সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ঘাস মরে যায় এই মাসে। মানুষের পায়ে পায়ে ছিঁড়ে যায় পুরোনো ঘাসের শীষ ও আগা-ডগা। এটি এক প্রাকৃতিক জীবন প্রবাহ। নতুন ঘাস জন্মাবে বর্ষার সময়ে গিয়ে। মুথাগুলো শুকোবে বইমেলা শেষ হলে। ঘাসেরা তখন অনুভবে স্মৃতি হাতড়াবে অজস্র পদচিহ্নের। পৃথিবীতে যে জায়গাগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অগণন মানুষের পায়ের স্পর্শ পড়ে। সেই জায়গাগুলোর আলাদা এক শক্তি থাকে।
সোহরাওয়ার্দি উদ্যান বাঙালি জাগরণের এক কেন্দ্রভূমি। জাতির জনক এখান থেকেই দিয়েছিলেন ৭ মার্চের ভাষণ। সেদিন অগণন মুক্তিকামী বাঙালির পদস্পর্শ পড়ে এখানে। এখান থেকেই তারা নিজের ভেতর জ্বালিয়ে নেয় চেতনার মশাল। এখান থেকেই আত্মসমর্পনের নথিতে সাক্ষর করে পরাজিত হানাদার। নিজস্ব স্বাধীনতা নিয়ে উদিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্য। একান্ন বছর পর চেতনাদীপ্ত এই পদস্পর্শের জায়গাগুলোতে যারা পা রাখছেন, তারা আসলে একটি পরম্পরার মধ্যে নিজেকে জড়াতে পারছেন। এই মুক্তিকামী চেতনার যে দীপ্তি তা অনুভব করতে পারছেন।
বহু ছিন্নমূল মানুষ সোহরাওয়ার্দি উদ্যোগের মাটিতে শুয়ে থাকেন। অনেক শিশু এই ঐতিহাসিক উদ্যানের ভেতর বড় হয়। এটি এক অন্য পৃথিবী। এই সময়ে সকালে নিরব প্রকৃতির ভেতর কণ্ঠ সাধে কোকিল। বেলা বাড়ে। একটি পরিবার সরব হয়ে ওঠে। বিকেল থেকে সন্ধ্যায় সেই পরিবারটিই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাঙালি পরিবার। এই একখন্ড ভুমির সুবিশাল জনসমষ্টির সঙ্গে যুক্ত থাকে সারা পৃথিবীর বাঙালি। বইমেলা রাত আটটা পর্যন্ত। মানুষের ঘরে ফেরার বিবেচনায় রাত দশটাতেও অসাধারণ এই নিসর্গের সরবতা থাকে। রাত এগারোটা পেরুলে গোটা সোহরাওযার্দি উদ্যানের যে টুকুতে বইমেলা সেই কেন্দ্রভূমি তখন পড়ে যায় ঝিমঝিম মগ্নতায় আলোর ভীড়ের ভেতর। শতাধিক পুলিশ আনসার ও নৈশ প্রহরির ফাঁকা ফাঁকা প্রহর কাটতে থাকে। এক এক অদ্ভুত ব্যাপার।
আমি বইমেলার নৈশকুশলী হিসেবে যাদেরকে চিনি তাদের একজন তৌহিদ, অন্যজন মতি। তাদের পুরো নাম তৌহিদুল ইসলাম ও মতিউর রহমান। রাত ১১টা থেকে নিরবতা নামতে থাকা এই বইয়ের শহরে তারা অন্যরকম নাগরিক হয়ে ওঠেন। তৌহিদের ভাষায়, “বইমেলায় বিশ্রাম নেবার বহু জায়গা আছে, কিন্তু তেমন ঘুম আসে না।” তৌহিদের কথায় বোঝা গেল, রাতে চারদিকে চোখ কান খুলে বিচরণ কিংবা দাঁড়িয়ে বা বসে দায়িত্ব পালনের ভেতরও কিছু আনন্দপ্রহর থাকে। মধ্যরাতে লেখককুঞ্জে জমে ওঠে লুডুর আসর। একসঙ্গে দুই থেকে চারজন অংশ নেয়া যায় এমন নানান খেলার আসর বসে ‘আমি লেখক বলছি’ মঞ্চেও। সেসময় বইমেলার আলাদা এক রূপ। রাত জাগা মানুষগুলো সারাদিনের কোলাহল ভাঙা নিরবতায় আনন্দের ফসল কুড়াতে থাকেন। অনেকেই বই নিয়ে এত বেশি মাতামাতির মানে খুঁজে পান না। অনেকে মেলা থেকে পাওয়া দুয়েকটি বই, কাগজ ও পত্রিকা নিয়ে বসে যান, কোনো এক আলোকিত কোণে।
রাতে স্বাধীনতা স্তম্ভের চূড়াতে ঘুমোতে থাকে বেশ কিছু চিল। মাঝে মাঝে নৈশব্দের ছন্দ ভেঙে জেগে উঠলে তাদেরও জাগে বিস্ময়, বইমেলায় আসা অগণন মানুষ কোথায় চলে যায়?
(চলবে)








