চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালে ছোট্ট রূপকথার সৃষ্টিশীলতা

মার্চ মাস। ২০২০ সাল। করোনা মহামারী অন্যান্য দেশের মতো আঘাত হানলো বাংলাদেশেও। শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষার্থে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। শুরু হয় দুর্যোগে ভরা এক নতুন জীবন। শঙ্কা এবং মৃত্যু চিন্তায় মানুষ তখন পাগল প্রায়। সেই সময় সকল শিশু ঘরে বন্দী হয়ে পড়ে।

আজ ১ বছরের বেশি সময় পর ২০২১ সালে এসে প্রশ্ন জাগে- এই দেড়টা বছর কীভাবে কাটলও শিশুদের সময়? সেই উত্তর খুঁজতেই এই লিখার সূত্রপাত। অনলাইন ক্লাসেও যে সকল শিশু সমানভাবে যুক্ত হতে পেরেছিলো এমনটি জোর গলায় বলা যাবে না। এক্ষেত্রে গ্রামের শিশুরা শহরের শিশুদের চেয়ে কিছুটা হলেও উন্মুক্ত হাওয়ায় নিজেদের বেশ সুন্দর ভাবে মানিয়ে নিয়েছে। করোনা মহামারীর এই সময়ে গ্রামের শিশুদের শারীরিক বা মানসিক বিকাশে গ্রামের খোলা মাঠ, পুকুর এবং গাছে ঘেরা উঠানের ইতিবাচক প্রভাব বেশিই ছিলো।

কিন্তু শহরের চার দেয়ালের ফ্ল্যাট বাড়ির শিশুদের না আছে গ্রামের মতো খোলা মাঠ, না আছে পুকুর, না আছে গাছে ঘেরা আঙিনা। পার্কগুলোও ছিলো বন্ধ। কোথাও যাবার কোনো উপায়ও ছিলো না। করোনাকালীন এই দুর্যোগে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের অভাব শহরের শিশুদের আঘাত করেছে বৈকি! প্রাপ্ত বয়স্কদেরও একই বেহাল দশা।

আজ এক ছোট্ট শিশুর গল্প শোনাবো। নাম তার রূপকথা। বয়স ১২। ভিকারুন নিসা নূন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। রূপকথা নামটি শুনলেই মনে হয় অলৌকিক কোনো ঘটনা। তা নয় কিন্তু। রূপকথা নামের অর্থই হলো – ‘যে নিজের কল্পনা দিয়ে নিজের রাজ্য গঠন করে।’ অন্য শিশুদের মতো ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ছোট্ট রূপকথাও ঘরে বন্দী হয়ে পড়ে। তখন রূপকথা পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী, বয়স ছিলো মাত্র ১১।

ঘরে বন্দী মানেই যে মনে বন্দী নয় সিদ্ধেশ্বরী কনিফার টাওয়ারের বাসিন্দা ছোট্ট রূপকথা তার সৃষ্টিশীল ভাবনা আর কাজ দিয়ে করোনাকালীন দুর্যোগে গত দেড় বছরে তা ভুল প্রমাণ করলো। শুরু হলো করোনা মহামারীর এই দুর্যোগে শিশু রূপকথার জীবনকে ঘিরে সৃষ্টিশীল নতুন সব ভাবনা। শুরুতে রূপকথা আর্ট করতো এবং সবাইকে তা উপহার দিতো। কিন্তু এতে ওর মনের খোরক পূরণ হচ্ছিল না যেনো। এদিকে করোনা ভাইরাসে ভীত হয়ে বাসার শিক্ষক, গানের শিক্ষক, আরবি পাঠদানের শিক্ষক সবারই বাসায় আসা বন্ধ। আত্নীয়- পরিজনের সাথেও দেখা করা যাচ্ছিল না। মেয়ে রূপকথার অস্থিরতা দেখে ওর মা সালমা আহমেদ (সহকারী অধ্যাপক, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) রূপকথাকে নিয়ে ছাদে যাওয়া শুরু করলেন। সঙ্গী ছিলো মা, বাসা সহকারী শিউলি, রূপকথার সাইকেল এবং প্রতিবেশি নানু-নানু।

