ইয়োহান ক্রুইফ নিশ্চয় স্বর্গে বসে তৃপ্তির হাসি হাসছেন! তার হাসিটা মর্তের মানুষরা হয়তো দেখছে না। কিন্তু তার অসাধারণ মেধার পরিচয় ফুটবলবোদ্ধারা ঠিকই টের পাচ্ছেন আরেকবার। প্রশংসায় হয়তো মুখ দিয়ে আলতোভাবে এও বলছেন, ‘ক্রুইফ, আপনিই সবসময় ঠিক!’
মঙ্গলবার জুভেন্টাসকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে বিদায় করে দিয়ে চমকের পর চমক জাগাচ্ছে আয়াক্সের নতুন প্রজন্মের সোনালি তরুণরা। কিন্তু অনেকেরই হয়তো অজানা যে, মৃত্যুর আগে নিজ হাতে আয়াক্সের বর্তমান দলটার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন ক্রুইফই!
২০১১ সাল। মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে যে আয়াক্সকে বিশ্ব দরবারে চিনিয়েছিলেন সেই দলের বেহাল দশায় একটা ভীষণ ধাক্কা খেলেন ক্রুইফ। একি সেই আয়াক্স যে দলটাকে টানা তিনবার ইউরোপ সেরা করেছিলেন তিনি? কিংবদন্তি কোচ মিশেল রাইনাসের সঙ্গে জোট বেঁধে হয়ে উঠেছিলেন ইউরোপের ত্রাস!
আয়াক্সের পতনের অবশ্য বড় কারণও ছিল। ১৯৯৫ সালে শেষবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর ক্রমেই পিছিয়ে পড়া শুরু ক্লাবটির। এরপর ক্লাবকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে সহজ পথ বেছে নেন কর্মকর্তারা। বিখ্যাত যুব একাডেমি থেকে যারাই উঠে আসত, তাদেরই ভালো দামে বিক্রি করে দেয়া হতো। তাতে শিরোপা না মিললেও খেলোয়াড় বিক্রি করে বেশ ভালো অর্থ জমা হতো ক্লাবের কোষাগারে।

কিন্তু রক্তে যার সাফল্য সেই ক্রুইফের জন্য বিষয়টি মেনে নেয়া ছিল বেশ কঠিন। তাই নিজ উদ্যোগেই পূর্ণগঠনের ব্যবস্থা করেন ক্লাব একাডেমির। নিজেই নাম রাখেন ‘ডে তোয়েকেমোস্ত’ মানে ভবিষ্যৎ!
এই দলটার কী লক্ষ্য হবে সেটাও ঠিক করে দিয়েছিলেন ক্রুইফ নিজে, ‘নিজের দিকে খেয়াল দাও। কারণ তোমার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই একটা দলকে সেরা হতে সাহায্য করবে।’
আয়াক্সের স্টেডিয়াম ইয়োহান ক্রুইফ অ্যারেনা থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে অবস্থান ডে তোয়েকেমোস্ত একাডেমির। এই একাডেমির হয়ে সার্বক্ষণিক মেধাবী ফুটবলার খুঁজে বেড়ান ৮ জন স্কাউট ও ৯০ জন ভলান্টিয়ার। নিত্য নতুন প্রতিভাবান ফুটবলার দিয়ে ভরে উঠছে একাডেমিও।
তবে যে উদ্দেশ্যে একাডেমি পূর্ণগঠন করেছিলেন ক্রুইফ, এটা বলা যায় যে, তা এরই মধ্যে ফল দেয়া শুরু করেছে। প্রথমে রিয়াল মাদ্রিদকে, তারপর জুভেন্টাসকে তাদের মাঠে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে বিদায় করে দিয়েছে আয়াক্সের নতুন প্রজন্মের সোনালি তরুণরা।
ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং, ম্যাথিয়াস ডি লিট, ডনি ফন ডে বিক, ক্যাস্পার ডলবার্গ, গোলরক্ষক আন্দ্রে অনানা এবং রাসমাস ক্রিস্টেনসেনের মত একাডেমি থেকে উঠে আসা তরুণরাই আয়াক্সকে দেখাচ্ছেন পঞ্চমবারের মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বপ্ন!
