চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক মানে চলি, এখন টাকার বদলে ডলার কামাই: মালেক আফসারী

দেশীয় চলচ্চিত্রের একাধিক সুপারহিট ছবির পরিচালক মালেক আফসারী এখন ‘ইউটিউবার’। কোনো রকম ইতস্তত বোধ ছাড়াই নিজেকে এ পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। নিজের নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলে মালেক আফসারী ভিডিওতে এসে হরেক রকম কথাবার্তা বলছেন। তার চ্যানেল মালেক আফসারী অফিশিয়াল এখন প্রতিষ্ঠিত। সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় একলাখ। সিনেমা ছেড়ে ইউটিউবে নিয়মিত হওয়া এবং চলচ্চিত্রে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মালেক আফসারী কথা বললেন চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে…

আফসারী ভাই, গত কয়েকমাস আপনাকে ইউটিউবে সরব পাওয়া যাচ্ছে…

বিজ্ঞাপন

করোনার সময় ঘরে বসে ছিলাম। কাজ ছিল না। তাই কোনো ইনকাম ছিল না। সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছিলাম। পরিচিত জনের পরামর্শে ইউটিউবে আসি। আমার কোনো বিনিয়োগ ছিল না। শুধুমাত্র ১৯ হাজার টাকার একটা ফোন ছিল। তাও সেটা উপহার পেয়েছিলাম। অল্পদিনেই দেখলাম ইউটিউবে আমার কথা, ভিডিও মানুষ পছন্দ করছে। দুমাসের মধ্যেই আমার চ্যানেল মনিটাইজেশন হয়ে যায়। চারমাসে ইউটিউব থেকে ভালো ইনকাম পেতে শুরু করি। সেই টাকাগুলো এখন লগ্নি করে নাটক বানাচ্ছি। এগুলো ভবিষ্যতের জন্য। আমার সন্তানদের জন্য রেখে যাচ্ছি। তারা এর সুফল পাবে।

চলচ্চিত্র হাতে নেই বলেই কি নাটক নির্মাণ করছেন? 

আমি পরিচালনা করছি না। মিয়াঁ মাহাবুবের গল্পে কমেডিয়ান বাদল পরিচালনা করছে। আমি হলাম প্রযোজক। এগুলো আমার উদ্যোগে নির্মাণ হচ্ছে। আমি ফয়সাল ভাই ও আরেকজনের পার্টনারশিপে ঐহিত্য টিভি নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। হাতিরঝিল মধুবাগে স্টুডিও। এখানে তিনটা স্টুডিও, ক্যামেরা, এডিটিং প্যানেল সবই আছে। সেখানে প্রচারের জন্য চিকন আলী ও হিরো আলমকে নিয়ে ১০০ ও ৫০০ পর্বে দুটি আলাদা ধারাবাহিক নাটক তৈরি হচ্ছে।

আপনি আগাগোড়া চলচ্চিত্রের মানুষ। চলচ্চিত্রে লগ্নি না করে নাটকে কেন করছেন? 

আগে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলাম। এখন ইউটিউবে কাজ করছি। আমি যেটা লগ্নি করছি সেটা দেরিতে হলেও ফেরত আসবে। ইউটিউবে আমি দেশ জাতিকে কিছু দেয়ার জন্য আসিনি। এসেছি বিনোদন দিয়ে শুধুমাত্র ব্যবসা করতে। এখানে টাকা লগ্নি করছি তার দ্বিগুণ পাবো। ১৯ হাজার টাকায় মোবাইল দিয়ে ইউটিউবে এসে সেই টাকায় ‘ফোর কে’ ক্যামেরা কিনেছি। ইউটিউবে একটু মেধা ও আইডিয়া লাগিয়ে যদি কাজ করে সে ব্যর্থ হবে না। যারা বেকার তারাও যদি ইউটিউবে মেধা দিয়ে কনটেন্ট বানায়, তাহলে ভালো রোজগার করতে পারবে। ভাবলাম, এখন সবাই মোবাইল ইউটিউবে চলে গেছে। তাহলে আমি কেন এফডিসি পড়ে থাকবো! মানুষ তো আমাকে ভুলে যাবে। দেখা হলে সালাম দেবে না। আর নিজের টাকা খরচ করে ছবি বানাবো সেই সামর্থ আমার এখন নেই। তাই ইউটিউব নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। যুগের সঙ্গে চলার জন্য এখানে কাজ করছি।

তাহলে সহসা আপনাকে আর চলচ্চিত্রে পাওয়া যাবে না বলতে চাইছেন? 

