চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনায় আটকে যাওয়া সিনেমা, কী ভাবছেন নির্মাতারা?

আটকে যাওয়া ছবি নিয়ে অপেক্ষায় নির্মাতারা: কারো অপেক্ষা প্রেক্ষাগৃহের জন্য, কেউ করছেন বিকল্প চিন্তা…

নিজের বানানো সিনেমা নিয়ে অপেক্ষায় আছেন বেশ কয়েকজন নির্মাতা। মুক্তির চূড়ান্ত পরিকল্পনাও করে ফেলেছিলেন, কিন্তু করোনার কারণে থেমে গেল সব। অপেক্ষা করতে হচ্ছে সেই মার্চ মাস থেকে। অপেক্ষার প্রহর যে এতো দীর্ঘ হবে, সেটা বোধহয় আন্দাজ করতে পারেননি কেউ ই।

এদিকে পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও করোনার কারণে দেশের সব সিনেমা হলে এখনও ঝুলছে তালা। হল কবে খুলবে জানা নেই কারো। এরফলে দিনকে দিন সিনেমার প্রযোজকরা যেমন ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন- তেমনি হল মালিকরাও আছেন অনিশ্চয়তায়। বিশেষ করে সিঙ্গেল স্ক্রিনের সিনেমা হলগুলোর ক্ষেত্রে অনেকে মনে করছেন ‘কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতো’ অবস্থা করে দিলো করোনা!

বিজ্ঞাপন

তবু অনেক নির্মাতা মনে করছেন, সিনেমা হলের বিকল্প আর কিছু নেই। করোনা পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হয়ে এলেই তারা নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রটি নিয়ে প্রেক্ষাগৃহেই যেতে চান। অপেক্ষা করতে চান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে- তার যেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, তেমনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই যে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আসতে শুরু করবে, সেটারও নিশ্চয়তা নেই। অর্থনৈতিক বিষয়টি মাথায় রেখে বিকল্প প্রদর্শনীর কথাও তাই ভাবছেন অনেকে।  

মুক্তি প্রতীক্ষিত সিনেমা নিয়ে ভাবনা, মুক্তির পরিকল্পনা এবং এই সময়ের প্রেক্ষিতে সিনেমা দেখা ও দেখানোর প্রক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত- এসব বিষয় নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা বললেন কয়েকজন নির্মাতা। যাদের সিনেমা মুক্তি আটকে গেছে করোনা পরিস্থিতির কারণে:

নূরুল আলম আতিক
মুক্তির প্রতীক্ষায়  ‘পেয়ারার সুবাস’ ও ‘মানুষের বাগান’

সিনেমা মুক্তির বিষয়ে আমরা একটা বিকল্প চিন্তা করছি। প্রয়োজনে অনলাইন প্লাটফর্ম গুলোতেই রিলিজ করে দিবো বলে ভাবছি। কারণ কতোকাল সিনেমা এভাবে ফেলে রাখা যায়! তাছাড়া আমি যে ধরনের সিনেমা করি, সেগুলো যে অনেক হলে মুক্তি পাবে বা রিলিজের ব্যবস্থা হবে- সেরকম সম্ভাবনাও কম। সেক্ষেত্রে সিনেমাটা এভাবে ফেলে না রেখে, প্রযোজককে সেভাবে বুঝাতে চেষ্টা করছি যে অনলাইনে দিয়ে দেয়া যায় কিনা!

করোনা না আসলেও মানুষ অনলাইনে অভ্যস্ত হয়ে যেত, হয়তো সেটা আরো পাঁচ বছর পরে হত। কিন্তু করোনা আসায় সেটা এখন থেকেই অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। বাজার সদাই এবং ইলেকট্রিসিটি বিল এর সাথে এখন ইন্টারনেট বিল দেয়ার বিষয়টা অভ্যস্ততায় পরিণত হয়েছে। আর এসব কারণে আমার মনে হচ্ছে অনলাইন প্লাটফর্ম গুলোকে এখন অন্যভাবে দেখার সময় এসেছে।

বিনোদন খাত আগের চেহারায় ফেরত যাবে, এরকম সম্ভাবনা কম। এই খাতে বিনিয়োগ করার চেয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করে বিনোদন ও অর্থ প্রাপ্তির নিরাপত্তা বেশি। এজন্য ফুড আমাদের এখানে বড় একটা বিনোদন হয়ে গেছে, শপিংটা বিনোদন হয়ে উঠছে। গত ছয় মাসের সামাজিক দূরত্বের নামে অনলাইন বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আর এসব কারণেই আমার মনে হয় যে সহসায় সিনেমাহলে স্বাভাবিকতা ফিরবে না।

