চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আলবদর’ সংগঠক থেকে জামায়াতের নেতা

১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর আহম্মেদনগর ক্যাম্প দখলের মাধ্যমে শেরপুরকে হানাদার মুক্ত করেন মুক্তিযোদ্ধারা। তখন থেকে পাক-প্রভুদের সাথে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন আলবদও নেতা কামারুজ্জামান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর পরই  কামারুজ্জামান সিলেটের দরগামহল্লায় আত্মগোপন করেন বলে জানা যায়।

জানা যায়, ১৯৭৩ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন আলবদর নেতা। অথচ ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বাস্তবায়নে এই আলবদর বাহিনীই মূল ভূমিকায় ছিল।   

Reneta June

ভর্তির পর গোপনে ছাত্র-সংঘের পুরানো নেতাকর্মীদের সমন্বয় করার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন কামারুজ্জামান। তিনি ১৯৭৪-৭৭ সাল পর্যন্ত ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা মহানগরীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৫-১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স করেন। ওই সময় তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। ১৯৭৬ সালে হজেও গিয়েছিলেন মাত্র ৫ বছর আগের অসংখ্য হত্যা ও ধর্ষণের হোতা । ১৯৭৭ সালে রাজাকার প্রধান গোলাম আজম দেশে ফিরলে প্রকাশ্যে আসেন কুখ্যাত আলবদর নেতা কামারুজ্জামান।

১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আহজারুল ইসলাম, কাদের মোলা, মীর কাশেম আলী, আবু তাহের সহ অন্যান্যদের উপস্থিতিতে- ‘ইসলামী ছাত্র-সংঘ’র নাম পরিবর্তন করে ‘ইসালামী ছাত্রশিবির’ নামকরণ করা হয়।

ছাত্রশিবিরের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন মীর কাশেম আলী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কামারুজ্জামান।১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ছাত্রশিবিরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান। এই বছরের মে মাসে তিনি শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
মাস্টার্স পাস করার পর তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮-৭৯ সালে দ্বিতীয় বারের মত ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি হন। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে ইসলামে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর ‘রুকনের’ দায়িত্ব পান।

১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে তিনি মাসিক ঢাকা ডাইজেস্ট পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।১৯৮১-৮২ সালে তিনি জামাতের ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন।১৯৮৩ সালে জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা  পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১৯৮২-১৯৮৩ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সালে তিনি ঢাকা সাংবাদিক সমিতির (ডিইউজে) এবং বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (বিএফইউজে) সদস্যপদ পান।১৯৯২ সাল থেকে তিনি দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে আসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে জাতীয় সংসদের শেরপুর-১ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন।

২০১০ সালের ২ অক্টোবর তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১২ সালের এপ্রিলে মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। ২০১২ সালের ৪ জুন ট্রাইবুনাল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ গঠন করেন।

২০১৩ সালের  ১৩ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত জামাত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা ও অভিযুক্ত কামারুজ্জামানের প্রেস ক্লাবের সদস্য পদ বাতিল করা হয়।

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর বিচারের কাজ অব্যহত থাকে। এই সূত্রে ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় এবং শেষ হয় ৩১ মার্চ। আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন ২ এপ্রিল শুরু হয় ১৫ এপ্রিল শেষ হয়। যুক্তি উপস্থাপন শেষে ১৬ এপ্রিল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষাধীন রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১৩ সালের ৯ মে, বৃহস্পতিবার মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায়  কামারুজ্জামানকে মৃতুদণ্ডের আদেশ দেন ট্রাইবুনাল।
 একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের অপেক্ষায় ফাঁসির মঞ্চ। যে রাষ্ট্রের জন্মের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামানের এতসব ঘৃন্য কাজ, ৪৪ বছর পর আজ সেই রাষ্ট্রের আইনেই চূড়ান্ত সাজা ভোগ করার অপেক্ষা করছেন । মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও পেয়েছিলেন এই আলবদর সংগঠক।

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ আনা হয়। এতে তৃতীয় ও চতুর্থ এ দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, প্রথম ও সপ্তম অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল।