রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় হত্যা মামলায় সাত আসামীর সাজা কমানোর আইনি ভিত্তি ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের যুক্তি মিলেছে হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে।
আলোচিত এই রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘এই মামলায় দেশী-বিদেশী ২০ জন নাগরিকসহ ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে যে নিষ্ঠুর ও নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে তাতে বহিবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডটি জন সাধারনের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টিসহ জননিরাপত্তা মারাত্নকভাবে বিঘ্নিত করেছে। এমতাবস্থায় আতাউর মৃধা বনাম রাষ্ট্র মামলার নজিরের পর্যবেক্ষণের মর্মানুসারে আসামীদের আমৃত্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে।’
সন্ত্রাস বিরোধী আইনের ৬ (১) (ক) (অ) ধারা অনুযায়ী ‘হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ’ করার অভিযোগে একই আইনের ৬ এর (২) (অ) ধারা অনুযায়ী ৭ আসামীকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান।
তবে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭ আসামীর ক্ষেত্রে ‘হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ’ -এ সরাসরি জড়িত না থাকার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে আসামীদের ক্ষেত্রে ‘ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত’ করার দায় নিরূপণ করেন। এতে করে বিচারিক আদালতের দেয়া সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের অপরাধের ধারা থেকে যাবজ্জীবনের ধারায় সাজার রায় দেন হাইকোর্ট।
তাই সন্ত্রাস বিরোধী আইনের ৬ (১)(ক)(আ) ধারা অনুযায়ী অপরাধ বিবেচনা করে হত্যার ঘটনায় ‘ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত’ করার দায়ে আইনের ৬ (২)(ক)(আ) ধারা অনুযায়ী ৭ আসামীকে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। তবে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া আতাউর রহমান মৃধা বনাম রাষ্ট্র মামলার সিদ্ধান্তের আলোকে ৭ আসামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে আমৃত্যু কারাদণ্ড বলে সুনির্দিষ্ট করে রায় দেন হাইকোর্ট।

সাড়ে সাত বছর আগে রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় হত্যা মামলায় সাত আসামীকে বিচারিক আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে সোমবার আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামীদের আপিল খারিজ করে বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতে রাষ্ট্র পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ। আর আসামী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আরিফুল ইসলাম ও আইনজীবী মো: আমিমুল এহসান জুবায়ের।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের পাশে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে।
সেই রাতে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা রবিউল করিম ও সালাউদ্দিন খান নিহত হন। এছাড়াও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৩১ সদস্য ও র্যাব-১ এর তৎকালীন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদসহ ৪১ জন আহত হন। পরদিন ২ জুলাই ভোরে সেনা কমান্ডোদের পরিচালিত ‘থান্ডারবোল্ট’ নামের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়।
এরপর পুলিশ সেখান থেকে ১৮ বিদেশিসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন রেস্তোরাঁকর্মী। আর কমান্ডো অভিযানের আগে ও পরে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
দেশের মানুষকে হতবাক করে দেয়া সেই হামলার তিন দিন পর গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস সন্ত্রাস দমন আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন। এরপর ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির দুই বছর তদন্ত করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর বিচার শেষে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর এই মামলায় ৭ আসামীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। বিচারিক আদালতের ওই রায়ে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয় জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপনকে।পরবর্তীতে এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে আজ রায় দেন হাইকোর্টে।








