই দ্রুততা মূলত রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, মানবিকতার প্রয়োজনেই। করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। এখানে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের জায়গাটা শূন্য হয়ে যাচ্ছে যৌক্তিক কারণেই। এই শূন্যস্থান পূরণ মূলত রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই। এখানে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষিত একটা রোগকে কোনোভাবেই ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে দেখা বাঞ্ছিত নয়। দুঃখজনক খবর হচ্ছে- স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেভাবেই দেখছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে কেউ কেউ যৌক্তিক ভাবতে পারেন, কিন্তু এটাকে যৌক্তিক ভাবাটাই অযৌক্তিক। যেমনটা বিএনপি সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ২০০২ সালের ৯ মে রামপুরায় বাবার কোলে থাকা ২০ মাসের শিশু নওশিন ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হবার পর শোকার্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে!’ বিএনপির ওই মন্ত্রীর বক্তব্য তখন সমালোচনার মুখে পড়েছিল। আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের করোনাকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখার যে বক্তব্য সেই বক্তব্যের সঙ্গে মিল আছে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্যের।করোনাভাইরাস

প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে করোনাভাইরাসকে আশীর্বাদ হিসেবে বর্ণনা করা মন্ত্রীর এটাই নজিরবিহীন মন্তব্য নয়। তিনি নানা সময়ে নানা কথা বলছেন যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। যা দেশবাসীকে আশাবাদী করার চাইতে ভয়াবহ হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। তিনি এমন অনেক কাজ করেছেন যা মহামারির সংক্রমণের মধ্যে থাকা একটা দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যায় না। তিনি একবার বলছেন ‘করোনা ভয়াবহ কোন রোগ নয়’। আবার বলছেন- ‘বিপদের মধ্যে পড়তে যাচ্ছি’। তিনি অনলাইন প্রেস ব্রিফিংয়ে এসে প্রেসরিলিজ দেখেও বারবার ভুল উচ্চারণে ভুল কথা বলছেন, ভুল সংখ্যা বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। চিকিৎসকদের সুরক্ষা সরঞ্জামকে (পিপিই) তিনি বারবার প্রকাশ্যে এসে ‘পিপিই’র জায়গায় ‘পিপিপি’ (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি-পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) বলে গেছেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে একাধিকবার করোনাভাইরাসকে ‘করুনাভাইরাসও’ বলেছেন। আবার নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলার সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গত ২১ মার্চ তিনি তার ডানে-বামে এবং পেছনে ৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে গাদাগাদি করে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। ওই অনুষ্ঠানে একজন সাংবাদিক তাকে বলেন, ‘আপনাদের দিকে আমরা সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছি, অথচ আপনার ব্রিফিংয়ে আপনার পেছনে ৩৭ জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, এটির কি প্রয়োজন আছে? এটি কোনো স্বাস্থ্যকর অবস্থা নয়। যারা দায়িত্বশীল পদে তারা যদি উদাহরণ তৈরি করেন তাহলে আমাদের জন্য অন্যদের মেসেজ দিতে সুবিধে হয়।’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখন একটি যুদ্ধাবস্থায় আছি। যুদ্ধাবস্থায় সব সিস্টেম মেনে চলা সম্ভব হয় না। আমরা এটা বুঝি, আপনারাও বুঝেন; আমাদের সকলের নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। তারপরও দেশের তাগিদে, দেশের মানুষের তাগিদে আমাদের কাজ করতে হয়।’ ভাবা যায়- নিজেরা সিস্টেম না মেনে দেশবাসীকে সিস্টেম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া! সম্ভব, এমনও সম্ভব!

