চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: ঢাকা, গেট ওয়েল সুন

                         ‘ঘুমের ভেতর চলে যাই ফেলে আসা শহরে

                          যেহেতু আমার যাবৎ জাগরণ ঘুমোয় সে শহরে

—পিয়াস মজিদ

করোনাভাইরাসের আতঙ্ক এই শহরের প্রাণশক্তি একটু একটু করে শুষে নিচ্ছে। ভীতির দানবের ছায়ায় ম্লান হয়ে গেছে রঙিন আলো। চোখের সামনে রুগ্ন হয়ে পড়েছে প্রিয় ঢাকা। মুখোশ পরে চলছে মানুষ। কে চেনা, কে অচেনা—বুঝার উপায় নেই। এখন কেউ তা বুঝতেও যাচ্ছে না। এখন জরুরি বিপদ থেকে যেভাবেই হোক বেঁচে থাকা। একজন আরেকজনকে সন্দেহের চোখে দেখছে—করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয় তো!

বিজ্ঞাপন

পুরো শহরটাই যেন একটি হাসপাতাল। হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং স্যাভলনের গন্ধে ম-ম করছে চারদিক। শহরের পার্কগুলোতে গোরস্থানের নীরবতা। জনশূন্য বিনোদনকেন্দ্র ও শপিংমলগুলোও। লম্বা ছুটিতে ফাঁকা ঢাকার সড়কগুলো। কিন্তু এই ফাঁকা অপ্রত্যাশিত—অস্বস্তির। বিষণ্নতার চাদরে মোড়া গোটা শহর।

বিজ্ঞাপন

এই শহরেই আমার জন্ম। এখানকার অলি-গলিতে বেড়ে উঠেছি। এই প্রথম চিরচেনা শহরটিকে ভীষণ অচেনা মনে হচ্ছে। নখ-দর্পণে থাকা অলি-গলিতে হাঁটতে এখন ভয় হয়। ফাঁকা শহরের ছবি তুলি। নিজেই বিস্মিত হই। করোনাকাল পার হওয়ার পর কেউ এই ছবি দেখে চিনবে না—বিশ্বাস করতে চাইবে না, এটা ফার্মগেটের ছবি! এ কোন কারওয়ান বাজার! এটা মতিঝিলের দৃশ্য!

পুরান ঢাকার হাজীর বিরিয়ানির জন্য ভিড় নেই, নান্নার কাচ্চির হাঁকডাক নেই, তেজগাঁওয়ে নাবিস্কোর মিষ্টি বিস্কুটের ঘ্রাণ নেই, নেই মোড়ের টংদোকানে চায়ের কাপে ঝড়। নিস্তব্ধ ধূসর শহরে ক্ষণে ক্ষণে কুকুরের ডাক শোনা যায়। এখানে এখন অন্ধকারও যেন দ্রুত নামে। ঝপ করে অন্ধকার নামতেই শহরজুড়ে এক ভৌতিক আবহের সৃষ্টি হয়। মাতাল বাতাস বয়, বাতাসে হেলে-দুলে ওড়ে প্লাস্টিকের মোড়ক, শুকনো পাতা ও ধুলো। রাতে যখন বাড়ি ফিরি—এই বাতাস শরীরে কাঁপন ধরায়। মন হয়, অন্ধকার পিছু নিয়েছে। ধরতে পারলেই গিলে খাবে।

বিজ্ঞাপন

অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছেন। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। গাদাগাদি করে যাত্রা যে করোনারভাইরাসের জন্য অনুকূল তা কারো মাথায় ছিল না—বাড়িফেরাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সাংবাদিকদের যাওয়ার জো নেই। প্রতিদিন এই ফিকে শহরে ঘুরে বেড়াই। ঝুঁকি আছে। কিন্তু এই পেশাটাই যে এমন। আমাদের মতো চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতা কর্মী—তারাও কোথাও যাচ্ছেন না। সবাই চলে গেলে এই শহরের পাশে কে থাকবে!

আরো কিছু মানুষ আছে—যারা যেতে পারেননি। কোথায় যাবে? যেখানে যাওয়ার সেই বাড়ি তো কবে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে, ঋণ শোধ করতে বিক্রি হয়ে গেছে, দখল হয়ে গেছে…। বেঁচে থাকার অবশিষ্ট স্বপ্ন নিয়ে একদিন তারাই ঢাকায় পা রেখেছিলেন। তাঁরা থাকেন শহরের ঘিঞ্জি বস্তিতে, রাস্তার ধারে ও ফুটপাতে।

সেই মানুষগুলোই এখন পড়েছেন সবচেয়ে বিপাকে। দোকানপাট বন্ধ, পুরো দেশ থেকে ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন, খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে মানুষজন বের হচ্ছেন না। ফলে এই দিন আনে দিন খায়—হতদরিদ্র মানুষেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সুনসান শহরের অলি-গলিতে তাঁরা ঘুরে বেড়ান—হাত বাড়ান সাহায্য পেতে। তাদের চোখে মুখে মরুভূমির প্রতিবিম্ব। সেদিন একটি সুপারশপে ঢুকছি, দেখি এক নারী আঁচলে মুখ ঢেকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা। যারা সুপারশপ থেকে বের হচ্ছেন তাদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন হাত। মুখে কোনো কথা নেই। ভাবলাম বের হওয়ার সময় কিছু দেবো। বের হওয়ার সময় দেখি তিনি নেই।

অবস্থা ভালো নয়। মনখারাপ থাকে। রাতে ঘুম আসে না। আমরা কজন সিদ্ধান্ত নিয়েছি কর্মহীন, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষগুলোকে প্রতিদিন অন্তত একবেলা খাওয়াবো। কতদিন পারবো জানি না। তা জানার চেয়ে বেশি জরুরি কাজটা শুরু করা। আমরা আমাদের নিজ নিজ এলাকায় যদি কাজ শুরু করি তাহলে এই মর্মান্তিক দৃশ্য অনেকটাই বদলাবে। করোনাকালে শুধু হাত ধুলেই চলবে না, হাত ওই মানুষগুলোর দিকেও বাড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে হয়তো আমাদের মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইটা সহজ হবে।

খুব করে চাই, ঢাকা আবার তার আগের রূপে ফিরবে। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে যাদুর শহর। ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও শপিংমলগুলো আবার সরব হবে। আবার সিনেমা হলের টিকেট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন হবে। এই ভয়ের ফাঁকা নগরীর চেয়ে আমাদের সেই যানজটে স্থবির নগরীই ভালো। চাই—ভীষনভাবে চাই, ‘উদ্দাম-উচ্ছল হোক সঞ্জীবনীধারা, বেঁচে থাকো শুদ্ধ মাটি, শুদ্ধ জীবন।’  

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)