চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুগঠিত সমাজব্যবস্থা ও গঠনমূলক সামাজিক কাঠামোর জন্য গণমাধ্যম শক্তিশালী হাতিয়ার এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম সহ বাংলা ও বাঙালির জীবনে সংঘটিত সকল গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক আন্দোলন সংগ্রামে মুক্তিকামী মানুষের পাশে থেকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সর্বোপরী, গণমাধ্যম সমাজের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে থাকে। সমাজের অভ্যন্তরীন যে কোন ধরনের সমস্যা, ত্রুটি/ বিচ্যুতি, সম্ভাবনা ও সামগ্রিক পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে নানাবিধ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে। গণমাধ্যমের আলোচিত/আলোড়িত খবরের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার প্রধানরা নানাবিধ বার্তা পেয়ে থাকেন যেখানে নাগরিক সমস্যা ও সম্ভাবনাসহ বিজ্ঞজনদের পরামর্শ ও মতামত পাওয়া যায়। তবে সে ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে, অন্যথায় নাগরিকরা গণমাধ্যমের উপর থেকে আস্থার জায়গা ধরে রাখতে পারবেন না।

গণমাধ্যম হারাবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা হারাবে গণমাধ্যম। কাজেই, গণমাধ্যমকে যেমন প্রগতিশীলতার চর্চা করতে হবে ঠিক তেমনি নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে হবে এবং পাশাপাশি গণমাধ্যমকে স্বাধীনতাও দিতে হবে রাষ্ট্রকে। তাহলেই গণমাধ্যম বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় যে কোন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গণমাধ্যমের ব্যাপক ও সুদুরপ্রসারী ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। গণমাধ্যম যদি স্বউদ্যোগে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো তাদের খবরের মাধ্যমে তুলে ধরে তাহলে তার সাপেক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজেই এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে। পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে অপরাধের হার কমে আসে এবং মানুষ তাদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা পায়। পাশাপাশি গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রদান করলে পুলিশ বাহিনীর জন্য সময় এবং অর্থের অপচয় হয়ে থাকে এবং সে সংক্রান্ত খবর থেকে জনগণের উপকার না হয়ে অপকার হওয়ার যথেষ্ট দিক বহমান থাকে। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী সার্ভিস অরিয়েন্টেড হওয়ার কথা থাকলে মূলত সিকিউরিটি অরিয়েন্টেড এর কাজ করে থাকে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পুলিশ প্রোঅ্যাকটিভ না হয়ে রিঅ্যাকটিভের ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া, প্রায় ১৩০০ জনের জন্য ১ জন পুলিশ সদস্য রয়েছে বাংলাদেশে। আবার দেখা যায়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তিবর্গের জন্য অতিরিক্ত পরিমাণে পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়ে থাকে। যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ ও পুলিশের আনুপাতিক হারও নগন্য অবস্থায় চলে আসে। আশেপাশের বিভিন্ন দেশে পুলিশ ও জনগণের আনুপাতিক হার আমাদের দেশের চেয়ে উন্নত অবস্থায় রয়েছে। কাজেই, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি সহযোগী হিসেবে কাজ করার জন্য নানাবিধ অনুঘটকের মধ্যে গণমাধ্যম অন্যতম।

