চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একজন অপদার্থ বাবা

বছর দুই বছর আগে ‘একজন ফালতু বাবা’ শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখার বিষয়বস্তু ছিলো বাচ্চাদের লেখাপড়ার ছুঁচোর দৌড় প্রতিযোগিতা। তাদেরকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর তালে আমরা কিভাবে তাদের জীবনকে বিষয়ে তুলি সেই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলাম। সাথে এসেছিলো বিশ্বব্যাপী শিক্ষার বর্তমান স্বরূপ। পাশাপাশি এসেছিলো ‘শ্যাডো এডুকেশন’র মাত্রা। অবস্থা দৃষ্টে মনেহয় শ্যাডো এডুকেশনই এখন আসল এডুকেশন। আর মূল শিক্ষা ব্যবস্থা শুধুমাত্র একটা ফর্মালিটিজ।

অবশ্য পৃথিবীর সব দেশে শ্যাডো এডুকেশন সমানভাবে তার থাবা বসাতে পারেনি। আর একটা দেশের সব মানুষ শ্যাডো এডুকেশনকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি। যেমন অস্ট্রেলিয়াতে যাদেরকে আমরা অজি বলে থাকি তারা একাডেমিক এডুকেশনটাকেই তেমন গুরুত্ব দেয় না শ্যাডো এডুকেশন তো অনেক দূরের ব্যাপার। বরং তারা কারিগরি শিক্ষাটাকে অনেক গুরুত্ব দেয়। কারণ কাজের ক্ষেত্রে হাতেকলমে প্রাপ্ত কারিগরি শিক্ষাটা অনেক বেশি দরকারি।

একগাদা ডিগ্রি নিয়ে মগজের উপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে দিন আনি দিন খাইয়ের জন্য কারিগরি শিক্ষা খুবই মানানসই। কিন্তু আমাদের মতো দেশে বছর বছর ডিগ্রি নিয়ে মানুষ বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ায় কিন্তু কেউই কারিগরি শিক্ষা নিয়ে প্লাম্বার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, কার্পেনটার হতে চাই না। কারণ এগুলোকে ছোট লোকের কাজ হিসাবে গণ্য করা হয়। আর এগুলোর বাংলা শব্দগুলোও খুব বেশি সম্মানজনক না তাই মানুষ তেমন একটা আগ্রহ পায় না। যেমন প্লাম্বারের সহজ বাংলা করলে দাঁড়ায় মেথর।

আমাদের দেশে সমাজের সবচেয়ে নিচু তলার মানুষ হচ্ছে এই মেথর সম্প্রদায়। তাদেরকে এতটাই অচ্ছুৎ গণনা করা হয় যে তাদেরকে কোন কিছু ছুঁতে পর্যন্ত দেয়া হয় না। তারা যদি কোন কিছু ছুঁয়ে দেয় আমাদের মতে সেটাও অচ্ছুৎ হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াতে আমার জানামতে প্লাম্বারদের ঘণ্টাপ্রতি বেতন অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি। আর এখানে তাদের সম্মানও আছে।

এই পেশাগুলোর একটা আলাদা নামও আছে – ‘ট্রেডি’। এই ট্রেডিদের জীবন যাপন আমাকে খুবই আকর্ষণ করে। উনাদের একটা বড় ইউট (ছোট ট্রাকের মতো যান) থাকে। যার পেছনে সকল সরঞ্জাম নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এক একটা ইউট যেন এক একটা অফিস। আর এক একজন ট্রেডি তিনি নিজেই তার অফিসের বস। নিয়মিত সকাল সাড়ে সাতটায় কাজ শুরু করেন আর বিকেল সাড়ে তিনটায় কাজ শেষ করেন। এর বাইরের সময়টুকু পরিবার পরিজনের সাথে কাটান। বছরান্তে ছুটি কাটাতে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ান। টাকা জমিয়ে আমাদের মতো প্রতি বছর বাড়ি কিনে মগজের উপর চাপ সৃষ্টি করেন না।

প্রবাসী বাংলাদেশি প্রজন্ম দেশ বদলালেও খাসলত বদলাননি। তিনি নিজে যেহেতু দেশে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেননি তাই ছেলে মেয়েকে এইবার ডাক্তার বানিয়েই ছাড়াবেন। আর যারা নিজেরা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার তাদেরকে নিজেদের স্ট্যাটাস ধরে রাখার জন্য হলেও ছেলে মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করতে হবে। এমনই একটা মনোবাঞ্ছা মোটামুটি সব প্রবাসী বাংলাদেশির মনেই কাজ করে। কারণ তাদের ভাষ্যমতে ট্রেডি হলো ছোট লোকদের কাজ। কিন্তু তারা ভুলে যান একটা দেশ চালাতে গেলে সব পেশারই মানুষের দরকার হয়।

আর বর্তমানের এই পৃথিবীতে কোন কাজকেই ছোট করে দেখার উপায় নেয়। যেমনঃ এখানে যদি আপনি কোন অফিসে ক্লিনিংয়ের কাজ করেন তাহলে আপনাকে ততটাই সম্মান দেয়া হবে যতটা সেই অফিসের বস সম্মান পান। এবং তারা আপনার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এটাও বলবেনঃ তোমরাই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে মহৎ কাজ করতেছো কারণ তোমরা না থাকলে এই পৃথিবীটা কবেই ডাস্টবিন হয়ে যেত।

