সামরিক শক্তির ছাউনিতে জন্ম নেওয়া বিএনপি শুরু থেকেই বাংলাদেশে পাকিস্তানী ভাব ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করতে মরিয়া। ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে উঠা কৃত্তিম রাষ্ট্র পকিস্তানের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্র্রিক দেশ গড়ে তোলার জন্য সাড়ে সাত কোটি বাঙালী মুক্তির জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদেরকে জাতির জনক একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সংবিধান দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরনের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিলেন। একটি সুখী সমৃদ্ধশালী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য পথ চলতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু জাতির দুভার্গ্য যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতির পিতাকে সহপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবারো অন্ধকারের গলিপথে চলতে বাধ্য করা হয়। ক্ষমতার পালাবদলে উর্দি পরেই জেনারেল জিয়া যখন দেশের সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রে তখন তিনি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে নিয়ে গিয়ে একটি মিনি পাকিস্তান বানানোর প্রয়াস চালালেন। প্রথম আঘাতটি হানলেন,আমাদের সংবিধানের মৌলিক যে চারটি ভিত ছিল তাতে। তিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে মৌলবাদি পাকিস্তানী চেহারায় দেখতে চাইলেন তার দামি কালো চশমার মধ্যে দিয়ে। চতুর ও প্রতারক জেনারেল জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাল্টে দিলেন রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চেহারা। খুবই সুক্ষ্মভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে তিনি রাষ্ট্রের সুন্নাতে খাৎনা করার ব্যবস্থা করলেন। স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে পাকিস্তান পন্থীদের পুর্নবাসন করলেন। আর এই রাজাকার পুর্নবাসনকেই বর্তমান বিএনপি বলে, জেনারেল জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা! তাকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা না বলে বলা উচিত রাজাকার পুর্নবাসনকারী এবং পাকিস্তান চেতনা বাস্তবায়নকারী প্রধান সিপাহসালার। কিন্তু বিচিত্র ব্যাপার এই যে, জেনারেল জিয়াও একজন জীবিত সর্বোচ্চ খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
ভালোবাসায় আর কৃতজ্ঞতায় পরাজিত পাকিস্তান পন্থীরা বিএনপিকে কখনো একা ছাড়েনি। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞ থেকেছে বিএনপির কাছে জামায়াত ইসলামীসহ স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলো। বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী আজন্ম সহবাসের যুগলবন্ধী বাংলাদেশের রাজনীতিতে। গত চার দশকে আর্থিকভাবে প্রভূত ক্ষমতাধর হয়ে উঠা জামায়াত ইসলামী এখন সরাসরি বিএনপির নীতি নির্ধারনী পর্যায়েও যথেষ্ট প্রভাব রাখে। আর তাই জামায়াত এর বাইরে গিয়ে বিএনপির দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ যথেষ্ট কমই বলতে হয়। লন্ডন থেকে বছরজুড়ে ইতিহাসের নয়া পাঠদান করে আসছে জেনারেল জিয়ার উত্তরাধিকার তারেক রহমান। সম্প্রতি চিকিৎসার নামে লন্ডন সফরে হয়তো বেগম জিয়াও পুত্রের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন করে একটু আধটু পড়াশুনা করে এসেছেন! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা বহু পুরনো। পরাজিতরা কখনোই আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করতে চাইনি। বারবার বির্তকের পথ বের করতে চেয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানকে অস্বীকার করে প্রথম বক্তব্য আসে লন্ডন থেকে। আমরা একদিন মধ্যরাতে হঠাৎ করে জানতে পারলাম জেনারেল জিয়া নাকি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি! এই বিষয়ে বিএনপি নেতারা পরে বলতে লাগলেন তারেক রহমান যা বলেছেন তা ইতিহাস ঘেটে বইপত্র পড়েই তিনি নাকি বলেছেন। কিন্তু কোন কোন বইয়ে এই কথাগুলো লেখা ছিল তা বলেননি বিএনপি নেতারা। তাই আমাদেরও সেই দুর্লভ জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে!
