চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ইমদাদুল হক মিলন: আজ মানুষটার জন্মদিন

এক
এই মানুষটাই একদিন তার বাসায় বুকে আগলে ধরে আমাকে বলেছিল,
‘লেখক হইতে গেলে বিদেশে পইরা থাকলে হইব না। কষ্ট হইলেও দেশে ফিরা আইতে হইব…’

তখন আমি ইতালিতে থাকি। প্রতি বছর ছয়-আট সপ্তাহের জন্য দেশে আসি। তারপর চলে যাই। নিশ্চিন্তে কাজ,মাসে মাসে অনেক টাকা পাঠাই দেশে। এক নিশ্চিত নিরাপত্তায় বসবাস। ফিরে যাবার একদিন দুদিন আগে নিয়ম করে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাই। আমার প্রথম গল্পের বই তিনি ১৯৯৪ সালে অনন্যা প্রকাশনী থেকে বের করে দিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে আমি তাঁর অপার স্নেহ পেয়ে এসেছি।

বিজ্ঞাপন

দুই
২০০৯ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি ইতালি চলে যাবার আগে এক বিকেলে দেখা করতে গেলাম তাঁর মগবাজারের বাসায়। পরদিন সন্ধ্যায় আমার ফ্লাইট। আমার মন খারাপ দেখে তিনি বিদায় দেয়ার সময় দরজার কাছে আমাকে ইচ্ছে করেই তার বুকে আগলে নিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন।

দেশ ছেড়ে চলে যাবার আগে এমনিতে আমার মন খারাপ থাকে। সেদিন তিনি আমাকে ওসব কথা বলে আমার মন আরও খারাপ করে দিলেন। তার বাসা থেকে বের হবার পর আমার মধ্যে সত্যি সত্যি একটা পাগলামি ঢুকে গেল।

বিজ্ঞাপন

ইতালি ছেড়ে একেবারে দেশে চলে আসার পাগলামিটা আমাকে পেয়ে বসল।
লেখক হতে পারলাম কিনা জানি না তবে তিনি আমার মধ্যে ঘরে ফেরার একটা নেশা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন।

তিন
সেদিন তিনি সেসব কথা না বলে আমার মন খারাপ করে না দিলে আমি হয়ত আর ইতালি থেকে কখনোই দেশে চলে আসার সিদ্ধান্তটা নিতাম না। এতদিনে অন্যদের মতো আমারও ইতালিয়ান পাসপোর্ট হয়ে-টয়ে যেত,আমিও বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে ইতালি থেকে সবকিছু নিয়ে আর দশজনের মতো থিতু হতাম লন্ডন কিংবা সুইডেনে- সেখানে আমার পরিবার,পরিবারের সদস্যরা আজকের চেয়ে অনেক ভালো থাকত। স্বচ্ছন্দে থাকত যাকে আমি বলি আর্থিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে থাকত।

আমি আমার পরিবারের সবাইকে বঞ্চিতই করেছি। আমার জন্য তাদের কিছুই হলো না। কিছুই হলো না। আমি ইতালি থেকে দেশে ফিরে এলাম ঠিক তার ছয় মাস পর।
তারপর?
কত লান্নত গেল আমার ওপর দিয়ে।
কত অপমান গেল।
কত বেইজ্জত হলাম।
কত অমর্যাদাকর দিবস যে গেল!
কত বিচিত্র রকমের ভোগান্তি!
কতকিছু পেলাম একজীবনে! মাঝে মাঝে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার ছল করে ভাবি, যা পেলাম অন্যদের তুলনায় বুঝি কমই।
তবু আমি খুশি, তবু আমি তৃপ্ত।
চার
তাঁর জন্য আমি একটু আধটু লিখতে পারছি। আমি যদি ইতালি-সুইডেন বা লন্ডনে স্থায়ীভাবে থেকে যেতাম তাহলে আমার পক্ষে কখনোই লেখালেখি করাটা সম্ভব হতো না। এই একটি কারণে তাঁর প্রতি আমার সাত জনমের কৃতজ্ঞতা। তিনি সেদিন অমন করে কথাগুলো না বললে আমার জীবন আজ অন্যরকম হতো।
আজ এই মানুষটার জন্মদিন। আপনি বেঁচে থাকুন আরও অনেক বছর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View