দীর্ঘ ১৯ মাস পর প্রকাশ্যে কোনো সমাবেশ করার অনুমতি পেয়েছে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল বিএনপি। আগামী ১২ নভেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে দলটি। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে (১২ নভেম্বর) রোববার দুপুর ২টায় সমাবেশ শুরু হবে।
সমাবেশের অনুমতি:
সমাবেশ করার অনুমতি নিয়ে বেগ পেতে হয়েছে বিএনপিকে। ৮ নভেম্বর সমাবেশ করার জন্য প্রথম আবেদন করলে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন চলার কারণে অনুমতি মিলেনি। আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয় ৮ তারিখের পরে অন্য কোন দিন বিএনপি সমাবেশ করতে চাইলে বিবেচনা করে দেখা হবে। সে অনুযায়ী পুনরায় ১১ নভেম্বর সমাবেশ করার অনুমতি চায় দলটি। তবে শেষ পর্যন্ত ১২ নভেম্বর বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি প্রদান করে ডিএমপি। সেই সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে একটি সাবধানী বাণীও পেয়েছে বিএনপি। অনুমতি দেয়ার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছে, “বিএনপি যদি সমাবেশের নামে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বসে থাকবে না”! সুশৃঙ্খলভাবে সমাবেশ করার পরামর্শ দেন ওবায়দুল কাদের।
বিএনপি নেতারা আনন্দিত:
অনেকদিন পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো ঐতিহাসিক স্থানে সমাবেশের অনুমতি পাওয়ার পর বেশ উৎফুল্ল ও আনন্দিত বিএনপির নেতাকর্মীরা। একধরনের চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। বিএনপি নেতারা সেটি প্রকাশ্যে স্বীকারও করছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, “আমরা আনন্দিত। আশা করি সরকার এই ধারা অব্যাহত রাখবে। সভা-সমাবেশ রাজনৈতিক দলের অধিকার। এখানে বাধা দেয়া যায় না”।
স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য বিষটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “কোন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সভা-সমাবেশের অনুমতির রাজনীতি কোথাও নেই আসলে। সরকার যে নিয়ম চালু করেছে এটা তো সংবিধান পরিপন্থী চিন্তাধারা। সংবিধানের স্পিরিটের সাথে এটা যায় না। একটা সমাবেশের অনুমতি নিয়ে বহু নাটক করেছে সরকার। তারপরও তারা যে দেরিতে হলেও অনুধাবন করতে পেরেছে তাতে আমরা আনন্দিত। আমাদের প্রত্যাশা, এ ধারা অব্যাহত থাকুক, গণতন্ত্রের যে চেতনার ওপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সেটা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এখন সেটা অনুপস্থিত।
বিএনপির নির্বাহী সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ এমন একটি বিশাল সমাবেশকে ঘিরে বিএনপিতে স্বভাবতই উৎসবের আমেজ থাকবে, তেমনটাই বলছেন। দীর্ঘদিন যাবত বেগম খালেদা জিয়া বড় কোন সভা সমাবেশ করতে পারছিলেন না। অনেকদিন পর তা পারছেন। আমাদের নেতাকর্মীরা অনেক আনন্দিত। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন।
সমাবেশের প্রস্তুতি:
অনেক আগে থেকেই বিএনপি বড় সমাবেশ করার জন্য হাহাকার করছিলো। কিন্ত মিলছিল না অনুমতি। অবশেষে তা মিলেছে। সমাবেশটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দলটি। যদিও অনুমতি পাওয়ার আগে থেকেই বিএনপি প্রাথমিক প্রস্ততি শুরু করে। দলীয় বিভিন্ন ইউনিটকে সমাবেশের জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়ে রাখে। বলতে গেলে সমাবেশে নেতাকর্মী জমায়েতের প্রস্তুতি দলটি আগে থেকেই সেরে নিয়েছে। অবশ্য বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, যেকোন সমাবেশের প্রস্তুতি থাকে মঞ্চ নির্মাণ, মাইক্রোফোন, মাইক, নিরাপত্তা, লোক সমাগম ইত্যাদি। অবকাঠামোগত প্রস্ততি থাকবে। সেটা শুরুও হয়েছে।