সাইনিং মানি পেয়েছি দুই প্রডাকশনের যে কেউ ডাকলেই আমি আবার চলচ্চিত্র বানানো শুরু করবো। অথবা নতুন কেউ যদি শাকিব খানকে নিয়ে ছবি বানানোর জন্য আমাকে ডাকে তাহলে আমি কাজ করবো। শাপলা মিডিয়া থেকে আমাকে প্রযোজকের ছেলে শান্ত খানকে নিয়ে ছবি বানাতে বললো। প্রযোজকের ছেলে বলে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু শান্ত নাকি অস্ট্রেলিয়াতে লেখাপড়া করতে যাবে। তাই কলকাতার দেবকে নিয়ে ছবি বানাতে বললো। আমি বলেছি, দেশে শাকিব খান থাকতে দেবকে নিয়ে কেন কাজ করবো? শাকিব খানকে যদি নিতে পারেন তাহলে আমি কাজ করতে পারি। কিন্তু শাপলা মিডিয়ার সঙ্গে শাকিব খানের একটা মনোমানিল্য রয়েছে। তাই আর হয়ে ওঠেনি। অন্য কোনো নায়ক নিয়েও আমি কাজ করবো না।

বর্তমানে অবস্থা বিবেচনায় চলচ্চিত্র কোন দিকে যাচ্ছে? ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

এখন যে কটা সিনেমার কথা বলা হচ্ছে, শুধু নামেই সিনেমা হচ্ছে। আসলে ওসব একটাও সিনেমা না। প্রত্যেকটা সিনেমা হচ্ছে ওটিটি, ইউটিউব বা অ্যাপের জন্য। সেন্সর পাওয়ার জন্য নাম দেয়া হচ্ছে সিনেমা। এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুপারস্টারের ছবিও শুনলাম সিনেমা হলে রিলিজ হবে না। সুপারস্টারের ছবি যদি সিনেমা হল না পায় তাহলে স্বাভাবিক ভাবে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাবে। তবে আমি ভবিষ্যৎ মনে করি অনেক উজ্জ্বল। জ্যাম, সময় খরচ, টাকা সবকিছু খরচ করে সিনেমা হলে গিয়েই কেন সিনেমা দেখতে হবে? প্রত্যেকের হাতেই তো এখন সিনেমা হল, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমা অ্যাপে আছে। ২০ টাকার ইন্টারনেট কিনে যদি ঘরে শুয়ে বসেই ছবি দেখা যায় তাহলে কেন ৫০০ টাকা খরচ করে মানুষ সিনেমা হলে যাবে? এরপরেও তো জীবনে ঝুঁকি আছে। এখন বাঁচার জন্য এবং সময়ের সঙ্গে চলতে গিয়ে ওটিটি টার্গেট করে ছবি বানাতে হবে। নেটফিক্স বা অ্যামাজন প্রাইম থেকে বিশ্বের কোটি মানুষ ছবি দেখছে এবং কোম্পানি ভালো লাভবান হচ্ছে।

তাহলে সিনেমা হল কালচার বিলীন হয়ে যাবে? 

আগে মানুষ দূরে থাকলে বাবা মায়ের কাছে চিঠি লিখতো। এখন সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারছে। আগে স্কুলে যেয়ে পড়তো এখন ঘরে বসে অনলাইনেই লেখাপড়া চলছে। শুনেছি ভিডিও কলে হার্ট অপারেশনও হচ্ছে। দুনিয়ার সব পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। তাহলে সিনেমা নিয়ে কেন আমরা পিছনের চিন্তায় পড়ে থাকবো। আমি সবসময় যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলতে পছন্দ করি। এখন যা করার সময় তাই করছি।

বোঝা গেল ইউটিউব আপনাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট রেখেছে! 

আমি আসলেই খুব ভালো আছি, এনজয় করছি। আমার পরিচিতি বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষীরা আমাকে নিয়মিত পাচ্ছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক মানে চলি, টাকার বদলে ডলার কামাই। ইউটিউবে আসার পরে জি-ফাইভের কনটেন্টে আমার নাম বলা হয়েছে। সুপারস্টার আফরান নিশো তার সংলাপে আমার নাম বলেছে। এটা আমার কাছে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার চেয়ে কোনো অংশে কম সম্মান নয়। ওই পরিচালক ও রাইটারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অথচ ৩৫ বছর ফিল্মে কাজ করেও আমার নাম বিদেশি কনটেন্টে আসেনি। ইউটিউবে এসে রোজগার যেমন করছি, সেখান থেকে বেশি সঞ্চয় করছি। আগে ছিলাম শুধু এফডিসির মানুষ। এখন তা নেই। ইউটিউবে আসার কারণে আমি অসুস্থ হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা সাহায্য নিতে হবে না। ইউটিউবে না এলে হয়তো কোনো একদিন আমি অসুস্থ হলে আমার পরিবারকেও হাত পাততে হতো। ইনশাল্লাহ এখন আমার আর সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। আমি বাস্তব কথাগুলো বললাম। জানিনা মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে।