চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আবার সর্বাত্মক লকডাউন কতোটা যৌক্তিক?

করোনার সংক্রমণ এবং মৃত্যু ভয়াবহভাবে বৃদ্ধির ফলে দ্বিতীয় দফার প্রথম লকডাউন চলার মধ্যেই ১৪ এপ্রিল থেকে সরকার সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণার চিন্তা করছে বলে শুক্রবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন দুই মন্ত্রী। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া লকডাউনে জনগণের খুব একটা সাড়া মেলেনি। গণপরিবহন, দোকানপাট বন্ধের ঘোষণা থাকলেও দাবি ও আন্দোলনের মুখে তা খুলে দেওয়া হয়েছে। তাই, বর্তমান বাস্তবাততায় সর্বাত্মক লকডাউন কতোটা উপযোগী বা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

দেশে করোনা আঘাত হানার পর লকডাউনের পক্ষে দেশের প্রায় সব মহল থেকেই জোরালো দাবি ছিল। সেজন্য বড় আকারে ক্যাম্পেইনে যুক্ত ছিলাম নিজেও। আশা ছিলো কিছুদিন সবকিছু বন্ধ রেখে একটু ধৈর্য ধারণ করলে হয়তো এই মহামারি থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে। কিন্তু তা হয়নি। করোনা এমন এক ভাইরাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা থেকে সহজে মুক্তি মিলবে বলে কোনো ধরনের আশাই আর অবশিষ্ট থাকছে না। তাই একে সাথে নিয়েই বাঁচতে হবে আমাদের। চালাতে হবে সব কার্যক্রম।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টা এমন যে, প্রাণ যতক্ষণ আছে, ক্ষুধাকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। খাদ্যের সন্ধান আপনাকে করতেই হবে। ক্ষুধা বাস্তবতা, ভাইরাস ভয়। কিন্তু যার ঘরে খাবার নেই তার পক্ষে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ভয়কে প্রাধান্য দেওয়া অসম্ভব। যার ঘরে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে, ভালো বেতনের স্থায়ী চাকরি আছে, মাথার ওপরে ঋণের বোঝা নেই তার জন্য লকডাউন মেনে নেওয়া খুবই সহজ ব্যাপার, অনেক ক্ষেত্রে আশীর্বাদও। কিন্তু নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের একদিন ফেরি না করলে দিনের খাবার জোটে না, রিকশা নিয়ে বের না হলে চালভর্তি ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফেরা হয় না, একদিন ডিউটি না করলে পরিবারকে উপোস করতে হয় তাদের জন্য লকডাউন মেনে নেওয়া অবাস্তব। কেননা, লকডাউনে এই শ্রেণির লোকই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতিসহ উন্নতির উন্নতির সব সূচকে এই জনগোষ্ঠী এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ। শহরে এদের সংখ্যা আরও বেশি। সুতরাং এই মুহুর্তে ফের লকডাউনে যাওয়া কতোটা বাস্তবসম্মত সেটা ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে জনগণের আত্ম ও সামাজিক সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা। লকডাউন না দিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে বাধ্য করার নীতি অবলম্বন করা যেতে পারে। লকডাউন বাস্তবায়নে মাঠ-প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন সিরিয়াসলি মাঠে থাকে, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের ব্যাপারেও সেরূপ সিরিয়াসনেস নিয়ে মাঠে থাকতে পারে। মোড়ে মোড়ে মোতায়েন থেকে তারা জনসাধারণনের স্বাস্থ্যবিধির ওপর নজর রাখতে পারে, অবহেলা গাফিলতি বা উদাসীনতা দেখলে ব্যবস্থা নিতে পারে। অফিসগুলো সরকারি আদেশ মানছে কিনা সে বিষয়ে মনিটরিং করতে পারে। বিনোদন-পর্যটন মানুষের সেকেন্ডারি নিড। সে বিষয়গুলোকে পুরোপুরি বন্ধ রাখা যেতে পারে। তবে বিনোদন-পর্যটন তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই জরুরি মুহূর্তে তাদের ভর্তুকির আওতায় আনা যেতে পারে। সামাজিক জমায়েত বন্ধ করার ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। ধর্মীয় জমায়েত বন্ধের ব্যাপারেও নিরুৎসাহী করা যেতে পারে। তবে অফিস, কলকারখানা, বাজার এবং এবং গণপরিবহন মানুষের জীবিকার সাথে সরাসরি জড়িত। এগুলো বন্ধ রেখে জনগণকে ঘরে রাখা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই লকডাউন না দিয়ে সরকারের উচিত করোনা নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন কোনো পন্থা অবলম্বন। সেটা নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহল আরও গভীরভাবে ভেবে দেখতে পারেন।

জীবন-জীবিকার প্রশ্নে আমাদের একটিকেও ছাড় বা প্রাধান্য দেওয়ার উপায় নেই। দুটোই ঠিক রেখে কীভাবে মহামারি মোকাবেলা করা যায় সেই পন্থা অবলম্বনের গত্যন্তর নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)