ক্লদিয়া মারিয়া- বাংলাদশের অকৃত্রিম এক বন্ধুর নাম। যিনি ১লা জুলাই ২০১৬ হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় জীবন দিয়েছেন। তাকে আজ স্মরণ করি দারুণ শ্রদ্ধাভরে। আগুন সহিংসতার দিনগুলোতে র্বান অ্যান্ড প্লাস্টিক র্সাজারি বিভাগে দিনের পর দিন কাজের সুবাদে বিপদের বন্ধু ক্লদিয়ার সঙ্গে খুব সখ্য হয়ছিল। তিনি খুব ভালোবেসেছিলেন আমায়। দিনের পর দিন আগুনের পোড়া দুঃসহ যন্ত্রনাময় নিউজ কাভার করার ওই দিনগুলোতে আমার আবেগ-যন্ত্রনায় সমব্যাথী তিনি বলতেন- আমি নাকি তার দুঃখে খুব স্পর্শকাতর এক অনন্য ভালো মানুষ। গুড হার্টের্ট বলে ডাকতেন আমায়, আর আমি শুধুই হাসতাম। শেষবার ইন্টার প্লাস্ট ইতালি চিকিৎসক দলের নিজ দেশে ফেরার আগে ক্লদিয়া নিজ বাড়িতে ভোজসভায় আমাকেও আমন্ত্রণ জানান। আন্তরিকভাবে কয়েক দফায় ফোন করেছিলেন।
হলি আর্টিজানের ওই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে এক সকালে বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা সদাতৎপর অধ্যাপক ডাক্তার সামন্ত লাল সেন খুবই মর্মহত কষ্ট নিয়ে ফোন করলেন। দারুণ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন- আমাদের ক্লদিয়া মারিয়া কিন্তু আর নেই। আহারে আমাদের বার্ন ইউনিটের বন্ধু। অগ্নিদগ্ধ রোগীদের দারুণ শুভাকাঙ্খি স্বজন হারালাম আমরা। তারপর এই তো সেদিন আমার কল লিস্ট থেকে ক্লদিয়ার সেল নাম্বারটি ডিলিট করেছি। কিন্তু বন্ধু ক্লদিয়া মারিয়াকে রেখেছি আমার মনের মনি কোঠায়।
দিন-তারিখ ধরে ঠিক কোন তারিখে ক্লদিয়া মারিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় তা বলা সম্ভব। তবে এজন্য গত ১৬ বছরে বার্ন ইউনিটে আমার করা সব রিপোর্টের তারিখ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যা সময় সাপেক্ষ, কিন্তু অসম্ভব নয়। এজন্য আমার স্ক্রিপ্টের ফাইলটা আলোয় আনা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি একজন ক্লদিয়া মারিয়ার বন্ধুভাবাপন্ন দারুণ উদ্যোগী কর্মকাণ্ডের যতটুকু সম্ভব আলোয় আনা। তাই স্মৃতিতে ভর করে বন্ধু ক্লদিয়াকে স্মরণ করা।
ক্লদিয়া মারিয়া মূলত গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। একজন বায়ার হিসেবে এদেশের উন্নয়নের ধারায় তার নাম আগেই ছিলো। পরের দিকে এদেশের মানুষের সেবায় তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। নিজ উদ্যোগেই বিশ্বখ্যাত প্লাস্টিক সার্জারির আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইন্টার প্লাস্ট’-ইতালির সঙ্গে বাংলাদেশে মূলত বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের নিবিড় সংযোগ স্থাপনে যোগসূত্র গড়ে তোলেন। অগ্নিদগ্ধ ভুক্তভোগীদের সেবায় নিজেকে যুক্ত করে তাদের পাশে দাঁড়ান ক্লদিয়া।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির ইউনিট হিসেবে বিভাগের যাত্রা-উন্নয়নের পথে শরীক হন ক্লদিয়া মারিয়া। শিশুদের জন্মগত ঠোঠ কাঁটা, তালু কাঁটা মেরামতের যাত্রায় ‘ক্লেফট’ ক্যাম্পের মাধ্যমে বার্ন ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত হন ক্লদিয়া। ইতালীয় নাগরিক ক্লদিয়া মারিয়া নিজ দেশ ‘ইন্টার প্লাস্ট’ ইতালিকে বাংলাদেশের পাশে থাকতে সহায়তা করতে থাকেন। সদাতৎপর অধ্যাপক ডাক্তার সামন্ত লাল সেন প্রায় ফোন করে বলতেন, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে অমুক দিন থেকে বিনামূল্যে শিশুদের ঠোঁট কাটা তালু কাটার সার্জারি করবেন ইন্টার প্লাস্ট’র ইতালির বিশেষজ্ঞ প্লাস্টিক সার্জরা। কেকা এটা স্ক্রল আকারে দেয়া যায় তোমার চ্যানেলে? মানুষ জানবে, দূর-দূরান্ত থেকে ভুক্তভোগীরা আসবে। কেন নয় দাদা, বিশেষ করে দরিদ্র রোগীরা যাদের সামর্থ নেই ব্যয়বহুল প্লাস্টিক সার্জারির তারাই এর উপকারভোগী হবে, এই বিবেচনায় ইন্টার প্লাস্টের বিনামূল্যের বহু ক্যাম্পের কাভারেজ দিয়েছে অফিস।