সাম্প্রতিক সময়ে দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মাস্টার মাইন্ড বদর কমান্ডার আলী আহসান মুহম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী ফোরামের সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান যেমন করে ‘ডিপলি ডিস্টার্ব’ হয়েছে এবং পুরনো সেই মিত্রদের পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞে সাহায্য করার অপরাধে ফাঁসি দিতে দেখে নিজেদের অপরাধী চেহহারাকে আড়াল করতে পারেনি পাকিস্তান। এটা সরাসরি একটা স্বাধীন দেশের উপর হস্তক্ষেপ। সকল প্রকার সভ্যতা ভব্যতার তোয়াক্কা না করে পাকিস্তান যেটা করেছে তা একেবারেই অনধিকার চর্চা। অবশ্য পাকিস্তান কোন কালেই সভ্য রাষ্ট্র ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হতে পারবে বলে কেউ বিশ্বাসও করে না। তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কখনোই স্বীকার করেনি। তারা ১৯৭১ সালে যে গণহত্যা চালিয়েছে তা সব সময়ই তারা অস্বীকার করেছে। বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা পাকিস্তানের কখনো পরিবর্তন হয়নি। তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে তাদের মিত্রদের দিয়ে এবং পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিকদের দিয়ে।
এখন প্রশ্ন হলো এই মিত্র কারা? আমরা সবাই জানি জামায়াত ইসলামী তাদের প্রকাশ্য মিত্র। কিন্তু শুধু কি জামায়াত ইসলামীই একমাত্র পাকিস্তানী মিত্র না আরো আছে। বিএনপি মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক দল বলে নিজেদেরকে দাবি করে কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে তাদের গভীর প্রেম আজন্ম। বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশকে পাকিস্তানী আদলে একটি মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তান করার সকল আয়োজন আমরা দেখেছি সর্বশেষ বিএনপি-জামায়াতের ২০০১-২০০৬ সালের ক্ষমতাকালে। তারা তাদের প্রভুদের মন রক্ষা করে চলবে এতে অবাক হওয়ার কিছুু নেই। পাকিস্তানের গয়েন্দা বাহিনী আইএসআইও তাদের সঙ্গে তৎপর রয়েছে। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বির্তকিত করার চেষ্টা করে তখন তার মিত্র বেগম খালেদা জিয়া বসে থাকলে কি চলে! আমাদের গ্রাম দেশে একটা প্রবাদ চালু আছে, ‘মনিবের থেকে মনিবের কুকুর বেশি জোরে চিল্লায়।’ খালেদার মনিবেরা যখন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বির্তকিত করার চেষ্টায় ব্যস্ত তখন এক ধাপ এগিয়ে এসে বেগম খালেদা জিয়াও তাদের সুরে সুর মিলিয়ে মিথ্যা কথা বলে আরো জোরে। খালেদা জিয়া যখন বলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বির্তক আছে তখন এইটা খুবই গুরুত্ব বহন করে পাকিস্তানীদের কাছে। কারণ খালেদা জিয়া এই দেশে যেমন করেই হোক তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
পাকিস্তানীরা এখন এই বির্তক রেফারেন্স দিয়ে আরো চাঙ্গা করবে বিভিন্ন ফোরামে। কারণ খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীই না একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীও বটে। তাই খালেদার এই বক্তব্যকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। তিনি হঠাৎ করে কেন এই বক্তব্য দিলেন? বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, সংবিধানকে কেন তিনি তোয়াক্কা না করে এমন রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিলেন? তার নিজের বা দলের কোন অবদান ও গৌরব নেই বলে কি তিনি মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করবেন। মুক্তিযুদ্ধের মত একটা গৌরবকে তারাই অস্বীকার করতে পারে যাদের মুক্তিযুদ্ধে কোন প্রকার অবদান বা গৌরব নেই। তিনি কার স্বার্থ উদ্ধার করলেন এই বক্তব্য দিয়ে। এর একটা কারণ হতে পারে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে তিনি এখন মানসিক হতশায় ভুগছেন বা জামায়াতের সঙ্গে সঙ্গমের রাজনীতি করতে করতে নিজের ডিএনএ সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। তার বড় পুত্র তারেক রহমান লন্ডনের মত একটা বড় শহরে আছেন অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে কোন প্রকার ব্যবসা বা চাকরি বাকরি ছাড়া পুরো পরিবার নিয়ে।
এই বিলাসবহুল জীবন যাপনের পেছনে কার অর্থ আছে এখন আমাদের বুঝতে আর কোন অসুবিধা হয় না। নুন খেলে একটু তো গুন গাইতেই হয়। কিন্তু খালেদা জিয়া হয়তো ভুলে গেছেন, তিনি তার এই উল্টোচলো নীতির কারণে বাংলাদেশে তার রাজনীতির কবর রচনা করলেন। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে এই দেশে কেউ আর রাজনীতি করতে পারবে না। ক্ষমতার বাইরে থেকে ক্ষমতার অর্গাজমের সুখ নিতে চাইলে এমন বেফাঁস কথা বলে কোন লাভ নেই। খালেদার কথাকে আমি বেফাস মন্তব্যও বলবো না। এটা খুবই পরিকল্পিত একটি মিথ্যাচার করেছেন তিনি তার প্রভুদের খুশি করতে। পাগলা কুকুরের জলাতংঙ্ক রোগ হলে হয় তাকে শেষ করে দিতে হয় না হলে ভ্যাকসিন দিতে হয়। এখন সময় এসেছে রাজনীতিতে এইসব জঞ্জাল পরিস্কার করার। হয় এদের রাজনীতি শেষ করে দিতে হবে না হয় ভ্যাকসিন অর্থাৎ জেনোসাইড ডিনাইল ল করতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও জাতির জনককে নিয়ে কোন বাজে মন্তব্য করতে না পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







