চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আম, আমজনতা আম নিয়ে উপকথা

‘আমজনতা’ শব্দটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি।  এর মানে হচ্ছে সাধারণ জনতা বা মানুষ। উপসর্গ হিসেবে ‘আম’ শব্দটি আরবি থেকে এসেছে। এর অর্থ সাধারণ বা নির্বিশেষ। যেমন- আমজনতা আমদরবার আমমোক্তার।

প্রশ্ন হলো আরবিতে এই শব্দটি কোত্থেকে এসেছে? আমগাছের ‘আম’ থেকে? যদি তাই হয়, তাহলে আম কি একসময় এতোটাই সস্তা আর সুলভ ছিলো যে জনসাধারণ সবাই আম খেতে পেতো?

হ্যাঁ আমের এই ভরা মৌসুমে আম নিয়ে কিছু না বলাটা রীতিমত বেরসিকের কাজ। এখন চলছে আমের ভরা মৌসুম। গাছে গাছে দেখা যাচ্ছে আমের সমারোহ। আম ব্যবসায়ীরা তা ঝুড়ি আর বস্তায় ভরে সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে যেসব ফল উৎপন্ন হয় তার মধ্যে আমের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। আমের নানাবিধ ব্যবহার, স্বাদ-গন্ধ ও পুষ্টিমাণের জন্য এটি একটি আদর্শ ফল হিসেবে পরিচিত। তাই আমকে ফলের রাজা বলা হয়।

বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু, আবহাওয়া সবই আমচাষের উপযোগী। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কম-বেশি আম ফলে। এমনকি উপকূলীয় লবণাক্ত ভূমিতেও এখন মিষ্টি আমের চাষ হচ্ছে। পার্বত্য জেলার জুমচাষ এলাকায়ও উন্নত জাতের আম ফলছে। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, যশোর আমচাষের শীর্ষে অবস্থান করছে।

বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আমের সম্পর্ক অনেকটা আমে-দুধে মাখামাখির মতো। যদিও আম মৈথিলি শব্দ।  আমের নাম কৃষ্ণের শতনামকেও ছাড়িয়ে যাবে। বাল্মীকি আমকে ‘চ্যুত’ বলেছেন, কালিদাস ‘আম্র’ আর বাৎসায়ন বলেছেন ‘সহকার’। সংস্কৃত ভাষায় আমকে আম্র, বাংলায় আম, তামিলে মানকে এবং ইংরেজিতে ম্যাঙ্গো বলা হয়। বাংলার প্রাচীন গ্রন্থ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে এই আম আমবু, ভারতচন্দে আম, ঈশ্বর গুপ্ত’য় আঁব, মাইকেলে রসাল নামে অভিহিত হয়েছে।

মৎস্যপুরাণ ও বায়ুপুরাণে কালো আমের উল্লেখ আছে, যার রস পানে মানুষ অমরত্ব লাভ করে। ইংরেজি ‘ম্যাঙ্গো’ নামের উৎপত্তি নাকি তামিলের ‘ম্যাঙ্গাই’ থেকে। আম বা আম্র শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘সুখে ভোগ করা’। চ্যুত’র তাৎপর্য রসের ক্ষরণ। বাৎসায়নে আমকে ‘সহকার’ বলা হয়েছে। আমকে আরবিতে ‘আম্বাজ’ ও ফারসিতে ‘আম্বা’ বলা হয়।

মুঘল সম্রাট বাবর ও চিনা পর্যটক হিউয়েন সাং আমকে যথাক্রমে ‘পোর-ই-হিন্দ’ ও ‘প্রিন্স অব ফ্রুট’ বলতেন। আমের অন্যান্য প্রতিশব্দগুলি হল মাকন্দ, মদির, সখ, কামাঙ্গ, সরস, মধুদূত, অঙ্গনপ্রিয়, পিকবল্লভ, মৃষালক ইত্যাদি। আম যে এই উপমহাদেশেরই ফল, তা স্বীকার করেছেন ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতা-সহ অনেকে। আকবরই প্রথম আমের গুণে সরকারি সিলমোহর দেন। তিনিই দ্বারভাঙার নিকটে ‘লাখবাগ’ বাগানে এক লাখ বিভিন্ন প্রজাতির আমের চারা লাগিয়েছিলেন। তাঁরই উদ্যোগে ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে আইন-ই-আকবরি-তে আমের প্রজাতি-বিচিত্র লিপিবদ্ধ করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে আমের হাজার পাঁচেক প্রজাতি রয়েছে! আবার সেই সব নামের পেছনে রয়েছে নানান কিংবদন্তী, নানান প্রাসঙ্গিক ঘটনা, নানান দৃষ্টান্ত! আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ বইয়েও সে-যুগের আম সম্পর্কে অনেক বিবরণ পাওয়া যায়।