যেহেতু ছেলেমেয়েদেরকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে হবে তাই সব অভিভাবকই তাদের সন্তানদেরকে শ্যাডো এডুকেশনের ছুঁচোর দৌড়ে শামিল করে দেন। অস্ট্রেলিয়াতে প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে বছর বছর কোন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না। অবশ্য প্রাইভেট স্কুলগুলোর কথা আলাদা বিশেষকরে প্রাইভেট মুসলিম স্কুলগুলো একেবারে যেন বাংলাদেশের স্কুলগুলোর অস্ট্রেলিয়ান সংস্করণ। এতো বেশি হোমওয়ার্ক দেয়া হয় যে বাচ্চাদের আর অন্যকিছু করার সময় থাকে না।

তবে চতুর্থ শ্রেণীর পর একটা পরীক্ষা হয় যার নাম ওসি (অপরচুনিটি ক্লাশ) পরীক্ষা। এটাতে ভালো করলে ভালো স্কুলে প্লেসমেন্ট হয়। আর ষষ্ঠ শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় একটা পরীক্ষা হয় যার নাম সিলেকটিভ স্কুল টেস্ট যেটাতে ভালো করলে সপ্তম শ্রেণীতে ভালো হাইস্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পাওয়া যায়। এইসব পরীক্ষা নিয়ে আমাদের অভিভাবকেরা একেবারে বাংলাদেশের মতো করে আদাজল খেয়ে লেগে থাকেন তার সন্তানের পেছনে। এবং গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি যদি এখানে কোনভাবে প্রশ্ন ফাঁস করার উপায় থাকতো উনারা সেটারও চেষ্টা করতেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বরাবরই মনেকরি একটা বাচ্চাকে সবসময়ই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেয়া উচিত। তাদের উপর বাড়তি চাপ দিলে কখনওই ভালো কিছু হবে না। হয়তোবা সে একদিন অনেক টাকা পয়সার মালিক হবে কিন্তু সুকুমার গুণগুলোর আর বিকাশ ঘটবে না। যেটা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষত। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে মগজের ধারণ ক্ষমতা যখন বাড়বে তখন সে এমনিতেই অনেক বেশি পড়াশোনার বোঝা নিতে পারবে। কিন্তু আমরা ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে এর চেয়ে ওর চেয়ে ভালো করার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠার পথ বন্ধ করে দিই।

বিজ্ঞাপন

আমাদের মেয়েটাকে আমি সবসময়ই চাইতাম একটা স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বড় করে তুলতে। প্রবাসে পাড়ি দেয়ার অনেকগুলো কারণের এটাও ছিলো একটা কারণ যে ওরা প্রতিযোগিতাহীন একটা সুস্থ্য সুন্দর জীবন পাবে। তাই আমি কখনওই ওকে পড়াশোনা নিয়ে বাড়তি চাপ দেইনি। স্কুলে যা পড়ে আসে তাই শেষ। পড়াশোনা নিয়ে বাসায় কোন ঝামেলা করিনি কখনও। মেয়ের মা চাইলেও আমি ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতাম। যারফলে সে পড়াশোনাটা করে নিজের খুশিমতো। এর ফলাফলও হাতেনাতে পাওয়া যেতো। স্কুলে বছর শেষের অনুষ্ঠানে সেইসব বাচ্চাদের বাবা মাকে চিঠি দিয়ে দাওয়াত করা হয় যাদের ছেলেমেয়েরা কোন না কোন একটা পুরুস্কার পায়। আমরা একবারই তেমন একটা চিঠি পেয়েছিলাম। সেবার সে স্কুলের লাইব্রেরী থেকে সবচেয়ে বেশি বই ধার নেয়ার জন্য একটা পুরুস্কার পেয়েছিলো।

এরপর আসলো ওসি টেস্ট। সেখানেও মেয়েটা যথারীতি অংশ নিতে চাইনি। আমি বলেছিলাম শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার জন্য পরীক্ষাটা দাও। ফলাফল নিয়ে চিন্তা করো না। ফলাফল আমার ইমেইলে এসেছিলো এবং আমি সেই ইমেইল ডিলিট করে দিয়েছিলাম। তারপর আসলো সিলেকটিভ স্কুল টেস্ট। যথারীতি মেয়ে বাগড়া দিয়ে বসলো। এইবারও আমি বললাম অভিজ্ঞতাটা নিয়ে রাখো। এগুলো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। এইবারও ফলাফল মোটামুটি পূর্ব নির্ধারিতই ছিলো। যারফলে আমাদেরকে বিভিন্ন হাইস্কুল বরাবর আবেদন করতে হলো। এতে একটা লাভ হলো। আমরা বাপ বেটি গোটা তিনেক স্কুলে মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে দিলাম। আমি মেয়েকে বললামঃ দেখো তুমি অন্যদের থেকে এগিয়ে গেলে। তখন সে জিজ্ঞেস করলো কিভাবে? আমি বললাম এই যে তুমি ভাইভা দিলে। এখন তুমি জানো কিভাবে ভাইভা দিতে হয়। এই অভিজ্ঞতাটা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।

