চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমরা রই বেদনায় বোবা

সুবীর নন্দীর শেষকৃত্য সম্পন্ন

বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় সবুজবাগ কালী মন্দিরের শ্মশান ঘাটে বরেণ্য শিল্পী সুবীর নন্দীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়…

‘আমার হৃদয় স্তব্ধ, বোবা হয়ে আছে বেদনায়’-কবি ফররুখ আহমদের লেখা একটি সনেটের প্রথম লাইন। কবি কোন্ বেদনায় লীন হয়ে এমন বাক্য বিনির্মাণ করেছিলেন, তা জানা নেই। কিন্তু এই কথাটির প্রকাশভঙ্গির যে ওজস্বিতা তা আজ কিছুটা হলেও আঁচ পাচ্ছেন সংগীতপ্রিয় প্রতিটি বাঙালি। কারণ এদিন সবাইকে বেদনার সমুদ্রে ডুবিয়ে চিরতরে বিদায় নিলেন দেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী।

বুধবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় সুবীর নন্দীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। সবুজবাগ কালী মন্দিরের শ্মশান ঘাটে পরিবার ও নিকট আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে পঞ্চভূতে মিশিয়ে দেয়া হয়। চ্যানেল আই অনলাইনকে এমনটাই জানালেন সুবীর নন্দীর চিকিৎসক ও জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার (৭ মে) সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী। এরপর বুধবার ভোর ৬টা ৫০ মিনিটে উড়োজাহাজে করে ঢাকায় পৌঁছে তাঁর মরদেহ। সেখান থেকে সরাসরি তাঁকে নেয়া হয় গ্রীন রোডের বাড়িতে।

সকাল ৯টার দিকে সুবীর নন্দীকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নেয়া হয়। সনাতনী রীতিতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে পুস্পসজ্জায় তাকে নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। যেখানে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সংগীত, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক জগতের গুণী ব্যক্তিবর্গসহ দেশের আপামর জনতা। প্রায় ঘন্টা খানেক পর দুপুর পৌনে ১টায় এফডিসিতে নেয়া হয় তাঁর মরদেহ। যেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান এফডিসির বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

সেখান থেকে সুবীর নন্দীর মরদেহ নিয়ে আসা হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গনে। দুপুর দেড়টা থেকে ২টা পর্যন্ত সেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন চ্যানেল আই পরিবারসহ দেশের সাংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরা। সেখান থেকে আবার তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রামকৃষ্ণ মিশনে। সৎকারপূর্ব আনুষ্ঠানিকতা শেষে এরপর বিকাল পৌনে তিনটার দিকে সবুজবাগ কালী মন্দিরে নেয়া হয় সুবীর নন্দীকে।

তাঁর মৃত্যুতে সংগীতসহ পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। সংগীতের গুণী মানুষেরা মনে করছেন, বড়ো অসময়ে চলে গেছেন ‘ও আমার উড়াল পঙক্ষীরে’র এই গায়ক। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার মতো গুণী শিল্পী ও মহৎ মানুষের অভাব আগামী দিনে পূরণ হবার নয়।

এক নজরে সুবীর নন্দী:
সুবীর নন্দী, বাংলা সংগীত জগতের কিংবদন্তি নাম। ১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তিনি গান করতেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানের ওস্তাদ ছিলেন বিদিত লাল দাস। সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং এর মধ্য দিয়ে। দরদী কন্ঠের আধুনিক বাংলা গানের অবিস্মরণীয় এ কণ্ঠশিল্পী ৪৩ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গান গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য গান।

চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে। এরপর থেকে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ডিস্কো রেকর্ডিং এর ব্যানারে বাজারে আসে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে তিনি যুগোস্লাভিয়া, ইংল্যান্ড, সুইডেন, আমেরিকা, আরব আমিরাত, জাপান, নেপাল ও ভারতে সংগীত পরিবেশন করেছেন। চলচ্চিত্রের সংগীতে অবদানের জন্য তিনি পাঁচ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন (মহানায়ক ১৯৮৪, শুভদা ১৯৮৬, শ্রাবণ মেঘের দিন হাজার ১৯৯৯, মেঘের পরে মেঘ ২০০৪, মহুয়া সুন্দীর-২০১৫)। এছাড়া চার বার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। শিল্পকলা- সংগীতে গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সুবীর নন্দীকে ২০১৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

Bellow Post-Green View