চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কংগ্রেসের অস্তিত্বই কি হুমকির মুখে?

ভারতে গত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে নরেদ্র মোদির বিজেপির বিশাল বিজয়ের পর কংগ্রেস এবং নেহরু-গান্ধীর উত্তরসূরীরা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি কংগ্রেসের অস্তিত্ব হুমকির মুখে কিনা এমন প্রশ্নও উঠছে।

রাহুল গান্ধীর বাবা রাজীব গান্ধী’র নানা জওয়াহারলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের সেবা করেছেন।

রাহুল গান্ধীর দাদী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বাবা রাজীব গান্ধী ছিলেন ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী।

২০১৪ সালে নির্বাচনের ফল দেখে বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, ওই নির্বাচন ছিলে কংগ্রেসের জন্য কলঙ্কজনক একটা নির্বাচন। কিন্তু বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের ফল দেখে কংগ্রেস তো বটে বিশ্লেষকরাও হতবাক। সর্বশেষ নির্বাচনে দল হিসেবে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৫৪টি আসন, যেখানে নরেদ্র মোদির বিজেপি পেয়েছে ৩শ’ ২টি আসন।

কংগ্রেসের অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়েছে তাদের নির্বাচনী দূর্গতেই। কেরালায় আরেকটি আসনে ভোটে না দাঁড়ালে হয়তো রাহুল গান্ধীর জন্য পার্লামেন্ট ভবনের দরজাটাই বন্ধ হয়ে যেত! কংগ্রেসের তথা গান্ধী পরিবারের নির্বাচনী দূর্গ জয় করেছেন বিজেপি’র স্মৃতি ইরানী। তার এই ব্যাপক সাফল্যে স্মৃতিকে মোদির মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেয়া হবে বলেও কানাঘুষা চলছে।

আমেথি ছিলো কংগ্রেসের জন্য মর্যাদার লড়াই। এই আমেথিতে নির্বাচন করেছেন রাহুলের মা সোনিয়া এবং বাবা রাজীব গান্ধী। রাহুল নিজেও এর আগে এই আসনে জিতে এসেছেন। গত ১৫ বছর ধরে কংগ্রেসের দখলে ছিলো এই নির্বাচনী আসন। ভোটের প্রচারপত্রেও লেখা হয়েছে ‘আমার আমেথি পরিবার’। কিন্তু সেই আবেগময় পরিবার রাহুলের ডাকে সাড়া দেয়নি এবার।

উত্তর প্রদেশের এই আসনটি ভারতের রাজনীতি’র প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত। এ আসনে যিনি নির্বাচিত হন তিনিই ভারত শাসন করেন বলে ধারণা করা হয়। এই বিশ্বাসটি এমনি এমনি তৈরি হয়নি।

ভারতের ১৪ জন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ৮ জন এসেছেন এই রাজ্য থেকে। ৮ জনের মধ্যে রয়েছেন রাহুলের বাবা এবং বাবা’র নানা। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যে নির্বাচনী আসন মোট ৮০টি। সারা ভারতের নির্বাচনী আসন মোট ৫৪৫টি।  এমনকি নরেন্দ্র মোদিও গুজরাট থেকে এসেছেন। কিন্তু ২০১৪ সালে নির্বাচনে তিনি ভারতের প্রাচীন নগর বারানসি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস আহামরি ভাল ফল পাবে সেটা সাধারণ চিন্তা থেকেও কেউ আশা করেনি। তবে কংগ্রেস ২০১৪ সালের তুলনায় ভাল করবে বলে ধরে নিয়েছিলো। কিন্তু ফল ঘোষণার পর কংগ্রেসের ভেতরে বাইরে সবাই হতবাক হয়েছে। মানুষ নতুন করে ভাবতে বসেছে, এবারের নির্বাচন কী ইঙ্গিত করছে? ভারতে কি গান্ধীযুগের অবসান হতে যাচ্ছে নাকি কংগ্রেসের ভবিষৎই অন্ধকার?

এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেস আসলে কী চায়?
ভোটের ফল ঘোষণার দিন সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করেন কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধী। সেখানে জনতার রায় মাথা পেতে নেন রাহুল। একই সঙ্গে কংগ্রেসের ভরাডুবির যাবতীয় দায়ও নিজকাঁধে নেন তিনি। সংবাদ সম্মেলন চলাকালে তখনও আমেথির চূড়ান্ত ফল ঘোষণা বাকি, রাহুলের চেয়ে প্রায় ৩ লাখ ভোটে এগিয়ে ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতি ইরানী। ফল ঘোষণার আগেই স্মৃতির কাছে পরাজয় মেনে নেন রাহুল। অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘এটাই গণতন্ত্র, আমি জনরায়কে শ্রদ্ধা করি।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে রাহুল বলেন, ‘জয়ী বা পরাজিত কারো হতাশ হবার কিছু নাই। ভীত হবারও দরকার নাই। আমরা যার যার কাজ চালিয়ে যাব। কাজের পথ ধরেই আমরা জিতবো।’

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কংগ্রেস অনুসারীদের কাছে জয়ের এই আশা সুদূর পরাহত মনে হচ্ছে। দলেরই কেউ কেউ বলছেন, ‘আমরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছি। আমাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি জনগণের কোন আস্থা নেই। আমরা যা বলি সেটা মানুষ বিশ্বাস করে না।’