নানা ধরনের আমের নাম নিয়ে প্রচলিত আছে অনেক ধরনের জনশ্রুতি বা উপকথা। এক ফজলি আম নিয়েই অসংখ্য উপকথা শোনা যায়। অনেকের মতে, ঐতিহাসিক আবুল ফজল বাদশা আকবরকে বাংলা মুলুকের যে বিশেষ জাতের আমটি খাইয়ে মোহিত করেছিলেন, পরবর্তীকালে সেটাই নাকি আমজনতার কাছে ‘ফজলি আম’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে।

আরেকটি উপকথা মতে, বাংলার স্বাধীন সুলতানদের ধ্বংসপ্রাপ্ত গৌড়ের একটি পুরনো কুঠিতে ফজলি বিবি নামে এক নারী বাস করতেন। তাঁর আঙিনায় ছিল একটি আমগাছ। নারীটির হাতের যত্নে গাছটিতে প্রচুর আম ধরত। এলাকার ফকির-সাধু-সন্ন্যাসীদের ওই আম দিয়ে আপ্যায়ন করতেন বলে ফজলি বিবি নিজে ওই আমের নামকরণ করেন ফকির ভোগ।

১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মালদহের কালেক্টর সাহেব এক্কা গাড়িতে গৌড় যাচ্ছিলেন। পথে পিপাসার্ত হয়ে ফজলি বিবির কুঠিতে প্রবেশ করে জলপান করতে চাইলে ওই নারী জলের পরিবর্তে একটি আম খেতে দেন।  আম খেয়ে সাহেব আমটির নাম জানতে চান। ফজলি সাহেবের ইংরাজি ভাষা অনুধাবন করতে না পেরে আমের নামের পরিবর্তে নিজের নাম বলে বসেন।

বিজ্ঞাপন

সেই থেকে ওই আমের নামকরণ হয় ফজলি। অন্য মতে, মালদহের কালেক্টর সাহেব এক বার অবকাশ যাপনের জন্য ফজলি বিবির কুঠির নিকটেই ক্যাম্প করেছিলেন। সাহেবের আগমনের সংবাদ পেয়ে তাঁর গাছের আম নিয়ে ফজলি কালেক্টরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাহেব ওই আম খেয়ে এবং ফজলির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে আমটির নামকরণ করেন ফজলি। মানুষের মুখে মুখে ফজলি আমের নাম ভাইরাল হয়ে যায়।

আরেকটি জনশ্রুতি হচ্ছে, গৌড়রাজ শশাঙ্কের আমবাগানের মালী ছিলেন ফজল আলি। তিনি ছিলেন রাজার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ‘তালাবি’ ও ‘বোম্বাই’ আমের সংকরায়ণ ঘটিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অতিকায় আম। ফজল আলি দ্বারা উদ্ভাবিত বলে আমের নামকরণ হয় ‘ফজলি’।

আম নিয়ে কিংবদন্তি মহাভারতকে আশ্রয় করেও আছে। পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের এক সময়ে তাঁরা এসেছিলেন পুণ্ড্রদেশে। সেখানে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন কৃষ্ণসখা সুদামা। তাঁরই হাত দিয়ে পাণ্ডবরা গোপাল (শ্রীকৃষ্ণ)-এর জন্য আম পাঠিয়েছিলেন। তা থেকেই এই আমের নাম ‘গোপালভোগ’।

বিভিন্ন আম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন উপকাহিনী। জনৈক গৌড় সুলতানের প্রিয় বেগমের স্মৃতি নাকি বহন করে চলেছে ‘বেগমফুলি’। ‘ল্যাংড়া’ আমের পেছনে রয়েছে নাকি কাশীর এক ‘ল্যাংড়া’ ফকিরের লোককাহিনী।  এখানে বলে রাখা ভালো, আমরসিকদের কাছে সব রকম আমের মধ্যে ল্যাংড়া আমই কিন্তু শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত। অবশ্য ল্যাংড়া আমেরও নানা রকম জাত আছে। তবে বেনারসি ল্যাংড়া আমই নাকি সব চেয়ে উৎকৃষ্ট জাতের।

এখানে বোঝা গেল, শুধু রাজা-বাদশা বা সুলতানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কিংবা তাঁদের ইচ্ছে থেকেই নতুন আমের নামকরণ হয়নি। সাধারণ শ্রেণির মানুষের নামও জড়িয়ে আছে অনেক আমের সঙ্গে। তোতাপুরি, হিমসাগর, বেনারসি, বোম্বাই, চৌসা, কিষাণভোগ, বালসার, রত্নগিরি, কেশরি, লক্ষ্মণভোগ, পেয়ারাফুলি, আলিবাগ, রানিপসন্দ, সফেদা, দসেরা, সিন্ধুরিয়া, জাহাঙ্গীর, আলফানসো, সিরাজদৌল্লা, জাফরান, গোলাপখাস-এ রকম আরও কত কত সব মজাদার নামের গর্ব ও গন্ধ নিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে বাংলার ও বাঙালির ভীষণ আদরের আম।