কেবল ডি ইয়ংরাই নন, দলে আছেন ডেলে ব্লাইন্ডের মত অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারও। আয়াক্স একাডেমি থেকে উঠে আসা এই ডিফেন্ডার চার মৌসুম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে গিয়ে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন। পরে নিজের আঁতুড়ঘরে ফিরে চেনাচ্ছেন নিজেকে।
বেঁচে থাকলে নিজের উত্তরসূরিদের এমন পারফরম্যান্স দেখে যেমন খুশি হতেন ক্রুইফ, তেমনি ক্লাবের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়াতে হয়তো দুঃখও পেতেন। যেই স্বপ্ন নিয়ে একাডেমিটাকে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন ডাচ কিংবদন্তি, সেই স্বপ্নটাকে যে নিজেরাই গলা টিপে মারতে বসেছেন ক্লাব কর্মকর্তারা!
আয়াক্সের বর্তমান দলটার সবচেয়ে পরিচিত মুখ এখন ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে খেলেন। রিয়াল মাদ্রিদকে তাদের মাঠে উড়িয়ে দেয়ার অন্যতম কারিগর। তার সঙ্গে জাভি-ইনিয়েস্তার খেলার ধরন মিলে যায় বলে বার্সেলোনার নজরে ছিলেন। কয়েকদফা দরদামের পর গত শীতকালীন দলবদলে ডি ইয়ংকে ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে ঠিকই শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে আয়াক্স। অর্থাৎ,পরের মৌসুমে আয়াক্স ছাড়ছেন সোনালি প্রজন্মের সেরা এই খেলোয়াড়।

কেবল ডি ইয়ংই নন, আয়াক্স ছাড়ার লাইনে আছেন বর্তমান দলটার অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক ম্যাথিয়াস ডি লিট। ডি ইয়ংয়ের পাশাপাশি ডি লিটকেও চায় বার্সা। একইসঙ্গে ক্লাবটির নজর গোলরক্ষক আন্দ্রে অনানার দিকেও। শুরুর দিকে বার্সার একাডেমি লা ম্যাসিয়া দিয়ে খেলা শুরু করায় আয়াক্স গোলরক্ষকের আবার অন্যরকম টান আছে বার্সার প্রতি!
এই মৌসুমে আয়াক্সের হয়ে নিজেকে চেনাচ্ছেন ফরোয়ার্ডে ডেভিড নেরেস। এরইমধ্য ব্রাজিলিয়ান উঠতি তারকাকে দলে টানতে নড়াচড়া শুরু করেছে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো। ডনি ফন ডে বিককে চায় এভারটন, এসি মিলানের মত ক্লাবগুলো। আরেক ফরোয়ার্ড হাকিম জিচকে নেয়ার জন্যও টানাহেঁচড়া শুরু করেছে ক্লাবগুলো।
লম্বা সময় ধরে খেলোয়াড় কেনাবেচায় পারদর্শী হয়ে ওঠা আয়াক্স চাইছে তাদের এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে। কিন্তু ইউরোপের অন্য ক্লাবগুলো যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছে, বড় অর্থ ঢাললেই যে তাদের খেলোয়াড়দের পাওয়া সম্ভব ডি ইয়ংই তার বড় উদাহরণ। হয়তো ডি লিটও চলে যাবেন। আগামী মৌসুমেই বড় বড় ক্লাবগুলোতে ছড়িয়ে যাবেন একে একে। চাইলেই তাদের নতুন সোনালি প্রজন্মের অর্ধেক খেলোয়াড়কেও ধরে রাখতে পারবে না আয়াক্স! ইয়োহান ক্রুইফ যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, এক অর্থের কাছেই মৃত্যু ঘটবে তার পুরোটাই!







