চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: ঢাকা মেডিকেলে প্লাজমা সংগ্রহ শুরু, প্রয়োগ আগামী সপ্তাহে

কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের জন্য সেরে ওঠা রোগীদের কাছ থেকে সিরাম সংগ্রহ শুরু করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রক্তপরিসঞ্চালন বিভাগে কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা দু’জন চিকিৎসক প্লাজমা দান করেন।

বিজ্ঞাপন

হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং প্লাজমা থেরাপির জন্য গঠিত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ খান বলেন: সবকিছু ঠিক থাকলে সংগ্রহ করা এই প্লাজমা আগামী সপ্তাহে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের শরীরের প্রয়োগ করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক ডা. এম এ খান জানান: এ সপ্তাহে তারা আরও প্লাজমা সংগ্রহ করবেন। সংগ্রহ করা প্লাজমায় অ্যান্টিবডি পরিমাপ করা হবে। এ চিকিৎসা প্রয়োগের অনুমোদনের প্রক্রিয়াও এই সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে।

তিনি বলেন: যারা প্লাজমা থেরাপি দেবেন তাদের প্রশিক্ষণ, তথ্যসংগ্রহ, প্লাজমা দেওয়ার আগে কিছু পরীক্ষাও করতে হয়। পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে স্পেন থেকে চলে এসেছে।

‘টেস্ট করতে যে পরীক্ষাগুলো করা হয় সেটা অনেক ব্যয়বহুল। অনেকগুলো স্যাম্পল কালেক্ট করার পর একসঙ্গে এই পরীক্ষা করা হবে। নইলে কিটগুলো নষ্ট হবে। আর পরীক্ষাটা যেহেতু আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করতে হবে, সেজন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করছি।’

অধ্যাপক খান বলেন: এই কাজ এগিয়ে নিতে এখন তাদের সামনে দুটো চ্যালেঞ্জ- একটি দাতা সংগ্রহ করা, অন্যটি অর্থের ব্যবস্থা করা।

‘একজনের কাছ থেকে প্লাজমা সংগ্রহ করতে খরচ হয় ১২ হাজার টাকা। এছাড়া পরীক্ষায়ও আরও কিছু টাকা খরচ হয়। ভবিষ্যতে আমরা যখন এটার পরিসর বাড়াব, তখন পরীক্ষার জন্য আরও কিট লাগবে। সেজন্য ফান্ড দরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সরকারি ব্যাপার কিছুটা সময় দরকার।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম দিন প্লাজমা দিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. দিলদার হোসেন বাদল।

গত ২৫ এপ্রিল তার কোভিড-১৯ সংক্রমণ ধরা পড়ে; তিনি সুস্থ্য হন গত ৯ মে। প্লাজমা থেরাপির পরীক্ষামূলক প্রয়োগের কথা শুনে তিনি প্লাজমা দিতে উৎসাহিত হন।

বিজ্ঞাপন

শনিবার সকালে প্লাজমা দিয়ে আবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কাজে যোগ দিয়েছেন বলে জানান ডা. দিলদার।

তিনি বলেন: এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে উন্নত বিশ্বে ট্রায়াল হয়েছে। বাংলাদেশে আমিও প্লাজমা থেরাপির অংশ হতে চাই। এ কারণেই প্লাজমা দিলাম। আমি আগেও নিয়মিত রক্ত দিতাম। আমার কারণে একজন মানুষেরও যদি উপকার হয় সেটাই হবে বড় পাওয়া।

শনিবার প্লাজমা দেওয়া দ্বিতীয় চিকিৎসক হলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগের রওনক জামিল পিয়াস। তিনিও সম্প্রতি কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছেন।

শনিবার পিয়াস বলেন: চিকিৎসকরা সচেতন, এ কারণে তারা প্লাজমা দেবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষেকেও আগ্রহী করে তুলতে হবে।

‘চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যই মানুষের জীবন বাঁচানো। রক্ত দান করলে যেমন ভালো লাগে আজ তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগছে। আজকের দিনটি আমার জন্য স্পেশাল। তবে সাধারণ মানুষ যেন এগিয়ে আসে এটা নিশ্চিত করতে হবে। বেশি পরিমাণে প্লাজমা সংগ্রহ করে দেওয়া গেলে আরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচবে।’

নতুন করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করায় লাখ লাখ রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে উন্নত দেশগুলোও। এই অবস্থায় নতুন এই রোগে আক্রান্তদের সারিয়ে তুলতে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের রক্তের প্লাজমা অসুস্থদের দেওয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশ।

রক্তের তরল, হালকা হলুদাভ অংশকে প্লাজমা বা রক্তরস বলে। তিন ধরনের কণিকা ছাড়া রক্তের বাকি অংশই রক্তরস। মেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীরের রক্তের প্রায় ৫৫ শতাংশই রক্তরস।

চিকিৎসকরা বলছেন: কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এ ভাইরাস মোকাবেলা করে টিকে থাকতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে। সময়ের সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির প্লাজমায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ওই অ্যান্টিবডিই অসুস্থদের সারিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার হবে।

বাংলাদেশেও বিষয়টির সম্ভাব্যতা দেখতে এপ্রিলের শুরুতে আগ্রহের কথা জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজির অধ্যাপক ডা. এম এ খান। ১৯ এপ্রিল অধ্যাপক ডা. এম এ খানকে সভাপতি করে ৪ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক তপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী সদস্য হিসেবে আছেন ওই কমিটিতে।