চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমানতের সুরক্ষায় ব্যর্থ ১১ ব্যাংক

ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ১০ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা

আমানতকারীদের জমা রাখা টাকা থেকেই গ্রাহকদের ঋণ দেয় ব্যাংক। সেই ঋণ কোনো কারণে খেলাপি হলে তার বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয় ঋণ বিতরণকারি ব্যাংককে।

কিন্তু আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত এই প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি ১১টি ব্যাংক। যার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি ও বেসরকারি ৭টি ব্যাংক রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা।

তবে এ সময়ে কিছু ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত থাকায় সার্বিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকা।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঋণ জালিয়াতির কারণে অধিকাংশ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এখন নাজুক। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দিন দিন বাড়ছে। ফলে প্রভিশন ঘাটতিও বাড়ছে।

তারা জানান, যে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকবে সেই ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। এতে ওই ব্যাংকের শেয়ারে নিরুৎসাহিত হন বিনিয়োগকারীরা। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কাও থাকে বেশি।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। তবে যেসব ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না সেসব ব্যাংকের আমানতকারীরা এখন কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পর্যবেক্ষণে থাকা ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৩ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের ৮৯৩ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৮৮৬ কোটি ও রূপালী ব্যাংকের ৯২০ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের ১ হাজার ২১৫ কোটি, কমার্স ব্যাংকের ৫৬৬ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ হাজার ৬৯৭ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ২০৩ কোটি, এমটিবির ২৪৪ কোটি, সোস্যাল ইসলামি ব্যাংকের ১৯৮ কোটি এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৪১ কোটি টাকা।

সাধারণত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের মধ্যে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশির ভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো প্রকার ঝুঁকির মুখে না পড়ে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। এর একটি হলো প্রভিশন সংরক্ষণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণীকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে শুন্য দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কু-ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণে বিনিয়োগকারিরা নানা সংকটে থাকায় খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সুবিধা অনুযায়ী নিয়মিত গ্রাহকেরা কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের খেলাপি দেখানো যাবে না। এরপরও এই ঋণের পরিমাণ কমেনি। বরং বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

এ হিসাবে গত ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।