ক্লেফট ক্যাম্পের সুবাদে এভাবেই গত ১০ বছরের মধ্যে কোন একদিন ক্লদিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অধ্যাপক ডাক্তার সামন্ত লাল সেন। তিনি বরাবরের মতই সেদিনও বলেছিলেন, কেকা কিন্তু সেই শুরু থেকেই মানে সংবাদপত্রে কাজ করার সময় থেকেই আমাদের সঙ্গে আছে। সেদিন আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্বের পরে কতবার দেখেছি ক্লদিয়াকে হিসাব নেই। দেখা হলে কথা হয়েছে, কমর্দন করেছি। আমাকে দুহাতে আলিঙ্গন করেছেন ক্লদিয়া।
তবে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে দেশব্যাপী আগুন-সহিংসতার সময় বার্ন ইউনিটে যখ অগ্নিদগ্ধদের উপচে পড়া ভীড়, নারী-শিশু-বৃদ্ধ-সদ্য বিবাহিত তরুণিসহ পথ চলতি বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষেরা আক্রান্ত হয়ে বার্ন ইউনিটে আসছেন তখন ক্লদিয়াকে আরো পাশে পেয়েছি আমরা। ওই সময়টায় ঢাকায় নিযুক্ত ইতালি রাষ্ট্রদূত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ের রাষ্ট্রদূত পিয়েরো মায়াদুনসহ যাকে বন্ধু ভেবেছেন প্রায় দিন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে নিয়ে এসেছেন। উদ্দেশ্য অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসা উপকরণ ওষুধ-পথ্য নিয়ে পাশে দাঁড়ানো।
বন্ধু ক্লদিয়াকে হারানোর বর্ষপূর্তিতে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক অধ্যাপক ডাক্তার সাজ্জাদ খন্দকার ভারক্রান্ত মনে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করলেন। ফোন করে বললেন, কেকা ক্লদিয়া মারিয়ার সঙ্গে পুরনো ছবিগুলো আজ আবার দেখলাম। ক্লেফট’র কত ক্যাম্প আয়োজন করে দিয়েছিলেন ক্লদিয়া।
আর অধ্যাপক ডাক্তার সামন্ত লাল সেন বলেন, বার্ন ইউনিট তার প্রিয় বন্ধু হারিয়েছে। শেষবার ইন্টার প্লাস্ট চিকিৎসকদল দেশে ফেরার আগে তোমাকে ডাকলো মনে আছে? কিন্তু তুমি তো গেলে না কেকা। সত্যি আমরা আমাদের বন্ধু হারিয়েছি।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বার্ন ইউনিটের সঙ্গে ক্লদিয়ার সম্পর্ক আরো নিবিড় হয়েছে। আর সাংবাদিক হিসেবেও তখন তার সঙ্গে আমাদের ঘন ঘন দেখা সাক্ষাতের সুবাদে আমাদের সঙ্গে সূচনা হয় সমব্যাথি সম্পর্কের। কারণ তখন ঔষধ-পথ্য চিকিৎসা উপকরণ নিয়ে বার্ন ইউনিটে ছুটে গেছেন বারবার। সবশেষ বার ক্লদিয়ার সঙ্গে ছিলেন ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েনে মায়োডন। অগ্নিদগ্ধদের শরীরের ক্ষত মেরামতের জন্য বিশ্বের খ্যাতিমান প্লাস্টিক সার্জারির চিকিৎসকদের স্বেচ্ছাসেবী আন্তজার্তিক সেবা সংস্থা ইন্টার প্লাস্ট-ইতালি নিয়ে এসেছেন দগ্ধরোগীর সেবায়। বন্ধু ক্লদিয়ার উদ্যোগে তার জীবদ্দশায় ইন্টার প্লাস্ট-ইতালির বিশ্বখ্যাত প্লাাস্টিক সার্জারির টিম বহুবার এসেছে বাংলাদেশে। অর্থ সাশ্রয়ে পুরো চিকিৎসকদলকে পাঁচ তারকা হোটেল সোনারগাঁ-শেরাটনে নয়, ক্লদিয়া মারিয়া তার বাড়িতে রেখেছেন। তাদের হোটেল খরচ অার বিলাসিতার খরচ সাশ্রয় করে সেই অর্থে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রোগীদের জন্য আরো কিছু দেবার চেষ্টা করেছেন আমার বন্ধূু আমাদের বন্ধু ইতালীয় ক্লদিয়া মারিয়া।
দারুন উদ্যমী, উচ্ছল, হাসি খুশি প্রাণবন্ত বন্ধুর নাম ক্লদিয়া মারিয়া। এদেশের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির বন্ধু, অগ্নিদগ্ধ রোগীদের বন্ধু। আমার বন্ধু ক্লদিয়া মারিয়া বাংলাদেশের এক অনন্য বন্ধু। ক্লদিয়া মারিয়া আমরা তোমাকে মনে রাখবো যুগ যুগ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







