সকালে কর্নফ্লেক্স ইউথ মিল্ক, লুচি, আলুর দম, চিজ অমলেট আর টোষ্ট সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বেরিয়ে পড়ার পালা। আমরা পুনাখা থেকে পারোর উদ্দেশে রওনা হলাম সকাল সাড়ে নয়টায়। পুনাখা-পারোর পথ ভারি সুন্দর। পাহাড়ে পাহাড়ে সবুজ বন। আপেল, সাইপ্রেস, পাইন ইত্যদি নানা গাছ। খুবই মনোরম দৃশ্য। জনবিরল এই দেশে হিমালয়, সজীব প্রকৃতি নিজেকে অকৃপণভাবে মেলে ধরেছে।
দোচুলাতে আবার থামা হলো। কফি পান। আরেকবার হিমালয় দেখার ব্যর্থ চেষ্টা। এখান থেকে মন কিছুতেই যেতে চায় না। জায়গাটা সত্যিই অসাধারণ। আকাশ কী গভীর নীল (নীল সত্যিই নীল নয়, তবু মায়াই তো সুন্দর, মায়াই তো যাপনযোগ্য করেছে জীবনকে; লক্ষ অপূর্ণতা, সীমাহীন অভাব, আঘাত, বিচ্ছেদ, বেদনা, দুঃখ সত্ত্বেও মানুষই তো বলে, আরও একটু থেকে যাই, এখনই ‘যাব না অসময়ে’)! স্বচ্ছ সাদা ওড়নার মতো কুয়াশা ছড়িয়ে আছে পাহাড়ে পাহাড়ে। এই মায়া কাটিয়ে আমাদের আবারও রওনা হতে হলো।
আমরা থিম্পু পৌঁছলাম প্রায় সাড়ে এগারটায়। পারো যেতে হবে থিম্ফুর পাশ দিয়ে। থিম্ফুর প্রবেশপথে তোরণে লেখা- “তাশি দেলেক” (Tashi Delek)। উচ্চারণ ঠিক হল কিনা জানি না। এর মানে- আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা। উল্লেখ্য, ভুটান একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দেশ। তবে পূর্ণ রাজতন্ত্র নয়। কিছুটা গণতন্ত্রের চর্চাও আছে। মন্ত্রীপরিষদ আছে। আছে ছোট্ট একটি সংসদ। অতীতে ভুটান পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত অনেকগুলি আলাদা আলাদা রাজ্য ছিল। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এটি ছিল একটি বিচ্ছিন্ন দেশ। ষাটের দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ভুটানের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে মাতৃভাষা জংকা ভাষায় দ্রুক ইয়ুল বা বজ্র ড্রাগনের দেশ নামে ডাকে।
১৯৫২ সালে জিগমে ওয়াংচুকের ছেলে জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ভুটানের ক্ষমতায় আসে এবং তার আমল থেকেই এর অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ১৯৭১ সালে ভুটান জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৭২ সালে ১৬ বছর বয়সে জিগমে সিংগে ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসেন। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের ছেলে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক ভুটানের রাজা হন। তিনি উচ্চশিক্ষিত, সিংহাসনে বসার আগে ভারতে ও ব্রিটেনে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ভুটানে খুব জনপ্রিয়। ভুটানের আয়তন ৪৬,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১৪ সাল অনুযায়ী এর লোকসংখ্যা ৭,৬৫,৫৫২ জন মাত্র যা আমাদের বাংলাদেশের পুরাতন যেকোনো জেলাশহরের জনসংখ্যার সমান।
পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি। নানা রকম উচ্চতা পেরিয়ে চলছে গাড়ি। রাস্তার দু’পাশে পাইন গাছের সমারোহ, নাম না জানা রঙবেরঙের বনফুল আর ঝর্ণাধারার ঝিরিঝিরি। প্রকৃতি যেন দু’হাত ভরে সাজিয়েছে দেশটাকে। পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর অরণ্যে মোড়া সে যেন এক অবাক রূপসী। চলতে চলতে মাঝে মধ্যেই একরাশ মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে আশেপাশের দৃশ্যপট। ঘন কুয়াশার জাল কেটে সাবধানে আঁকা বাঁকা পথে চলেছে গাড়ি। দুপুরে আমরা পারোতে পৌঁছলাম।
পারোতে আমরা যে হোটেলে উঠলাম তার নাম Taktshang Paradise, Paro. ছিমছাম পরিচ্ছন্ন। দুপুরে হোটেলে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে আড়াইটায় আমরা আবার রওনা হলাম ভুটানের আরেকটি বিখ্যাত জায়গা চেলালা পাস অভিমুখে। পারো থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে। আমাদের গাড়িচালক এবং গাইড তাশিজির মতে, এখানে পৌঁছানোর আট-দশ কিলোমিটার আগেই নভেম্বর মাস থেকে বরফ দেখা যায়। এক সময় গাছপালা ছাড়া সবই দেখা যায় ঢেকে আছে বরফে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বরফের দেখা মেলে। এপ্রিল-মে মাসে রাস্তার দু’ধারে ফুটে ওঠে ১৪৮ রঙের রডোরেনড্রন ফুল। সেই দৃশ্যও মনোমুগ্ধকর। মেঘ আর বৃষ্টির জন্য খাড়া পাহাড়, পাহাড়ের নিচে গহীন খাদ, ঘন অরণ্য আর নাম না জানা বাহারী ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
আমাদের শেষ গন্তব্য প্রায় ১৫০০০ ফুট উঁচ্চতায় চেলালা গিরিপথ। পাহাড়ের ঢালে শ্বেতশুভ্র বরফাবৃত চিরহরিৎ পাইনের সারি। ভ্যালিতে পৌঁছে এমন সৌন্দর্য দেখে আমরা তো নির্বাক! বৃষ্টি পড়ছিল। ভয়ানক ঠাণ্ডা। তার মধ্যেই আমরা নেমে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। এই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় আমাদের ছবি তোলার মহড়া চলতে থাকল। এ দিকে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার। পাহাড়ের খাড়া পথ বেয়ে ফিরতে হবে। কিন্তু আমাদের হুঁস নেই। যেন এক বাঁধনহারা আনন্দ। এমন সুন্দর স্থান থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না কিছুতেই।
তবু ফিরতে হয়, ফিরে আসতে হলো আমাদেরও। আঁকাবাকা পথ অতিক্রম রাত্রির বুক চিরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল পারোর টাইগারনেস্টের পাদদেশে, আমাদের হোটেল অভিমুখে। আসতে আসতে মনে হলো, ভুটান আসলেই সৌন্দর্যের দেশ, শান্তির দেশ, নিঃশব্দের দেশ। এখানে স্নিগ্ধতা ও শান্তিময়তা হৃদয় দিয়ে ছুঁয়ে দেখা যায়। মানুষ খুব বন্ধুভাবাপন্ন। বাংলাদেশের পাশেই এত সুন্দর দেশ, ঘুরে না এলে খুব মিস করতাম!








