চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অটিজম সচেতনতা: কথাতো অনেক হলো, চলুন এবার কাজ শুরু করি

করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগে ওলোট পালোট সারাবিশ্ব। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২০০টি দেশ, মারা গেছে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এমন অবস্থায় এ সময়ে অন্য কোনো প্রসঙ্গ একটু বেমানান হলেও বলতে হচ্ছে একটি অন্য বিষয়। কারণ এ দুর্যোগ থেমে যাবে, আমরা আশা করছি পৃথিবী আবার তার আগের চেহারায় ফিরে আসবে। মানুষের জীবন স্বাভাবিক হবে। আবার শুরু হবে কর্মচাঞ্চল্য। অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করবে, দেশ এগিয়ে যাবে। সব ঠিকঠাক হয়েই যাবে আবারও।

আমাদের সমাজেই কিছু মানুষ আছে, যাদের বিশ্ব মন্দার পর ভালোদিন এলেও তেমন কিছু আসবে যাবে না। দিন ভালো হোক আর মন্দ এরা থেকে যায় সমাজের এক প্রান্তে, কেন্দ্রে আসার সাহস বা সুযোগ কোনোটাই মেলে না। আমরা আমাদের বিবেচনার মধ্যে সেই মানুষগুলোকে ঠিক ধর্তব্যে আনি না। বছরে দুই একটা দিবস ছাড়া তাদের নিয়ে ভাবার ফুসরতও মেলে না তেমন। সেরকমই একটা মনে করার দিন চলে গেল গত ২ এপ্রিল। বলছিলাম, অটিজমে ভোগা মানুষদের কথা আর অটিজম সচেতনতা দিবস নিয়ে। করোনার ভয়াল দুর্যোগের সময়ে অটিজম সচেতনতা নিয়ে এবার আর তেমন কেউ মুখ খোলেনি। আলোচনায়ও খুব একটা আসেনি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের অধিকার আর সমতার কথা।

বিজ্ঞাপন

অন্যান্য বছরগুলোতে বেশ আড়ম্বরে পালন হয় অটিজম সচেতনতা দিবস। আলোচনায়, অনুষ্ঠানে, ভাষনে, বক্তৃতায় বলা হয় অনেক কথাই। কিন্তু তাতে আসলে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না। হয় না তার কারণ, এসব আলোচনার শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও বাস্তব রূপরেখা আমরা দেখতে পাই না।

আমি মনে করি, কথা অনেক হয়েছে, এবার কাজ শুরু করার পালা। আর কাজ শুরুর প্রথম ধাপটি হচ্ছে এ সংক্রান্ত প্রচলিত একটি ধারণাকে দুমড়ে মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া। সেটা হচ্ছে ওরা কিছু করতে পারে না। আমরা দেখেছি ঠিকমতো শিক্ষা দিলে ওরাও পারে। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য্য ধরে শেখানোর কাজটি করে যাওয়া। বাংলাদেশে এমন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন তৈরি হয়েছে, যারা অটিজমে ভুগতে থাকা মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অটিজমে আক্রান্ত অনেকেই নিজেদের জীবনকে স্বাভাবিক করতে পেরেছেন। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে পেশাজিবী হিসেবে।

‘অ্যাঞ্জল শেফ’ নামে এটি বেকারী আছে, যেখানে অটিজমে আক্রান্ত ছেলেমেয়েরা কাজ করে যাচ্ছে সাধারণ মানুষদের মতই। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া বেকারিটির এখন ৯টি আউটলেট আছে এবং প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পিএফডিএ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের অধীনে ১৭ জন শিক্ষার্থী তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করে এখন পেশাদার শেফ হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

আরো একটি উদাহরণ দেয়া যায়, ‘স্বপ্ন’ নামের যে চেইন শপটি আছে সেটির। এসিআই তাদের এই জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটিতে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বেশ কয়েকজন মানুষকে কাজে নিয়েছে যারা বর্তমানে এখানকার নিয়মিত কর্মী। আর দশজন পেশাজীবির মতই তারাও কাজ করছে, আয় করছে এবং সেই আয়ের টাকা দিয়ে পরিবারের খরচ মেটাতে সাহায্য করছে। মানে পরনির্ভর না থেকে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার এ এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এই প্রতিষ্ঠান আর এর সাথে জড়িত মানুষগুলো।

এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এই যে কিছু প্রতিষ্ঠান পারছে, বাকিরা পারছে না কেন?

কাজের দ্বিতীয় ধাপের শুরুটা এখানেই। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ছাদের তলায় আনতে হবে। তাদেরকেও অন্তর্ভুক্তির এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবার জন্য প্রনোদনা দিতে হবে। আর এই প্রনোদনা দেয়ার মূল দায়িত্বটা হবে সরকারের। সরকার বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের কাজে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে। আর উন্নয়ন সংস্থা সরকারকে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগীতা করবে প্রশিক্ষিত কর্মক্ষম কর্মী তৈরি করে দিয়ে যারা কিনা অটিজম জয় করে তাদের স্বাভাবিক প্রাপ্ত বয়স্কের জীবন পাবে।

কিন্তু খোঁজ করলেই দেখবেন, এ সংক্রান্ত কোনো রূপরেখা নেই, কেউ তৎপরতার সাথে এমন একটি মঞ্চ তৈরি করেনি যেখানে সরকারি নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ণ সংস্থাগুলো একসাথে কাজ করবে। তাহলে যে অন্তর্ভুক্তির কথা আমরা বলছি সেটি কি করে হবে, যে অগ্রগতির স্বপ্ন আমরা দেখছি সেটা আসলেই কবে অর্জিত হবে?

সময় এসেছে সবার একসাথে একযোগে কাজ করবার। টেকসই উন্নয়ণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য হাতে আছে আর মাত্র ১০ বছর। ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ১০ নম্বর লক্ষ্যটি কিন্তু খুব স্পষ্ট করেই সমাজের সবক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলছে। আর সমতা নিশ্চিত করতে হলে পিছিয়ে পড়া মানুষদের সামনে এগিয়ে আনতে হবে। এ নিয়ে কাজ করার এখনই সময়। কথা অনেক হয়েছে, এবার চলুন কাজ শুরু করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)