উদাহরণস্বরূপ আমরা আলোচনা করতে পারি, বাংলাদেশ পুলিশ তাদের বাৎসরিক কৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিশেষ করে বাৎসরিক অপরাধের সংখ্যা, অপরাধের ধরণ, অপরাধের ভয়াবহতা এবং তৎসংশ্লিষ্ট নানাবিধ ঘটক অনুঘটকের তথা তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে। বিশেষ করে থানা বা মডেল থানায় রক্ষিত ও সংরক্ষিত কেস বা মামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে ভিক্টিমরা যে সব অভিযোগ করে থাকে সে সব বিষয়গুলো থানায় নথিভুক্ত থাকে। তবে এ কথাও সত্য বাংলাদেশে অপরাধের শিকার হওয়া সকল ভিক্টিমরা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন না। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, থানায় ডায়েরী করা নথিভুক্ত মামলার বাইরে অসংখ্য মানুষ নানাভাবে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। যার কোন তথ্য উপাত্ত বাংলাদেশে পুলিশের কাছে থাকছে না। কাজেই যে সব মামলার সংখ্যার প্রেক্ষিতে বাৎসরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেটি শতভাগ আলোর মুখ দেখবে না এটাই স্বাভাবিক কারণ অপরাধ সংক্রান্ত নানা ঘটনাবলীর বিবরণ ও মোট সংখ্যা পুলিশের নিকট থাকে না। এ ক্ষেত্রে যে ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম (থানায় যে সব ঘটনার অভিযোগ দায়ের করা হয় না) রয়েছে সে বিষয়ে সাংবাদিকরা জনসন্মুখে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নির্ভীক ও সততার পরিচয় দিতে হবে যেখানে পেশাদারিত্ব মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, বাংলাদেশ পুলিশ সাধারণত রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং এর প্র্যাকটিস করে থাকে। প্র্যাকটিস করে বললে ভুল বলা হবে, এককথায় বললে বাধ্য হয়ে (পুলিশে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে) পুলিশ রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং এর প্র্যাকটিস করে থাকে। অর্থাৎ ঘটনা ঘটার পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থলে হাজির হয় যার প্রেক্ষিতে অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সহজেই ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়তে পারে এবং ভিক্টিমও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে থাকেন। এ সকল ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি গণমাধ্যমও তথ্য উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করলে প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং প্রয়োগ করতে পারবে বাংলাদেশ পুলিশ। প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশং প্রয়োগ করতে পারলে ঘটনার ঘটার পূর্বেই পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে ভিক্টিমকে ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। বিশেষ করে বিপদাসংকুল এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি এবং অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্র সম্বন্ধে খবর পত্রিকার পাতায় আসলে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী নানাবিধ সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও সঠিকভাবে পুলিশিং প্রয়োগ করতে পারবে এবং কমে আসবে হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যম পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ও সহনশীল হয়ে উঠবে। তবে গণমাধ্যমকে তথা গণমাধ্যম কর্মীদেরও জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় পত্রিকা ছাড়া প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় অসংখ্য স্থানীয় পত্রিকা রয়েছে। এ বিশাল সংখ্যার সকল পত্রিকার নজরদারি করা কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। পত্রিকাগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো সংবাদ পরিবেশন করে থাকে, তাছাড়া অনেক পত্রিকার বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় পত্রিকার পাশাপাশি জাতীয় পত্রিকার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বিশেষ করে মালিকপক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে খবর পরিবেশন করার অভিযোগ রয়েছে। যার নিমিত্তে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে সংবাদপত্রের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বাস ও আস্থার সংকট দূর করতে না পারলে গণমাধ্যম কখনোই বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে না।

কাজেই, গণমাধ্যমকে বেশকিছু বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে সকলের নিকট, তা ব্যতীত আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গণমাধ্যম তেমন কোন ভূমিকাই রাখতে পারবে না। বিশেষ করে গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণ বন্ধ করতে হবে, গণমাধ্যম যদি কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে পত্রিকার পাতায় সংবাদ পরিবেশন করে, তাহলে আর যাই হোক না কেন সেই পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা সকল শ্রেণির মানুষের নিকট থাকে না। কিছু জায়গায় রাজনৈতিক দলের আদর্শকে মেনে চলতে পারে গণমাধ্যমগুলো তবে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সৎসাহস দেখাতে হবে সংবাদকর্মীদের। রাজনৈতিক দল ভুল করলে সেটার সংবাদও প্রকাশ করতে হবে পাশাপাশি ভাল কাজের জন্যও সাধুবাদ জানাতে হবে। না হলে নিরপেক্ষতা হারাবে ঐ সংবাদপত্রটি।

বিভিন্ন টক শো, গোলটেবিল বৈঠক ও আলোচনা অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে সেই গণমাধ্যম কখনো জনগণের জন্য কল্যাণমুখী কোন ভূমিকা রাখতে পারে না। গণমাধ্যমকে অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে, তবে তার মানে এই না, এই স্বাধীনতা যেন অন্যের মানবাধিকারকে লঙ্ঘন না করে। রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুনের মধ্যে থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তথ্য প্রমাণ সহ সংবাদ পরিবেশন করার নামই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বহাল রাখার জন্য রাষ্ট্রপক্ষকেও তথা সরকারকে নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। অন্যথায়, স্বাধীন সাংবাদিকতা বলবৎ করা সম্ভব হবে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বহাল থাকলে গণমাধ্যমকর্মীরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সহযোগী হয়ে কাজ করতে পারবে।
অন্যদিকে দেখা যায়, গণমাধ্যম কর্মীদের বিভাজন সুষ্ঠু সংবাদ পরিবেশন ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে থাকে। কোন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় ইস্যুতে গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যকার বিভেদ সাধারণ মানুষের নিকট তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে অবদমিত করে রাখে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে সাংবাদিকরা আজ দ্বিধাবিভক্ত যার কারণে জাতীয় ও গঠনগত বিষয়েও তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্য আনয়ন করতে পারছে না। তাদের এই দ্বিধাবিভক্তির কারণে সব জায়গায় তাদের বিশ্বস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই সংবাদপত্রের খবরের গভীরতা মানুষকে আগের মতো তেমন আর ভাবায় না।

কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা ছাড়া বেশির ভাগ সংবাদপত্র পক্ষপাতের দোষে দুষ্ট। কাজেই সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে প্রথমেই, না হলে স্থিতাবস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা দুটোই হারাবে সংবাদমাধ্যম।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View