আমি সবসময়ই চাইতাম মেয়েটার একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি হোক যেন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। ছোটবেলা থেকেই এই প্র্যাকটিসটা করার ফলে এখন আর তার উপর কোন কিছু সহজেই চাপিয়ে দেয়া যায় না। বেশি চাপাচাপি করলেই সে বিদ্রোহী হয়ে উঠে। এটা বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য আসলে খুবই জরুরী একটা বিষয়। কোন মেয়েকে কোন সিদ্ধান্ত যেন তার বাবা, মা বা ভাই চাপিয়ে দিতে না পারে। সেদিন মেয়ের মা বলছিলো যতই বড় হচ্ছে ততই বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। আমি বললামঃ এটাই স্বাভাবিক কারণ ও একটা আলাদা সত্তা, ওর সবকিছুই হবে তোমার আমার চেয়ে আলাদা।

মেয়েটার বড় হয়ে উঠার প্রক্রিয়াটাকে আমি সবসময়ই চাইতাম স্বাভাবিক রাখতে। সে যেন তার সহপাঠিদের সাথে বন্ধু বৎসল আচরণ করে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে। আমার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে সে ভাবনা শেয়ার করে। এটা আমাকে খুবই আপ্লুত করে। মাঝে মধ্যে স্কুল থেকে ফিরে কোন সহপাঠি কি করেছে তার বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞেস করে তার কি করা উচিত ছিলো। আমি বলি আসলে কোন কিছুই আগে থেকে ঠিক করে রেখে করা যায় না। পরিস্থিতি বুঝে কাজ করতে হয়।

আর বন্ধুত্বের স্বরূপ বুঝাতে আমি একদিন বললামঃ আমার যেমন চরম আস্তিক বন্ধু আছে তেমনি চরম নাস্তিক বন্ধুও আছে। আমি এদের কাউকেই ত্যাগ করবো না কারণ তারা আমার বন্ধু। তাদের সব ভাবনার সাথে হয়তোবা আমি সবসময় একমত নাও হতে পারি কিন্তু তাদেরকে ছেড়ে যাবো না। যদি ওদের কোন মতের সাথে আমার না মিলে তাহলে আমি চুপ করে থাকবো। আর একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যদি কোন মানুষ বিপদে পড়ে তাহলে তোমার সর্বোচ্চ সাধ্য অনুযায়ী তাকে সাহায্য করতে হবে।

আর লেখাপড়া নিয়ে আমার মতামত খুবই পরিষ্কার। এখানে ছেলেমেয়েরা হাইস্কুলে থাকতেই পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করে। যারফলে কোন একটা ডিগ্রি যখন শেষ হয় পাশাপাশি চার পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতাও হয়ে যায়। যারফলে পরবর্তিতে যখন প্রফেশনাল জবে ঢুকে তখন সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

আর উচ্চতর শিক্ষাটা এখানে মোটেও বোঝা না। কেউ চাইলে ট্যাফে (টেকনিক্যাল এন্ড ফারদার এডুকেশন) থেকে একটা কোর্স করে যেকোন জীবিকা পছন্দ করে নিতে পারে। পরবর্তিতে যদি তার আরও পড়তে ইচ্ছে করে তাহলে কাজের পাশাপাশি সেটাও করতে পারবে। আর এখানে কেউই সারাজীবন একই পেশায় কাজ করে জীবনটাকে পানসে বানিয়ে ফেলে না। বরং জীবনের যেকোন পর্যায়ে যেয়েই একটা ডিপ্লোমা কোর্স করে পছন্দনীয় পেশায় কাজ শুরু করে।

যাইহোক এ বছর সে প্রাথমিক শেষ করে পরের বছর মাধ্যমিক শুরু করবে। বস্তুগত অর্জনের দিক দিয়ে দেখলে মেয়েটার তেমন কোন অর্জন নেই। বছর বছর স্কুল থেকে একগাদা সার্টিফিকেট পায়নি। ওসি টেস্টে ভালো করে ভালো স্কুলে ক্লাশ করেনি। সিলেকটিভ স্কুল টেস্টে ভালো করে ভালো স্কুলে মাধ্যমিক পড়ার সুযোগ পায়নি।

কিন্তু অন্যদিকের অর্জনগুলোও কি কম। সহপাঠিরা তাকে প্রচণ্ড রকমের পছন্দ করে। সে এই বসয়সেই কয়েকশ বই পড়ে ফেলেছে আর সেটা অবশ্যই পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই যেটাকে আমরা আউটবুক বলি। নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শিখে গেছে। আমাদের প্রচলিত ধ্যান ধারণায় মেয়েটা মোটামুটি গোল্লায় চলে গেছে। আর এর পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান আমার। তাই ইদানিং মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধী মনেহয় । মনেহয় আমি যেন একজন পুরোপুরি অপদার্থ বাবা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন