চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালীন বৈষম্য: গরীবের শক্তিতে ধনীর ভক্তি

‘হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান!
তুমি মোরে দানিয়েছো খ্রিষ্টের সম্মান।

করোনা দরিদ্র মানুষদের জীবন-জীবীকার দারুন এক টানাপোড়েনের অপর নাম। তাদের নিয়ে ধনী মানুষদের টানাটানির খেলাকে আমরা নাম দেই অর্থনীতি বাঁচানোর সংগ্রাম। করোনা আক্রান্ত হয়ে কখন মৃত্যু হবে সেই অপেক্ষায় থাকার সুযোগ দেশের ২ কোটি দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষদের নেই, কখনো ছিলো না। প্রতিদিন বেঁচে থাকায় যেখানে নিয়ত সংগ্রামের সেখানে জীবন আগে নাকি জীবিকা আগে এসব মধ্যবিত্তিয় এবং উচ্চ বিত্তিয় আওয়াজ তাদের কাছে নিষ্ঠুর প্রলাপ।

বিজ্ঞাপন

সেই প্রলাপের ধারাবাহিকতায় তাদের আসা যাওয়ার খেলা চলে, বেতন না পেলে রাস্তায় বিক্ষোভ করা লাগে। খাবারের জন্য হা করে ফুটপাতে বসে থাকতে হয়। জীবন যাদের নিয়ত বেঁচে থাকার সংগ্রামের তারা খ্রিষ্টের সম্মান পেলো কি পেলো না সেই চিন্তা করার সুযোগ কই। যদিও তৈরী পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতির সত্য বচন, গরীবরা শক্তিশালী তাই তারা করোনা আক্রান্ত হন কম। যেখানে ধনীরাই ঠিক মতো টেস্ট করতে পারছে না সেখানে গরীবের তো সুস্থ থাকার অভিনয় করা ছাড়া আর কী করার থাকে!

পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের বিখ্যাত লাইন, ‘ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে তাকে এখানে খুঁজে পাওয়া যাইবে না।’

ভদ্র পল্লীতে থাকতে থাকতে ঈশ্বর এই প্রথম বেশ টায়ার্ড হয়ে গেলেন মনে হয়। তাই তিনি নোংরা এঁদা গন্ধ ভরা, একই বাসায় চার থেকে আটজন থাকা গার্মেন্টস পল্লীতে আশ্রয় নেন। যেখানে শারীরিক দূরত্ব এক ধরনের অলীক কল্পনা, যাদের কাছে লকডাউন পেটের উপর সজোর লাথি; মাস্ক, স্যানিটাইজার, স্বাস্থ্যবিধি যেনো মড়ার উপর খাড়ার ঘা। তিন বেলা ঠিক মতো খেতে পাওয়া যেখানে ভয়ংকর এক ১৪-১৮ ঘণ্টার নির্মম কর্ম, যেখানে টয়লেট ব্যবহারে সকাল সকাল দীর্ঘ লাইন সেখানে রাষ্ট্র থেকে টেলিভিশনে প্রতিদিন বলে যাওয়া স্বাস্থবিধির শব্দ পৌঁছানোর সুযোগ কৈ। পৌঁছালেও সেটি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়া ছাড়া আর কিইবা করার থাকে! তখন ঈশ্বরকে সঙ্গী করে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া কি উপায় থাকে!

সাম্যের মুক্তিযুদ্ধ বৈষম্যের বাংলাদেশ দ্বিধাগ্রস্থ প্রজন্ম

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হও উদ্যোক্তা হও এক অস্থির উন্মদনা চলেছে। এখনো তার রেশ আছে। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভার প্রজন্মের মধ্যে যেকোন প্রকারে কোটিপতি হওয়ার নেশা জাগে। কোন মতে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় যেতে পারলে নীতি নৈতিকতা শিকেয় তুলে কমিশন ব্যবসায় নেমে পড়া। অথবা তথাকথিত ইভেন্ট ব্যবসায় নেমে কিছু দিয়ে টাকাওয়ালা হওয়ার মওকা। রাষ্ট্রীয়ভাবে অনৈতিকতা এতটাই প্রশ্রয় পায় কোটিপতি হওয়ার তালিকায় শীর্ষে চলে আসে বাংলাদেশ।

খবরটি পত্রিকার হেডলাইন হিসেবে যতটা আকর্ষনীয় বৈষম্য বাড়াতে ততটাই উপকারী। ভোগবাদী অর্থনীতির ছুয়ে পড়া তত্ত্বে এইসব কোটিপতিদের টাকা নিচের দিকে না পড়ে উড়ে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পত্রের মুল স্লোগান সাম্য , মৈত্রী, স্বাধীনতা যেনো পাল্টে যায় লুটপাট, কমিশন কোটিপতি হওয়ার প্রতিযোগিতায়ন। বৈষম্যের জিনি কোইফিশিয়েন্টের হিসাবও গরমিল হয়ে যায় কোটিপতি সংখ্যা বাড়ানোর খেলায়। একটা রাষ্ট্রের উন্নয়ন যে কোটিপতির হিসাবে চলে না সেটি বুঝতে তখন করোনাকে ড্রাইভিং সিটে বসতে হয়।