কামার আহমাদ সাইমন
২৭ মার্চ মুক্তি চূড়ান্ত ছিলো ‘নীল মুকুট’-এর

২৭ মার্চ পরিকল্পনা ছিলো আমার নতুন ছবি ‘নীল মুকুট’ মুক্তি দেওয়ার। ঠিক করে রেখেছিলাম, বিদেশে কোন উৎসবে দেখানোর আগে দেশেই মুক্তি দিবো এই ছবিটা। ইচ্ছা ছিলো ‘শুনতে কি পাও!’ ‘একটি সূতার জবানবন্দী’ আর ‘নীল মুকুট’ এই তিন ছবি নিয়েই ঘুরতে বের হবো জেলায় জেলায়… কিন্তু আমি দেখেছি ছবি মুক্তির আগে আমার সবসময়ই কিছু একটা কুফা লাগে! এর আগে ২০১৪ সালে যখন ‘শুনতে কি পাও!’ নিয়ে বের হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম তখনও নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী চলছিলো পেট্রল-বোমার সন্ত্রাস! দুই মাসে ১৪টা জেলায় প্রায় ৮৮টা প্রদর্শনী বাতিল করতে হয়েছিলো তখন। সারা দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াল ছবিটা অথচ দেশেই ঠিকমতো দেখাতে পারলাম না! এইবার নীল মুকুটের ঠিক আগে শুরু হলো করোনা, এ আমার দূর্ভাগ্যই বটে।

কিন্তু তাই বলে করোনা পরিস্থিতির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি মনে করি না ধুম করে সিনেমাহল খুলে দেওয়াটা যৌক্তিক হবে। আবার সিনেমাহলগুলো যদি এইভাবে বন্ধই থেকে যায় তাহলে করোনা পরবর্তী সময়ে এইগুলো চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক দিক থেকে না, ডিজিটাল প্রযুক্তির কথা ভাবলেও ব্যাপারটা চিন্তার। এইসব জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা চালু না রাখলে এমনিতেই নষ্ট হয়ে যায় কিছুদিন পর। আমি মনে করি দুইটা জিনিস করা যেতে পারে, প্রথমটা হলো সিনেমাহলের সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজে এইগুলোকে নিয়ে আসা, বিশেষ করে ছোট বা প্রান্তিক হলগুলো- যেগুলো এমনিতেই একরকম লাইফ-সাপোর্টে ছিলো, সেইগুলোকেতো অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত খুব তাড়াতাড়ি। দ্বিতীয়ত নির্বাচিত কিছু হলকে কঠিন শর্ত সাপেক্ষে, যেমন বাধ্যতামূলক স্যানিটাইজেশন ও ধারণ ক্ষমতার এক-তৃতীংশের টিকেট বিক্রি করতে পারবে না – এইরকম কিছু বিধান রেখে ধাপে ধাপে খুলে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। যাতে করোনার ধাক্কায় ভবিষ্যতে সিনেমা হল না পুরাপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকানো যায়!

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল
সহসা হল না খুললে ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ নিয়ে আছে বিকল্প চিন্তা

সিনেমা হল খোলার বিষয়টিকে আমরা যেরকম অনিশ্চিত বলছিলাম, এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু যখন পুরো দেশ প্রায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চলে যাচ্ছে, সেখানে সিনেমা হল আর কতদিন অনিশ্চিত থাকবে সেটা আমি আর একটু দেখতে চাই। কারণ ওটিটি প্লাটফর্মে সিনেমা রিলিজ দেয়া যদি সম্ভব হত, তাহলে শুধু আমি আরো অনেকেই সেটা করতেন। কিন্তু ওটিটি প্লাটফর্মে যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সেটার সঙ্গে আমাদের ইনভেস্টমেন্ট যাচ্ছে না। কারণ তারা যদি একটা নতুন ছবি পুরোনো ছবির দামে প্রিমিয়ার করতে চায়, সেটা তো আসলে সম্ভব না। তাদের বাস্তবতায় হয়তো এটা ঠিক আছে। এ কারণে এতো এতো ছবি আটকে থাকার পরেও শুধু আমি না, কেউ কিন্তু ওটিটি প্লাটফর্মে নতুন সিনেমা রিলিজ দেয় নাই।

তবে আমার একটা নিজস্ব পরিকল্পনা আছে, সেটা একেবারেই নিজস্ব প্লাটফর্ম। সেই পরিকল্পনা মতো আমরা এগুচ্ছি। তবে এখনো যদি সিনেমা হল খুলে দেয়, তাহলে অবশ্যই আমরা আগে সিনেমা হলে ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ রিলিজ দিতে চাই। সিনেমা হলের জন্য হয়তো আমরা আর মাস দুয়েক অপেক্ষা করবো।