করোনা মহামারীর এই দুর্যোগে এই বদ্ধ ছাদের মাঝেই ছোট্ট রূপকথার স্বপ্ন বুননের শুরু। রূপকথা আবিষ্কার করলো তার এই ছাদেও কিসের যেনো অভাব। রূপকথা প্রায়ই ছাদ থেকে এসে ওর মাকে বলতো কবে যে স্কুলে যাবো। আবারো খেলার মাঠে খেলবো। মা বুঝতে পারতো ছাদ রূপকথাকে আকর্ষণ করছে না। মনে মনে ভাবছিলো মেয়ের মন ভালো করার জন্য এমন কী করা যায় যেখান থেকে শিশু রূপকথা মনের স্বস্তি পাবে। রূপকথার মন ভার দেখে মা একদিন গল্পের ছলে জানতে চাইলেন কীসের শূণ্যতা এই ছাদে রূপকথা বোধ করছে। উত্তরে রূপকথা বলেছিলো – ‘এই ছাদে কোন গাছ নেই, কোনো অক্সিজেন নেই। আমার দম বন্ধ লাগে।’

মা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে রূপকথাকে দেখলো এবং মনে মনে বললো সত্যিই তো এই ছাদে অক্সিজেন নেই। সেদিন মা আদর করে রূপকথার কাছে জানতে চেয়েছিলো- ‘ আমাদের ছাদে অক্সিজেন তৈরি করতে চাইলে আমরা কী করতে পারি?’ রূপকথা চট জলদি উত্তরে বলেছিলো- ‘গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়। আমরা গাছ লাগালে ছাদে অক্সিজেন তৈরি হবে। এই বাড়ির সবাই ঘরে থেকেও প্রচুর অক্সিজেন পাবো। আমাদের কারোই অক্সিজেনের অভাব হবেনা। আমরা ছাদকেই বাগান বানাতে পারি।’ রূপকথার ভাবনা শুনে মা বিস্মিত এই ভেবে যে, এতো ছোট একজন মানুষ করোনা ভাইরাসের এই দম বন্ধ অবস্থায় সবার অক্সিজেন প্রাপ্তির সমাধানে চিন্তিত তা অনুধাবন করে।

বিজ্ঞাপন

এভাবেই ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে প্রাকৃতিক উপায়ে অক্সিজেন তৈরির ভাবনা থেকেই রূপকথার ছাদ বাগানের যাত্রা। করোনার এই বন্দী জীবনে অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি ছাদ বাগান তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শিশু রূপকথা। স্বপ্ন সাজাতে সবসময় সহযোগী হিসাবে পাশে ছিলেন রূপকথার মা। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে মাত্র ১৫টা গাছ দিয়ে রূপকথার ছাদ বাগান সাজানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে গাছের সংখ্যা বেড়ে ২০২১ সালের মে মাসে সেই বাগানে এখন প্রায় ৩০০টি গাছ জায়গা করে নিয়েছে। রূপকথা নিজেই গাছের পরিচর্যা করে। পানি দেয়া থেকে সার দেয়া সবই নিজের হাতে করে। আগাছা পরিষ্কারের কাজটি মাকে সাথে নিয়ে করে। তাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে বাসা সহকারী শিউলি। গাছগুলো কখন যে রূপকথার সন্তান হয়ে গেলো টেরই পাওয়া গেলো না।

স্কুলের নিয়মে অনলাইন ক্লাসও কিন্তু চলছে। সেখানেও রূপকথা মনোযোগী। ক্লাস শেষ হলেই ওর কাজ ছাদে ছুটে গিয়ে গাছের সঙ্গে সময় কাটানো। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিশু রূপকথার গল্পে যুক্ত হলো নতুন আরেক ভাবনা। ছাদ বাগান করতে করতে রূপকথার হঠাৎ নতুন এক আইডিয়া এলো। মাকে একদিন বললো – ‘ছাদে একটা ছোট্ট কবুতরের ঘর বানাতে চাই।’ মা কারণ জানতে চাইলে রূপকথা বলেছিলো- ‘কবুতর শান্তির প্রতীক। ছাদে ওদের ঘর করলে আমাদের বাড়ির সবাই শান্তিতে থাকবো। বাংলাদেশ থেকে করোনা চলে যাবে। আমাদের বাড়ি থেকেও করোনা চলে যাবে। আমরা সবাই সুখে- শান্তিতে বসবাস করতে পারবো।’