তারা এমনও বলছেন, ‘মোদি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মানুষ তারপরও মোদিকেই বিশ্বাস করছে।’ কিন্তু মানুষ কেন মোদিকেউ বিশ্বাস করছে সে প্রশ্নের জবাব নেই কংগ্রেস অনুসারীদের কাছে।

কংগ্রেসের ভরাডুবি রাহুলের নেতৃত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাগিদ দিচ্ছেন। তবে এই তাগিদটা বরাবরের মতো দলের বাইরে থেকেই আসছে। এবং দলের উচ্চ পর্যায়ে থেকে না নাকচ করা হচ্ছে। নিন্দুকেরা কেউ কেউ বলছেন, সোনিয়া রাহুলকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতা মনি শঙ্কর আয়ার সেই গুজবকে নাকচ করে দিয়েছেন।

গুজব নাকচ করলেও রাহুল শেষ পর্যন্ত দলের বাইরের মানুষের দাবিকে সত্যি করে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। কিন্তু দলের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সে পদত্যাগের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে।

নেতাদের কেউ কেউ দাবি করছেন, গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার কংগ্রেসের পরাজয়ের মূল কারণ নয়। বড় দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং দুর্বল প্রচারণা বেশী দায়ী। দলের কাঠামোতেই দুর্বলতা আছে বলে তারা মনে করছেন। প্রচারণার জন্যও দেরিতে মাঠে নেমেছেন না। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় দলগুলো নিয়ে জোট গঠন না হলেও, জোট গঠনের প্রচেষ্টা ছিলো খুবই খারাপ পদক্ষেপ।

ব্যক্তিত্বের লড়াই
দলের লোকজন প্রকাশ্যে না বললেও গোপনে হয়তো স্বীকার করবেন, মোদি ব্রান্ডের কাছে ব্যক্তিত্বের লড়াইয়ে পরাজিত রাহুল। কংগ্রেস নেতা ব্রিজেন্দ্র কুমার সিং বলছেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হলেও নরেন্দ্র মোদি ভোটারদের মন রক্ষায় সক্ষম হয়েছেন। মোদির কাছে ব্যক্তিত্বের লড়াইয়ে এটাই রাহুলের প্রথম পরাজ নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনেও বিজেপির কাছে হেরেছে কংগ্রেস।

রাহুলের নাগাল পাওয়া যায় না বলেও সমালোচনা রয়েছে। অর্থাৎ এলাকার মানুষের সঙ্গে তিনি বিচ্ছিন্ন থাকেন। নিন্দুকদের অনেকে বলেন, কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন রাহুল, যোগ্যতা দিয়ে নয়। দলের নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ রাহুলকে অতি সাধারণ মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করেন। তাদের বিশ্বাস রাহুলের মধ্যে নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি বা প্রজ্ঞা নেই। এক অর্থে সর্বশেষ নির্বাচনের ব্যর্থতাকে অতি গোপনে গান্ধী পরিবারের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন, সুদূর অতীতে নেহরু এবং ইন্দিরা ভারতে কোন কোন অবদান রেখেছেন সেটা নিয়ে শহুরে ভোটারদের কোন মাথাব্যথা নেই। তারা বরং ২০০৪ থেকে ২০১৪ তে কংগ্রেস কী কী দুর্নীতি এবং বিতর্কের সঙ্গে জড়িত সেগুলো বেশি বিশ্লেষণ করছেন। এসবই এখন তরুণদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দেশ নিয়ে রাহুল কী কী স্বপ্ন দেখেন সেটা নিয়ে তরুণদের কাছে তথা দেশবাসীর কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

মোদি-প্রিয়াংকা-লোকসভা নির্বাচনগান্ধীদের নব নব জন্ম হয়
সকল আলোচনা-সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব বলছে, দলের ভরাডুবির জন্য রাহুল এককভাবে দায়ী নন। দলের এক কর্মী মনে করেন, রাহুলের দরকার একজন অমিত শাহ। নানা সমালোচনা হলেও গত দুবছরে ধীরে ধীরে আলোচনায় আসতে সক্ষম হয়েছিলেন রাহুল। সামাজিক মাধ্যমেও সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। সরকারের বিতর্কিত মুদ্রা বাতিলের সিদ্ধান্ত, কর্মসংস্থানের অভাব, অর্থনৈতিক মন্দা ইত্যাদি বিষয়ে জনমত গড়ে তুলেছিলেন।

রাজস্থানের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে কংগ্রেস জয় পাওয়ার পর তার উপস্থিতি আরো জোরদার হচ্ছিলো। ফেব্রুয়ারিতে বোন প্রিয়াঙ্কা দলের কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্যে কাজ শুরু করলে পরিস্থিতি আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ধারণা করা হচ্ছিলো গান্ধী পরিবার এবার কিছু ঘটাতে যাচ্ছে। দলের একটা বড় অংশের বিশ্বাস ছিলো যে, দলকে উদ্ধার করতে হলে একমাত্র প্রিয়াঙ্কার পক্ষেই সেটা সম্ভব।

সূত্র: বিবিসি

বিজ্ঞাপন