চয়নিকা চৌধুরী
আগে সিনেমা হলের দর্শকদের দেখাতে চান নিজের প্রথম ছবি ‘বিশ্ব সুন্দরী’

সিনেমা হল যখন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তখন সেটা অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ ভাইরাসটি ছিলো অজানা। নাহলে মানুষ অনেক ঝুঁকির মধ্যে থাকতো। তো এখন আমরা ভাইরাসের বিষয়ে খুব ভালোভাবে জানি। কীভাবে ছড়ায় সেটা জানি, ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার বিষয়টিও আমাদের জানা। সময়ের সাথে সাথে আমরা দেখছি, এখন কিছুই প্রায় স্বাভাবিক। এমনকি খাবারের দোকান পর্যন্ত খুলে দেয়া হয়েছে। মানুষ পাশাপাশি বসে খাচ্ছে। এতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কতোটা মানা হচ্ছে, জানি না- যেটা আমি মনে করি ঠিক না। কিন্তু তারচেয়ে অনেক অংশে কম ঝুঁকিপূর্ণ সিনেমা হল। স্বাস্থ্যবিধি মাথায় রেখে আসন বিন্যাস করে সিনেমা হলগুলো এখন খুলে দেয়া যায়। অন্তত খাবার-দাবারের দোকানগুলো থেকে সিনেমা হল অনেক সেফ। এ অবস্থার মধ্যে সিনেমা হলগুলো খুললে প্রত্যেক হল মালিক, হলের স্টাফরা যেন গাইডলাইন সম্পূর্ণরূপে ফলো করে- এটা নিশ্চিত করলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।

বাংলা সিনেমা খুবই কঠিন সময় পার করছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সিনেমা বর্তমান অবস্থা থেকে খুব ভাল একটা পজিশনে যাবে নয়তো একেবারেই ধ্বসে যাবে। সুতরাং আমার মনে হয় সবাই মিলে বাংলা সিনেমাকে বাঁচানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যতই আমরা অনলাইন প্লাটফর্ম এর প্রশংসা করি না কেন, কিন্তু বড় স্ক্রিনে হলে বসে একটা জিনিস দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আমি আমার প্রথম সিনেমা ‘বিশ্ব সুন্দরী’ ও সিনেমা হলে দেখাতে চাই। যদিও সিনেমার রিলিজ সংক্রান্ত বিষয় প্রডিউসারের ভাবনা, তবুও আমি মনেপ্রাণে চাই দেশের হলগুলো আবার সচল হোক। প্রাণ ফিরুক সিনেমা হলগুলোতে।

রাশেদ চৌধুরী
আন্তর্জাতিক উৎসবে ‘চন্দ্রাবতীকথা’ প্রশংসা পেলেও টার্গেট দেশের বড় পর্দা

‘চন্দ্রাবতীকথা’ সিনেমাটা বানানোই হয়েছে বড় স্ক্রিনে দেখানোর জন্য। ছোট প্লাটফর্মে দেখাতে হবে, অনলাইন প্লাটফর্মে রিলিজ- সেটা একটা আলাদা বিষয়, পরেও করা যাবে। কিন্তু আমার সিনেমাটা নির্মিতই হয়েছে বড় পর্দাকে টার্গেট করে। ফলে এর আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে, অবশ্যই সিনেমা হলেই দেখাতে হবে। সিনেমা হল এখনো খুলেনি এটা একটা সংকট, কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশেই সিনেমা হলগুলো খুলতে শুরু করেছে- আমার মনে হয় এই স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি প্রধান বিবেচনা করেই হলগুলো খুলে দেয়া উচিত। পাশাপাশি আমাদেরও আরেকটু সোচ্চার হতে হবে। আমি আশা করবো যেহেতু ‘চন্দ্রবতীকথা’ ফোক এলিমেন্ট বেইজ ছবি, দর্শক অন্ততপক্ষে এই ছবির নাম কিংবা কাহিনী শুনে সিনেমা হলে দেখতে আসবে। আমি সেই অপেক্ষায় থাকবো।

এছাড়াও আটকে আছে বেশকিছু বিগ বাজেট ও দাপুটে নির্মাতাদের ছবি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য মিশন এক্সট্রিম পার্ট-১, শান, বিদ্রোহী, জ্বীন, পরাণ, দিন : দ্য ডে, ঢাকা-২০৪০, বিক্ষোভ ও পাপ-পুণ্য ‘র মতো ছবি।