মায়ের কাছে রূপকথার কথাগুলো গল্পের কোনো রাজকন্যার মতো মনে হচ্ছিল। করোনা থেকে মুক্তির জন্য কবুতর যে শান্তি আনতে পারে ছোট্ট রূপকথার সেই সম্ভাবনার কথা শুনে মা সেদিন আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েছিলো। মনে মনে মেয়ের জন্য মায়ের সমর্থনের পাশাপাশি মানুষের জন্য যেনো রূপকথা বড় হয়ে কাজ করে এই দোয়াও ছিলো। করোনার এই দুর্যোগে কবুতরের ঘর বানাতে হলে বাইরে যেতে হবে। যেটা প্রায় অসম্ভব ছিলো সেই সময়। মেয়ের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য মায়ের বন্ধুর সহযোগিতায় একটি বারো ক্ষোপের ছোট্ট কবুতরের ঘর বানিয়ে নিয়ে আসা হয় ছাদ বাগানে। মায়ের বন্ধুর পাঠানো আটটি কবুতর দিয়েই কবুতর ঘরের যাত্রা। দুইমাস সেই কবুতর গুলোকে নেটের ভেতর বন্দী রেখে ছাদের পরিবেশের সাথে খাপ-খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। এতেও বাঁধ সাধলো রূপকথা। ওর ছটফট এবং অস্থিরতা দেখে মা একদিন জানতে চাইলেন- ‘ কবুতর চেয়েছো শান্তি ফেরাতে। এখন তো দেখি তুমিই অশান্ত। কী হয়েছে খুলে বলো।’

উত্তরে রূপকথা বলেছিলো- ‘করোনার কারণে আমার মতো কতো শিক্ষার্থী ঘরে বন্দী। কবুতর গুলোর অবস্থাও তো আমাদের মতো বন্দী মা! ওদের ছেড়ে দাও। এই বন্দী জীবন ভালো লাগছে না। ওরা অন্তত স্বাধীনভাবে আকাশে উড়ুক।’ মা বলেছিলো -‘কবুতরগুলো তো এখনো আমাদের পোষ মানেনি। ছেড়ে দিলে ফিরে নাও আসতে পারে।’ উত্তরে রূপকথা বলেছিলো-‘ফিরে না আসলেও আমি কষ্ট পাবো না। আমার মতো বন্দী জীবন কবতুরগুলোর না হউক।’ এই কথা শুনে মা শুধু অবাকই হননি, এই স্বাধীন চিন্তার ধারক ১১ বছরের মেয়ে রূপকথার ভাবনার গভীরতা অনুধাবন করে বিস্মিতও হয়েছিলেন। এও বুঝতে পেরেছিলেন মা বন্দী জীবনে কতোটা হাঁপিয়ে উঠেছে মেয়ে রূপকথা।

