যুগ যুগ ধরে রক্ষণশীলের বৃত্তে বন্দী থাকা সৌদি আরব বর্তমানে অনেকটাই পরিবর্তনমুখী। বেশকিছু ক্ষেত্রে তারা এখন উদার মনোভাব পোষণ করে নতুনকে বরণ করে নিতে উন্মুখ। বিশেষ করে সেদেশের নারীদের চলাফেরা ও অধিকারের উপর এতদিন ধরে যে সব নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ এবং কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করা ছিল তার অনেক বিষয়েই সৌদি শাসকেরা এখন নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের এই পরিবর্তনমুখী সময়ে সেদেশ থেকে আমাদের নারী কর্মীদের নিপীড়িত-নির্যাতিত হওয়ার হাজারো অভিযোগে ফেরত আসা অভিবাসন খাতের জন্যে এক বড় অস্বস্তিকর সংবাদ।
এমন খবর কখনই কাম্য নয় এই কারণে যে সৌদি আরব বহুদিন ধরেই আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সুখ দুঃখের সাথী। আমাদের ঘোর দুঃখের দিনেও তারা পরীক্ষিত পরম বন্ধু, বিশ্বস্ত সারথী। কিন্তু সেই সৌদি আরবে আমাদের নারী কর্মীদের নিগৃহীত, নির্যাতিত হওয়ার সংবাদ আমাদের হ্নদয়কে ক্ষত না করে পারে না। যদিও সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় দৃঢ়তার সাথে বলছে নিপীড়ন নির্যাতনের কথা যতটা বলা হচ্ছে ততোটা নয়। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ঐসব ঘটনাবলী দিয়ে ঢালাওভাবে সবকিছু মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
৪ জুন দৈনিক সমকালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, ৩০ জন নারী সৌদি আরব থেকে ‘এয়ার আরাবিয়ার’ এ ফিরে এসেছেন। তারা সবাই আসেন একই উড়োজাহাজে। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে নির্যাতিত নারীরা জানান তারা কোনো বেতন পাননি। নির্যাতন এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফহোমে তারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই কোনোরকমে তারা দেশে এসেছেন। শুধু এই নারীরাই নন, আরো যারা ফিরে এসেছেন তারা ঘুরেফিরে এ ধরনের কথাই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। প্রতিনিয়ত মারধরের শিকার, গৃহকর্তা বা নিয়োগকারী কর্তৃক যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার, জোরপূর্বক যৌন ব্যবসায়ে লিপ্ত হতে বাধ্য করা-এরকম আরো অনেক অভিযোগের কথা তারা বলেন।
গত কয়েক মাসে সৌদি থেকে কয়েক হাজার নারী শ্রমিক ফিরে এসেছেন। দেশের একটি শীর্ষ দৈনিক ৬ জুন এক রিপোর্টে বলছে সৌদিতে গত তিন বছরে প্রায় দুই লাখ নারী কর্মী গেছেন। এর মধ্যে ফেরত এসেছেন ছয় হাজার নারী কর্মী। প্রায় তিনহাজার নারী কর্মী বিভিন্নভাবে নির্যাতিত নিপীড়িত হওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
দেশের নারী শ্রমিকদের কাজের সন্ধানে অন্যদেশে যাওয়া দুই যুগেরও বেশি হয়েছে। মূলত ৯০ এর দশকের শুরুতে দেশের নারী কর্মীরা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গমন শুরু করে। বিএমইটির ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ১৯৯০ সালে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে মোট ২ হাজার ১৮৯ জন নারী কর্মী প্রথমবারের গমন করে। তবে বিদেশে নারী কর্মী গমনের প্রবাহটা বৃদ্ধি পায় মূলত ২০০৪ সালের দিকে। সে বছর সৌদিআরব, আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশে মোট ১১ হাজার ২শত ৫৯ জন নারী কর্মী গমন করার সুযোগ লাভ করে। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বলা যায়, প্রতি বছরই এই হার উর্ধ্বমুখী হতে থাকে। ২০০৫ সাল থেকে এই হার আরো বাড়তে থাকে। এ বছর সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে চাকরি নিয়ে ১৩ হাজার ৫৭০ জন নারী কর্মী গমন করে। দেখা যায় এর পরের বছরগুলোতে নারী কর্মীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এর পর ২০০৬ সালে ১৮০৪৫ জন, ২০০৭ সালে ১৯০ ৯৪ জন, ২০০৮ সালে ২০৮৪২ জন, ২০০৯ সালে ২২২২৪ জন, ২০১০ সালে ২৭৭০৬ জন, ২০১১ সালে ৩০৫৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩৭৩০৪ জন, ২০১৩ সালে ৫৬৪০০ জন, ২০১৪ সালে ৭৬০০৯ জন গমন করে।
এদিকে সৌদি আরব নারী কর্মী নেওয়ার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে শেষ তিন বছরে নারী কর্মী গমনের প্রবাহ আরো বাড়তে থাকে। দেখা যায়, ২০১৫ সালে বিভিন্ন দেশে মোট ১ লক্ষ ৩ হাজার ৭১৮ জন নারী কর্মী গমন করে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই ২০৯৫১ জন নারী কর্মী গমন করে। ২০১৬ সালে সৌদী আরবে নারী কর্মী গমনের সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে যায়। এ বছর মোট ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮৮ জন নারী কর্মী গমন করে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবে যায় ৬৮২৮৬ জন নারী কর্মী। ২০১৭ সালে নারী কর্মী গমনের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। মোট ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮৮ জন নারী কর্মীর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন নারী কর্মী যায়।
এদিকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৫১ হাজার ৭২৬ জন নারী বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৫৭৮ জন নারী কর্মী শুধু সৌদি আরবের জনশক্তির বাজারে প্রবেশ করে। এর বাইরে ওমানে ৪৮১৪ জন, জর্দানে ৩৫০৮জন, কাতারে ১৬৬৯ জন, আরব আমিরাতে ৯৬১ জন, লেবাননে ৬৮৮ জন নারী কর্মী কাজের সুযোগ লাভ করে। এ ছাড়াও কুয়েত, মৌরিতাস, হংকং, সিঙ্গাপুরেও কিছু নারী কর্মী কাজ করতে গমন করে।
বিএমইটির দেওয়া তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা কর্মরত রয়েছেন এর বড় অংশই সৌদি আরবে (২ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩০৭ জন) কর্মরত। শতাংশের হিসেবে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে ৩২.৬৭%, জর্ডানে মোট ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৩২৮ জন (১৭.৮৩%), আরব আমিরাতে মোট ১ লক্ষ ২৬ হাজার ৯৬২ জন ( ১৬.৯৮%), লেবাননে মোট ১ লক্ষ ৪ হাজার ৮৯৫ জন (১৪.০৩%), ওমানে মোট ৬৯ হাজার ৪১৬ জন ( ৯.২৮%)।
এ পর্যন্ত মোট ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭২৬ জন নারী বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। বলতে দ্বিধা নেই যে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক আজ বিভিন্ন দেশে কাজ করছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের এক বিরাট অবদান রয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারীদের নির্যাতনের খবর নতুন নয়। এর আগে জর্ডান, লেবাননেও প্রচুর নারী কর্মীর নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়। প্রশ্ন হলো কেন এমনটি হচ্ছে? এতদিনেও কেন আমরা নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলাম না। এখন পর্যন্ত কেন আমরা দু’পক্ষেরই জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি করতে ব্যর্থ হলাম। এটাতো সত্য এখনও যে প্রক্রিয়াতে একজন নারী কর্মী প্রেরণ করা হয় সেখানে নানাধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। প্রথমত যারা সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছেন তাদের দক্ষতার অনেক অভাব রয়েছে।
বেশিরভাগের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। এ ছাড়া ভাষাগত সমস্যাও প্রকট। এসব বিষয়ে কথা বলেছিলাম ওয়ারবী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সাইফুল হক-এর সাথে। অনেকদিন ধরে তিনি অভিবাসন বিষয়ে কাজ করছেন। অভিবাসীরা যাতে ন্যায্য অধিকার পায় এবং অভিবাসী হতে ইচ্ছুকরা যেনো প্রতারিত না হন এসব বিষয় নিয়ে তিনি শুধু দেশে বিদেশের অনেক বড় বড় ফোরামেও উচ্চকিত থাকেন। কদিন আগে তাকেই প্রশ্নটি করেছিলাম এই বলে যে, সৌদি আরবে কর্মক্ষেত্রে নারীরা কেন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসছেন। সৈয়দ সাইফুল হক অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করেন।
তবে দুটি কারণ বললেন বিশেষভাবে। এই দুটি কারণের প্রথমটি হলো-সৌদি আরবের পুরুষগুলো এখনও বাড়ি বা বাসার গৃহপরিচারিকা বা ভৃত্যকে নিজের সম্পত্তি মনে করেন। শুধু মনেই করেন না, তাদেরকে ভোগ করার অপার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। দ্বিতীয় কারণটি বললেন, অ্যারাবিয়ানদের বড় অংশই লেখাপড়া জানে না। ফলে কুৎসিত মানসিকতা তারা পরিত্যাগ করতে পারেনি। এসবেরই নৃশংসতার শিকার হন বাংলাদেশ থেকে সৌদিআরবে যাওয়া নারীরা। এর বাইরে অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে তিনি মনে করেন যারা বিদেশ যান তারা দক্ষতা অর্জন না করেই যান, ফলে কর্মক্ষেত্রে তারা ততোটা ভালো পারফরমেন্স দেখাতে পারেন না। এ ছাড়া ভাষাগত সমস্যা, খাবার-দাবারের সমস্যাতো রয়েছেই। সৈয়দ সাইফুল হক আরো বলেন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নারী কর্মীদের একেবারেই বিনা খরচে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সির দালালরা নানা কৌশলে বাড়তি টাকা গ্রহণ করে থাকে। সব মিলিয়ে নানান অভিযোগ এখানে দৃশ্যমান।
সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী প্রেরণে এখন নানান অসঙ্গতি রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই এই সব অসঙ্গতি দূর করতে আরও সতর্ক ও স্বচেষ্ট হতে হবে। শুধু বেশি কর্মী গেছে এই আত্মতুষ্টি নিয়ে থাকলেই চলবে না। সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী প্রেরণ এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও মন্ত্রণালয়ের বড় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অযথা দোষারোপ না করে এই সময়ে কী কী কারণে সৌদি থেকে নারী কর্মীরা ফেরত আসছে সেই অনুসন্ধানটা ভালভাবে করে এবং তার প্রতিকারগুলো ঠিক করেই নারী কর্মী প্রেরণ করা উচিত। নতুবা আগামী দিনে আরো বড় ধরনের দুঃসংবাদ শুনতে হতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