বিজ্ঞাপন

বিচারের মা মারা গেছে
কিভাবে আমরা এমন পর্যায়ে এলাম! একটি দেশ দিনের পর দিন উর্ধ্বমূখী জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে রীতিমতো উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার রুদ্ধশ্বাস দৌড়ে ছিলো। সেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অতল গহ্বরে। ঢাল তলোয়ারহীন এক যুদ্ধে আমরা ডাক্তারদের পাঠিয়ে তাদের কাছে আশা করি উন্নত চিকিৎসা । বেসরকারী হাসপাতালের নামে স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকারকে ছেড়ে দিই ব্যবসায়ী আর কসাইদের হাতে। রাষ্ট্রকে ছেড়ে দিই তথাকথিত এধারকা মাল ওধারকা করা ট্রেডারদের কাছে। যারা শিখে গেছে উৎপাদন নয়, চায়না থেকে মাল এনে জাস্ট বিক্রি করে দাও আর মাঝখানে লুফে নাও মুনাফা। বাংলা ভাষায় ফড়িয়াদের এমন দৌরাত্ম করোনাকালে মাস্ক, স্যানিটাইজার ওষধ সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের যেনো চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কোন কাজ নেই।

রাষ্ট্রের আগে বা পরে সমাজে কোন উৎকর্ষ থাকে না, সারাক্ষণ ভয় কখন ভয়ংকর মৃত্যু হয়। এবং মানুষের জীবন খুব একাকী, বিশ্রী, পাষবিক ও নিরর্থক। করোনাকালে আমরা যখন মুমূর্ষূ স্বজনের লাশ নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াই এবং অবশেষে তোথাও কোন অবলম্বন না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে প্রিয়জন তখন সত্যি মনে হয় রাষ্ট্র তুমি কোথায়?

রাষ্ট্র আমরা তৈরী করেছিলাম জীবনকে আরেকটু সুন্দর, আরেকটু শৃঙ্খল, আরেকটু ন্যায্য করার জন্য। রাজ্য যখন বিচার প্রাপ্তির অধিকার, মৌলিক চাহিদার যোগানে ঘাটতির পাশে সুরম্য অট্টালিকা, কোটিপতি বাড়ানোর এক অবিমৃষ্য দৌড়কে উৎসাহিত করে। তখন নৈরাজ্যই সত্য হয়ে যায়। ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা সবখানে তাদের লাভের উৎকট গন্ধে বিভোর থাকে। রাষ্ট্রের একটি অংশ ক্ষমতার অপব্যবহারে কমিশনে কোটিপতি হওয়ার ধান্ধায় নামে। সাধারণ মানুষের জীবন তখন চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি মরে গেলে ছাড়া কিছু করার থাকে না। অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সবকিছু বাণিজ্যের অপর নাম হয়ে যায়। তখন আমাদের বলতে হয় রাষ্ট্র তুমি কোথায়? তুমি কি শুধুই টেলিভিশনে আর ফড়িয়া ধনীদের পকেটে?

করেনাকাল আমাদের রাষ্ট্রে গোকুলের মতো বেড়ে ওঠা নৈরাজ্যকে উলঙ্গ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র যে নগ্ন দড়িবাজদের খপ্পরে পড়েছে সেটি বুঝতে এখন আর কারো অসুবিধা হচ্ছে না। তখন আবারে নজরুলের দরিদ্রকে শক্তিমান না করে আশায় ভেলা ভাসিয়ে জোর হাকতে হয়.

কে আছো জোয়ান হও আগুয়ান হাকিয়ে ভবিষ্যত
এ তুফন ভারি দিতে হবে পাড়ি
নিতে হবে তরী পার।

‘গরীবের শক্তি’ আসলে তার উপায়হীনতা ছাড়া কিছু নয়। নিজেদের বৈষম্যের ব্যবসাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতির ভিত্তি দেখিয়ে সুবিধা আদায়কারী ধনী মানুষেরা এখন তাই নতুন স্লোগান দিচ্ছেন, গরীবেরা শক্তিশালী তাই তাদের করোনা হয় না। যেনো কোভিড-১৯ একটি সাম্যবাদি রোগ যেটি কমিউনিস্ট চায়না রপ্তানি করেছে।

প্রকৃত অর্থে দরিদ্র কোন আশীর্বাদ নয় সেটি অভিশাপই। করোনায় কিছু ধনী মানুষের মৃত্যু আমাদের অক্ষমের মিথ্যা স্বান্ত্বনা দিচ্ছে বটে। এই স্বান্ত্বনায় হয়তো এক ধরনের শান্তি আছে কিন্তু স্বস্তি নেই। রাষ্ট্রকে তার ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা না গেলে আমরা রাজ্য নয় নৈরাজ্যের বাংলাদেশই হব। যেখানে ফড়িয়ারা হবে নীতিনির্ধারক, জনগণ হবে বানিজ্যের জন্য এক একজন ভোক্তা সংখ্যা। তার বাঁচা-মরার হিসাব নিয়তির নির্মম খেলার বলি। মৌলিক চাহিদা, অধিকার এসব যেনো ফড়িয়া-ক্ষমতাবানদের দুষ্টচক্রে ব্যবসার সুযোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)