২০২০ সালের ১২ নভেম্বর। সেদিন রূপকথার মায়ের জন্মদিন। রূপকথা সকালে মাকে বললো- ‘মা চলো ছাদে যাই।’ মা বললো- ‘কেনো?’ উত্তরে রূপকথা বললো- ‘সারপ্রাইজ!’ ছাদে গিয়েই রূপকথা কবুতরের ঘরের নেটটি খুলে দিলো। এবং খিলখিল করে হেসে বললো – ‘মা তোমার জন্মদিনে কবুতরগুলোকে স্বাধীন করে দিলাম। তুমি নিশ্চয় খুশি হয়েছো।’ একথা বলেই রূপকথা নিজেও কবুতরগুলোর সঙ্গে উড়ে উড়ে বেড়াতে লাগলো। আর মা অবাক নয়নে রূপকথার এই স্বাধীন চিন্তার বহি:প্রকাশ দেখে আবারো আনন্দে আত্মহারা হয়ে রূপকথার পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো। তাদের আনন্দে যুক্ত ছিলো বাসা সহকারী শিউলি। যদিও সেদিন আটটি কবুতরের একটি ফেরত আসেনি। তাতে রূপকথার কোনো আক্ষেপ হয়নি। শুধু বারবার ছাদে গিয়ে খুঁজেছিলো চলে যাওয়া কবুতরটি ফিরে এসেছে কিনা। মা বুঝতে পারছিলো রূপকথার কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সেই কষ্ট ছোট্ট রূপকথা সেদিন খুব কৌশলে লুকিয়ে ফেলেছিলো যা মায়ের চোখ এড়ায়নি। এরপর ডিসেম্বরের শীতে আরো একটি কবুতর মারা গেলো। সেদিন মৃত কবুতরের জন্য রূপকথা খুব কেঁদেছিলো। মৃত কবুতরের পাখনাগুলো এনে একটি কাঁচের বাটিতে সাজিয়ে রেখেছিলো। কবুতর তখন সংখ্যায় ছয়টি। আজ ২০২১ সালের মে মাসে সেই ছয়টি কবুতর সংখ্যায় বেড়ে ২৫টি। রূপকথা ১১ থেকে ১২তে পা দিলো। কবুতরের সংখ্যাও এক বছরে তিনগুণ হয়েছে। সেইসাথে রূপকথার ব্যস্ততাও দিনকে দিন বেড়ে গেছে।

করোনা ভাইরাসের শঙ্কায় যখন থমকে গেছে পুরো বিশ্ব, তখন বাংলাদেশের ছোট্ট রূপকথাও বাইরের জগতের বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছিলো ছাদ বাগান। উদ্দেশ্য অক্সিজেন তৈরি করা। একই সাথে কবুতর যে নিজের বাড়ি এবং নিজের দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনার যে চিন্তা শিশু রূপকথা বিগত দেড়টা বছর ঘরে বন্দী থেকেও ভেবেছে এবং বাস্তবায়িত করেছে এটি সবার জন্য অনুপ্রেরণা তো বটেই। মায়ের সার্বিক সহযোগিতায় রূপকথা এই করোনাকালীন মহামারীর মাঝে থেকেও মনের সকল ভয় দূর করে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে যেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পেরেছে এই গল্প থেকে অন্য শিশুদেরও কিছু ভাবনার পরিবর্তন আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস। রূপকথার গল্পের মতো অন্য শিশুরাও বিকল্প এবং সৃষ্টিকাজে উদ্বুদ্ধ হউক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

একই সাথে প্রত্যেকটি পরিবারের বয়োঃজ্যোষ্ঠ সদস্যদের প্রতি অনুরোধ থাকবে আপনাদের পরিবারের সকল শিশুর মনের যত্ন নিন। যার যার সাধ্য মতো করোনার এই দুর্যোগকালীন সময়ে পরিবারের ছোট্ট শিশুদের মনের জোর বাড়াতে রূপকথার মতো স্বপ্ন বুননে সহযোগিতা করুন। স্বপ্ন তৈরিতে সহযোগিতা করুন। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল কাজের বিকল্প নেই। করোনার এই দুর্যোগে প্রতিটি বাড়ি, মহল্লা এবং এলাকায় অবস্থানরত সবার মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা বাড়াতে হবে। কেননা একজন যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তবে সেই সহযোগিতায় পাশের মানুষটি কিছুটা হলেও সাহসী হয়ে করোনা যুদ্ধ মোকাবেলা করতে পারবে সাহসের সাথে।

করোনা মাহামরীর এই দুর্যোগে ছোট্ট রূপকথার ঘরের বন্দীত্ব দূর করে মনের আলো বাড়াতে এবং গাছের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরির করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকবার বিকল্প ভাবনাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। ছোট্ট রূপকথার ছোট ছোট স্বপ্ন আরো ছড়িয়ে পড়ুক দেশ থেকে দেশান্তরে। রূপকথার মতো সকল শিশু করোনার এই দুর্যোগে জীবনের বিকল্প সৃষ্টিশীল ভাবনাগুলো নিয়ে এগিয়ে যাক করোনা বিহীন জীবনে এই প্রত্যাশা থাকলো।

বিজ্ঞাপন