বর্তমানে বাজার দখল করে আছে জনপ্রিয় ও বিখ্যাত এমন ১২টি জাতের আম হচ্ছে: ফজলি, ল্যাংড়া, হিমসাগর, গোপালভোগ, খিরসাপাত, সূর্যপুরি, গোলাপখাস, নীলাম্বরী, সিন্ধু, আম্রপালি, হাড়িভাঙ্গা ও আশ্বিনা। তবে আমবাঙালির আমচেতনা হিমসাগর আর ল্যাংড়াতেই মূলত সীমাবদ্ধ। বেশিরভাগ মানুষের আমের প্রজাতি সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা নেই বললেই চলে।

আম সাধারণত কাঁচা অবস্থায় শক্ত ও অম্লযুক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু পাকলে তা অত্যন্ত রসালো হয়। কোনো কোনো আম কাঁচা অবস্থাতেই মিষ্টি হয়ে থাকে। এই জাতীয় আমকে কাঁচামিঠা আম বলে। আম কাঁচা অথবা পাকা-যাই হোক না কেন, আমাদের শরীরের পক্ষেও বিশেষ উপকারী। কাঁচা আমে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও জলীয় পদার্থ কেবলই নয়, লোহা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থও যথেষ্ট থাকে। প্রচণ্ড গরমে কেউ অসুস্থ হলে তাকে কাঁচা আমের সরবৎ খাওয়ানো বা কাঁচা আমের প্রলেপ দেওয়া হয়।

কাঁচা আম রান্নাতে বিশেষ করে ডালের সঙ্গে ব্যবহার করার রীতি আছে। কাঁচা আমের সরবৎ এখন শহরের ফাস্টফুডের দোকানগুলোতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাকা ও সুমিষ্ট আমের রসের সঙ্গে দুধভাত খাওয়াটা একসময় ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ছিল।

আমের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে প্লীহা, বাত ও ক্ষয়রোগের উপশম হয়। আবার আমের আঁটির শাঁসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে বন্ধ হয় ‘উদ্গার’ বা ‘বমি’। আম থেকে তৈরি ‘আমচুর’ দারুণ উপকারি ছোটদের আমাশয় রোগে। সবার উপরে তো রয়েছেই বাঙালির এক মুখরোচক-‘আমসত্ত্ব’, আমের এক মহার্ঘ্য রূপ।

আম নিয়ে উপকথার কোনো শেষ নেই। একবার এক ইংরেজ সাহেব নাকি পাকা হড়হড়ে আম খেতে গিয়ে হাত জামা কাপড় নষ্ট করে ফেলেছিলেন। অবশেষে তিনি বলেছিলেন, আম খাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, আমটা নিয়ে বাথটাবে চলে যাওয়া, সেখানে আমটা খেয়ে একেবারে গোসল শেষ করে পরিষ্কার হয়ে চলে আসা।
আম নিয়ে আরেকটি উপকথা। প্রাচীনকালে এক বাদশা অসময়ে আম খেতে চাইলেন। আমের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল হয়ে উঠল যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বদ্যিসাহেব সাফ জানিয়ে দিলেন, বাদশাকে আম খাওয়াতে না পারলে এই রোগ সারবে না।

বাদশা অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে রাজ্যের সর্বনাশ! নিরুপায় হয়ে উজির এক কাণ্ড করেন। তিনি নিজের দাড়িতে তেঁতুলের একটু টক ও গুড় মিশিয়ে বাদশাকে চুষতে দেন। ব্যস, প্রায় বেহুঁশ বাদশাও দাড়িকে মনে করলেন আমের আঁশ, আর টক মিষ্টি থেকে পেয়ে গেলেন আমের স্বাদ। বাদশার রোগ সেরে গেল, রাজ্যও বাঁচল!
এখানে বলে রাখা ভালো যে, গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের আকাঙ্ক্ষাও ওই বাদশাহর মত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তেঁতুল আর গুড়মাখানো দাড়িতে জিহবা লাগিয়েই আমরা আমের স্বাদ গ্রহণ করি।

আমাদের ‘আমজনতা’ বুঝি এ কারণেই বলা হয়! বর্তমানে ভেজালমুক্ত খাঁটি আম অর্থাৎ কার্বাইড-ফরমালিন-রাসায়ানিকমুক্ত আম পাওয়াটা অনেক কঠিন ব্যাপার। এ জন্য অনেক সাধ্যসাধনা করতে হয়। রাজনীতির মঞ্চেও প্রকৃত দেশপ্রেমিক জনদরদি ভেজালমুক্ত খাঁটি নেতা পাওয়াটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমজনতার কাছে দুটোই পরম কাঙ্ক্ষিত!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন