চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আমাদের মানসিকতার বিশাল পরিবর্তন প্রয়োজন’

নারী খেলোয়াড়দের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ কম সাফল্য পায়নি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের সেরা সাফল্য এশিয়া কাপ ট্রফি এসেছে মেয়েদের হাত ধরেই। তারপরও ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের ব্যবধান যোজন-যোজন। অনুশীলন সুবিধা, মাঠ বরাদ্দ, পারিশ্রমিক, মিডিয়া কাভারেজ, সব জায়গাতেই দৃষ্টিগোচর হয় বৈষম্য।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও উইমেন্স উইং চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল মনে করেন, এখনই ছেলেদের সমান সুবিধা দিতে না পারলেও সর্বস্তর থেকে মেয়েদের যথাযথ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সবার মানসিকতার বিরাট পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

চ্যানেল আই অনলাইনকে সাক্ষাতকারে শফিউল আলম কথা বলেছেন মেয়েদের ক্রিকেটের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়েও।

আড়াই বছর ধরে আপনি মেয়েদের ক্রিকেটের অভিভাবক। এ সময়ে খেলোয়াড়দের জন্য বিসিবি থেকে কতটা সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পেরেছেন?
শফিউল আলম: আমরা অনেক জায়গায় সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি। অনেক জায়গায় মেয়েদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছি। বলছি না মানসম্পন্ন বা যুগোপযোগী হয়েছে। কিন্তু যে অবস্থায় ছিল, সেখান থেকে অনেক বেড়েছে। কোনো কোনা জায়গায় দ্বিগুণ বা তারচেয়েও বাড়িয়েছি। ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হতে হবে। মেয়েদের সঙ্গে যখন আমার কথা হয় খোলাখুলি একটা কথা বলি, দেখো- শুধু তোমাদের না, যেকোনো কিছুই কিন্তু নিজেদের যোগ্যতায় আদায় করে নিতে হয়। কারো দিকে তাকিয়ে থাকেলে কিন্তু হয় না। তোমরা পারফরম্যান্স করো, বোর্ড অনেককিছু করবে।

এশিয়া কাপ যখন জিতে আসল মেয়েরা, কাউকে খাটো করার জন্য বলছি না, এটা যদি ছেলেরা নিয়ে আসত, যে উচ্ছ্বাস হতো সাধারণ মানুষ বা বিভিন্নজনের কাছে বা মিডিয়ার কাছে…! এটা একটা আন্তর্জাতিক ট্রফি, সম্মানজনক আসর। যোগ্যতা দিয়ে সালমারা নিয়ে এসেছে, আমরা কী তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছি? দেখুন আমরা কেউই কিন্তু নিজেদের জায়গায় ঠিক কাজটা করছি না। আমাদের এটা মানসিক সমস্যা, আমাদের মধ্যে মাইন্ডসেট এমনভাবে হয়ে গেছে। পরিষ্কারভাবে যদি বলি, এসব জায়গায় কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে যেটুকু বাড়ানো হয়েছে বোর্ডের পক্ষ থেকে, আমি আশাবাদী আগামীতে আরও বেশি বাড়বে।

অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেন করা যায়, সেটা করব। কেননা বোর্ড মিটিংয়ে এক লাফে বাড়ানো কিন্তু সহজ হয় না। ৬ কোটির বাজেট ১২ কোটি হয়েছে। আমরা তাদের টিএ-ডিএ বাড়িয়েছি। ম্যাচ ফি বেড়েছে। ভ্রমণের জন্য সেরা বাস কিংবা প্লেন সার্ভিসটাই নিচ্ছি। যেটা সবচেয়ে ভালো সেটা বরাদ্দ থাকছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ম্যাচ ফি কয়েকগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি বোর্ডে।

সুযোগ-সুবিধা আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে অন্য দেশ ছেলেদের সমান করে দিচ্ছে। সেদিক থেকে আমরা অনেক ধীরগতিতে আগাচ্ছি। মাঠের ব্যাপারে এখনো পুরনো অভিযোগই রয়ে গেছে। ভালো মাঠ মেয়েরা পায় না। ২০১২ সালের পর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে খেলার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল।
শফিউল আলম: আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে অনেক কাজ করা হচ্ছে। আমরা সভা, সমিতি, সেমিনারে সাধুবাদ পাওয়ার জন্য মুখে অনেক কথাই বলি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রেই বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারিনি। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আমরা বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে মাঠ ব্যবস্থায় যে গুরুত্ব দিয়ে থাকি, দায়িত্ব নিয়েই বলছি এই দায় আমারও রয়েছে, আমিও এটি এড়াতে পারি না। এই জায়গায় দেখা যাচ্ছে মাঠ বরাদ্দ যারা দেন তাদের সঙ্গে দেন-দরবার করি, কথা বলি। আশা করি এবার তাদের সেই বোধোদয় হবে। যে মাঠ দেবে যথাযথভাবে যেন ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পারে মেয়েরা সেই প্রত্যাশা করি।

বিজ্ঞাপন

নারী ক্রিকেট চালাতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কোনটি?
শফিউল আলম: আমি নিজেও একজন পুরুষ। তারপরও বলব, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমরা একদম পুরোপুরি সমান সুযোগ হয়ত দিতে পারবো না, কিন্তু তাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি ভালো মাঠ না দেন, ভালো খেলোয়াড় পাবেন না। অনুশীলনের সুযোগ যদি না দেন, অর্থনৈতিকভাবে যদি সম্মানজনক কিছু না দেন, তাহলে একটা খেলোয়াড় কেনো আসবে, শুধু খেলার নেশায়? এটা কিন্তু দীর্ঘদিন থাকবে না। যদি লম্বা সময় ধরে পাইপলাইনে ক্রিকেটার রাখতে চান, তাহলে কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে। এই জায়গায় আমাদের মানসিকতার বিশাল পরিবর্তন প্রয়োজন।

একটা সময় বাংলাদেশের সঙ্গে কেউ খেলতেই চাইত না। এশিয়া কাপ জয়ের পর অন্য দেশের মনোভাব কতটা পরিবর্তন হয়েছে?
শফিউল আলম: আমাদের মূল দলের সঙ্গেও কিন্তু একটা সময় এমন হয়েছে। ছেলেরা তাদের যোগ্যতায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মেয়েরাও আস্তে আস্তে সেই পথে হাঁটছে। আগে দেখা যেত ৪০-৫০ রানের মধ্যেই গুটিয়ে যেতাম আমরা, এখন মেয়েরা হারলেও অল্প ব্যবধানে হারছে। মার্চে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচের দিকে যদি তাকান, ক্লোজ ম্যাচ হেরে গেলাম। এখন পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। অন্য দল শুধু না, বড় দলও আমাদের এখন হেলাফেলার চোখে দেখে না।

সালমা খাতুন ও জাহানারা আলম মেয়েদের আইপিএল খেলতে গেল। এটা কতটা গর্বের? তিন দল নিয়ে বিপিএলের সঙ্গে মেয়েদের ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর করার কোনো ভাবনা আছে কিনা?
শফিউল আলম: আমাদের দেশের এবং নারী ক্রিকেটের ভাবমূর্তির জন্য সালমা ও জাহানারা আইপিএলে খেলতে গেল এটা একটা বিশাল অর্জন। পারফরম্যান্স সেখানে কী হবে মনে করি সেটি বড় বিষয় নয়। আমাদের দেশ থেকে দুজন খেলোয়াড় গেছে এটাই বড় ব্যাপার। আরেকটা বিষয় হল, তাদের বোর্ডের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হয়েছে। যা চেয়েছে তারচেয়ে বেশি দেয়া হয়েছে যেন বড় মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরতে পারে।

আমাদের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট হচ্ছে। এটা বিপিএলের আদলে করতে হলে মার্কেট ভ্যালু, পৃষ্ঠপোষক, দর্শকের চাহিদা, সবমিলিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। করলে ভালোমতোই করতে হবে। দায়সারা বা করার জন্য করার পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে আমি নই। করার মতো প্রেক্ষাপট যদি তৈরি হয়, সময়ের যে দাবি সেটি কিন্তু উপেক্ষা করতে পারবেন না। এ ধরনের টুর্নামেন্ট করার জন্য আমরা নিজেরা মনে হয় এখনো প্রস্তুত না। আরেকটু সময় অবশ্যই আমাদের দিতে হবে।

নারী দলের কোচ নিয়োগ দিতে এত বিলম্ব হচ্ছে কেন?
শফিউল আলম: মাঠে খেলা নেই, কাজ নেই। এটা অন্যতম একটা কারণ। ঘাড়ের উপর যদি চাপটা থাকত, দ্রুততম সময়েই হয়ে যেত। আরেকটা বিষয় হল করোনার কারণে অনেক কোচই বিদেশ ভ্রমণ করতে চায় না। এখন একজন কোচ নেবেন, অন্যান্য কোচিং স্টাফ নেবেন, তিনি তো সাক্ষাতকার দেবেন, প্রেজেন্টেশন দেবেন। আরেকটা জিনিস, জাতীয় দলের জন্য ভালো মানের কোচই নিতে হবে। বোর্ডেরও কিছু চিন্তাভাবনা আছে। কিছুদিন পরপর তো আর কোচ বদলাতে পারব না। বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়েও যেতে পারবেন না, একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্যই সময় লাগছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে হেড কোচ ও অন্যান্য কোচিং স্টাফ নিয়োগ হয়ে যাবে। জানুয়ারির জাতীয় লিগে তারা মাঠে থাকবেন।

মেয়েরা ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কবে নাগাদ ফিরবে?
শফিউল আলম: বিসিবির অধীনে ছেলেদের ক্রিকেট আস্তে আস্তে শুরু হয়েছে। জাতীয় লিগ যেহেতু বিসিবির সরাসরি তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে। চিন্তা-ভাবনা রয়েছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে লিগ শুরু করে আবার নারী ক্রিকেট মাঠে ফেরানোর। আমরা গ্রাউন্ডস অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ বিভাগকে জানিয়েছি যে, এই সময় টুর্নামেন্ট করতে চাই। ওনারা যে মাঠ বরাদ্দ দেবেন, সেখানেই লিগের ম্যাচ হবে।

আমরা তিনটি দেশের সঙ্গে কথা বলেছি, অর্থাৎ মেইল দিয়েছি, এবং তারা জবাব দিয়েছে। আমরা ত্রিদেশীয় টি-টুয়েন্টি সিরিজ আয়োজনের চেষ্টা করছি। আমাদের এখানে হতে পারে, আশেপাশের দেশেও হতে পারে, এবং সেটি ইতিবাচকভাবে হবে বলেই আশাবাদী। শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা সাউথ আফ্রিকা আসতে পারে। এ মুহূর্তে বলা মুশকিল সিরিজটা কখন হবে। ওদের কথা হল আমরা আসতে চাই, কিন্তু পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। মাস ছয়েকের মধ্যে সিরিজটি আমরা খেলতে চাচ্ছি।