তিনি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শক্তিশালী একটা কমিটির নেতৃত্বে আছেন। কিন্তু কী ধরনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি যা প্রকাশ করেছেন তিনি তার সরল স্বীকারোক্তিতেই। গত ৬ এপ্রিল সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিষয়ে জরুরি বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘করোনা মোকাবেলায় একটা ন্যাশনাল কমিটি (জাতীয় কমিটি) ফর্ম করা হয়েছে। সেই ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান আমাকে করা হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু ন্যাশনাল কমিটিতে যে সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে সে সিদ্ধান্তগুলো আমাদের নলেজে নাই। কখন ফ্যাক্টরি খোলা হবে, খোলা হবে কি না- এ বিষয় আমরা জানি না। মসজিদে নামাজ কীভাবে হবে বা আলোচনা সে বিষয়ও আমরা জানি না। কখন রাস্তা খুলে দেবে বা বন্ধ করবে সে বিষয়ও আমরা জানি না। আমরা স্বাস্থ্য বিষয় বাদে কোনধরনের বিষয় আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। আমি সাংবাদিকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি। তাদেরকে আমি সদুত্তর দিতে পারিনা। শুধু দেশের সাংবাদিক না আজকাল আমাকে বিদেশ থেকেও অনেক সাংবাদিক ফোন করে, ফোনে ইন্টারভিউ নেয়, ফোনে টেলিভিশনে যোগ হয় তারা, এই সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করে; এবং অনেক সময় দোষও দেয় যে আপনি যদি সেই কমিটির হেড হয়ে থাকেন তাহলে এই কমিটির সিদ্ধান্তগুলো আপনি জানেন না কেন? এটাও একটা সমস্যা।’ ভাবা যায়- এই আমাদের অবস্থা?

বিজ্ঞাপন

আচ্ছা, করোনার সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি এমন করছেন প্রথমবারের মতো? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে- ‘না’। এরআগেও তিনি এমন করেছিলেন। গতবছর দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর তিনি এই মশাকে রোহিঙ্গাদের সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন। মন্ত্রী ওই সময় বলেছিলেন, ‘এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো, যে কারণে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে ডেঙ্গু হঠাৎ করেই বেশি হওয়ার কারণ এডিস মশা বেশি বেড়ে গেছে। এই মশাগুলো অনেক হেলদি ও সফিস্টিকেটেড, তারা বাসাবাড়িতে বেশি থাকে।’ ওইদিন মন্ত্রী আরও বলেন, এডিস মশার প্রডাকশন অনেক বেশি। যেভাবে রোহিঙ্গা পপুলেশন আমাদের দেশে এসে বেড়েছে, সেভাবেই এই মসকিউটো পপুলেশনও বেড়েছে। আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।’ [বাংলা ট্রিবিউন জুলাই ২৫, ২০১৯]

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর পরই তিনি কাউকে না জানিয়ে সপরিবারের মালয়েশিয়া চলে গিয়েছিলেন। মন্ত্রীর এই বিদেশ গমনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে গেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ‘মন্ত্রী কোথায়’- এমন শোরগোলের পর সফরের মাঝপথে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়। ওই সময়ে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তাকে দেশে ফিরতে হয়েছিল। তবে দুর্যোগের সময়ে দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এমন গা ঢাকা দেওয়ার শাস্তি তাকে পেতে হয়নি। তিনি আগের মতই আছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে।

এবার অবশ্য অবস্থা ভিন্ন। দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে চাইলেও তিনি মালয়েশিয়া কিংবা অন্য কোন দেশে ভ্রমণে যেতে পারবেন না। করোনাভাইরাসের কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ, এছাড়া পৃথিবীর প্রায় সবদেশই করোনা আক্রান্ত। চাইলেও তার পরিবারকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নাই। আমরা আশা করছি একদিন পৃথিবী করোনামুক্ত হবে, তখন তিনি ভ্রমণে যেতে চাইলে যেতেই পারেন।

তবে তারআগে ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া এইসব মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকবেন আশা করি। কারণ একজন মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, এবং এই মুহূর্তে করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিনিই প্রধান ব্যক্তি। এই হিসেবে তার কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ, দায়িত্বশীল মন্তব্যই কাঙ্ক্ষিত। এইধরনের দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে কারও জন্য করোনাকে ‘আশীর্বাদ’ ভাবার মতো চটুল মন্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত।

মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আপনার পদত্যাগ দাবি করি না; তবে আপনার কাছ থেকে যৌক্তিক মন্তব্য আশা করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)