চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অনন্ত যৌবনের খোঁজে আমাদের যুবশক্তি

দেশের মোট জনসংখ্যার সাড়ে ৫ কোটি যুবক। কিন্তু সেই তুলনায় যুবকদের জন্য আজও গড়ে ওঠেনি কোনো কর্মসংস্থান। সুযোগ পেলে নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন যুবারা। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের যুব হিসেবে ধরা হয়। এদের কর্মসংস্থানই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

যুবদের উন্নয়নে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে আগের তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি হয়েছে। এটা খুবই ইতিবাচক। তবে যুবকদের সঠিক কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়াই সময়ের মূল চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে তালিকাভুক্ত প্রায় ১৮ হাজার যুব সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠন যুবদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে যেমন যুবদের সংখ্যা বেশি ঠিক তেমনি তাদের মধ্যে সম্ভাবনাও বেশি রয়েছে। তবে তা কাজে লাগাতে হবে।

যুব উন্নয়ন অধিদফতর সূত্র জানায়, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৯৯ সাল থেকে ১২ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়। যুব সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয়।

এবছর আন্তর্জাতিক যুব দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে “যুবদের নাগরিক সম্পৃক্ততা”। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে ১০টি কর্মসূচি হাতে নিয়ে জাতিসংঘ কাজ করে। এগুলো হলো- ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, মাদকদ্রব্য ব্যবহারে ক্ষতিকর প্রভাব, শিশু অপরাধ, বিনোদন, শিশু ও যুব মহিলা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ।

বাংলাদেশের তরুণদেরও রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্ন এর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টি’র শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে তরুণ বা যুব সমাজ। আবার মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তর দিকে তাকালেও দেখা যায় মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া, বাহরাইনে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা আর স্বৈরশাসকের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তরুণরাই মূল ভূমিকা রেখেছিলো।

দেশে গণজাগরণ মঞ্চ প্রথম যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো তাও করেছিলো তরুণ সমাজ।

ইউএনএফপিএ’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বে ১০-২৪ বছর বয়সী ১৮০ কোটি মানুষ রয়েছে যা মোট জনসংখ্যার চারভাগের এক ভাগ। বাংলাদেশের ‘জাতীয় যুব নীতিমালা’ অনুসারে আবার ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ‘যুব’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ হিসেবে মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই যুব। তারুণ্যের এ বয়সটিকে অভিহিত করা হয় ‘যুদ্ধে যাবার সময়’ হিসেবে। একসময় ঢাল-তলোয়ার নিয়ে পরাশক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল। এখনকার যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল অকল্যাণের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে আর নিজেকে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখা।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় অংশীদার ও শ্রমশক্তির মূল যোগানদাতা এই যুব সম্প্রদায়। অভিবাসন ও দেশের তৈরী পোষাক খাতে যুব সমাজের একটা বড় অংশ কাজ করছে।

অন্যদিকে, যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাজ করছেন তাদের অবদানও কোনো অংশে কম নয়। দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে তরুণদের কাছ থেকে সক্রিয় অবদান চাইলে যুববান্ধব সমাজ গঠনের দিকে গুরুত্ব দেয়ার বিকল্প নেই।

তরুণদের সৃজনশীল বা দেশমাতৃকার কল্যাণে নিবেদিতের যেমন উদাহরণ রয়েছে তেমনি ঐশীর মতো ভুল পথে যাওয়া তরুণ বা যুব সমাজও চোখে পড়ে। ধনী ঘরের সন্তানেরা যখন মাদক ব্যবসা বা গাড়ী চোরাচালান চক্রের সাথে যুক্ত হয়, প্রথম কাতারের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী যখন মৌলবাদ ও খুনের সাথে জড়িত হয় তখন সত্যিই উদ্বেগ দেখা দেয়।

তারুণ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য একে অন্যের পরিপূরক। কিন্তু, দেশে শারীরিক অসুস্থতাকে যতটা গুরুত্ব দেয়া হয়, মানসিকটাকে ততটা দেয়া হয় না।

এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর ও তদুর্দ্ধ) যে কোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। ব্যক্তিত্বে সংঘাত, বন্ধুত্বের দ্বন্দ্ব, হতাশা, রাগ, ক্রোধ, পারিবারিক সমস্যা, হতাশা ইত্যাদি কারণে তরুণ প্রজন্ম দিনদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। মানসিক অসুস্থতা একসময় শারীরিক অসুস্থতায় রূপ লাভ করে। পর্যাপ্ত মানসিক সুস্থ থাকার পরিবেশ না পাওয়ায় তরুণরা একসময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। মাদক ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক অনুশাসন ও মানসম্মত শিক্ষার অভাবের কারণে তরুণরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায়।

জোর সমতা নিশ্চিত, দুর্নীতি নির্মূল, ক্ষুধা-দারিদ্র দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিশু ও মানবাধিকার রক্ষা, সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বিশেষ করে অনগ্রসরমান বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিতদের মৌলিক অধিকার রক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে তরুণ সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া গণমাধ্যমে বিশেষ করে কমিউনিটি রেডিও এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যুব সম্প্রদায় সমাজ সচেতনতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অপরদিকে, সরকার বিশেষ করে কর্মমূখী শিক্ষার দিকে নজর দিলেও শিক্ষিত বেকারদের জন্য সরকারের পক্ষে এখনও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। মেধাবী তরুণদের মেধা পাচার বন্ধ করে পর্যাপ্ত সম্মান ও প্রণোদনার কোন বিকল্প নেই। নাহলে দেশের সম্পদ নিয়ে উন্নত দেশগুলোই গর্ব করবে। দেশ বঞ্চিত হবে।

দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে (রূপকল্প ২০২১) তরুণদের পর্যাপ্ত মানসম্মতভাবে শিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণদের চাহিদা মাফিক উন্নয়ন কৌশল, পরিকল্পনা ও নীতিমালা জরুরী।

এমন একটি জাতি আমাদের প্রত্যাশা যেখানে যুব সম্প্রদায় বেকারত্ব, মাদক, পর্ণোগ্রাফি, অস্ত্রবাজি থেকে মুক্তি পাবে। সেই সাথে উৎপাদনমুখী বাস্তব শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বসহ সম্ভাবনাময় সকল গুনাবলী অর্জনের মাধ্যমে মানসিক সুস্থ তরুণরা স্বপ্রণোদিত হয়ে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে অধিক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ, সরকারি তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত, জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও প্রকল্প প্রণয়নে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সকল অনগ্রসরদের অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে। পরবর্তীতে তরুণদের কাছে ক্ষমতা অর্পিত হলেই দেশ পাবে উপযুক্ত ও কাঙ্খিত ভবিষ্যত।

Bellow Post-Green View