এদিকে রোববারের সমাবেশের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গত শুক্রবার বিকেলে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতমত্বে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিদর্শন করেছেন বিএনপির নেতারা।
মির্জা আব্বাসসহ নেতৃবৃন্দ জনসভাস্থল পরিদর্শনের পর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে বৈঠক করেন। সেখানে জনসভা অনুষ্ঠানের সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় উঠে আসে নিরাপত্তা, সমাবেশে লোক সমাগম, আলোচনার বিষয়, সহ বিভিন্ন বিষয়।
লোক সমাগম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে:
দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহর জনসমুদ্রে পরিণত হবে বলছে বিএনপি। সরকার কোন প্রকার বাধা না দিলে ১২ নভেম্বর সমাবেশে কি অবস্থা হয় তা সরকার দেখতে পাবে বলে মন্তব্য করেন দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।
সমাবেশে লোক সমাগম কেমন হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আব্বাস বলেন, সরকার তো সব কাজে বাধা দেয়। ম্যাডামের দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে যেতে নেতাকর্মীদের বাধা দেয়া হয়। এরপরও সেদিন কিভাবে নেতাকর্মীদের ঢল নেমেছিল তা দেশবাসী দেখেছে। এবার যদি সরকার বাধা না দেয় তাহলে লোক সমাগম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। তার মতে, জনগণ দিয়ে প্রমাণ হোক। ভবিষ্যতে আপনারাও তা যাচাই করতে পারেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
১২ তারিখের সমাবেশকে ঘিরে আলাদা কোন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না বলছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল। আমাদের নেতাকর্মীরা আমাদের জন্য নিরাপত্তা।
মির্জা আব্বাস বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করলেন, “বিএনপি অন্তত আওয়ামী লীগের মতো কোন বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল নয়”।
তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের করা একটি উক্তি নিয়ে আশংকার কথাও বলছেন বিএনপি নেতারা।
জামায়াত ও শরীকরা কি থাকছে?
অনেকদিন পর বড় সমাবেশ করছে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বদানকারী বিএনপি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায় যে, ২০ দলের অন্য শরীক দল জামায়াত সহ অন্য দলগুলোকে আমন্ত্রণ আছে কিনা সমাবেশে। এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন,‘আরে ভাই এটি বিএনপির সমাবেশ। অন্য কিছু এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলছেন, ২০ দলের শরীকদের সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সমাবেশের আলোচনায় কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে?
১২ তারিখের সমাবেশকে জাতীয় রাজনীতির মোড় ঘুরানোর উপায় হিসেবে দেখছে বিএনপি। বহুদিন পর প্রকাশ্যে বক্তব্য দিবেন দলটির সর্বোচ্চ নেতা বেগম খালেদা জিয়া। তিনি জনগণকে কি বার্তা দিবেন, তার আলোচনার বিষয় কি থাকতে পারে এমন প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক।
তবে মির্জা আব্বাস সেটির জবাব দিতে রাজি নন। তার মতে, এটি সমাবেশে জানতে পারবেন। কি বার্তা দিবেন তা ম্যাডাম বলতে পারেন।
তবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছিলেন, “সমাবেশে বিএনপির কথা, বাংলাদেশের চলমান সংকটের কথা, গণতন্ত্রের কথা, ভোটাধিকারের কথা আইনের শাসনের কথা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা, জীবনের নিরাপত্তার কথা, দেশে গুম খুন, মামলা-হামলা, সরকারের দুর্নীতি, রোহিঙ্গা সংকট ও আগামী জাতীয় নির্বাচনের কথা থাকবে।







