ঠিক স্টেশনে পৌঁছুতেই সবাই ট্রেন থেকে নেমে পড়েন; চলে যান নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে। থেকে যান শুধু একজন। তিনি ট্রেন থেকে নেমে ছুটে যান না নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কারণ ঘর বা গন্তব্য যা-ই বলা হোক, তার কাছে ওই ট্রেনই সব।
তিনি হলেন লিওনি মুলার। ট্রেনের বগিকেই নিজের বাসা মনে করেন তিনি। জার্মান কলেজ ছাত্রী লিওনি গত বসন্তে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দেন। ‘বাড়িওয়ালার সাথে বিরোধের মধ্য দিয়েই বাসা নিয়ে প্রথম সমস্যাটা শুরু হয়। তখনই আমি ঠিক করি আমি ওই বাসায় আর থাকবো না। আর তখন আমি বুঝতে পারি, আমি আসলে আর কোনোখানেই থাকতে চাচ্ছি না,’ ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান তিনি।
তাই এক ফ্ল্যাট ছেড়ে অন্য ফ্ল্যাট খোঁজার বদলে লিওনি এমন এক ধরনের সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজ কিনলেন, যার মাধ্যমে দেশের যে কোনো রুটের রেলগাড়িতে তিনি যখন খুশি তখন চড়তে পারবেন, আলাদা কোনো ভাড়া ছাড়াই। সেই থেকে ট্রেনেই তার বাড়ি, ট্রেনেই তার ঘর!
লিওনি ট্রেনের বাথরুমেই গোসলসহ রোজকার কাজকর্ম সারেন। প্রতি ঘণ্টায় ১শ’ ৯০ মাইল বেগে চলন্ত ট্রেনের বগিতে বসে তিনি লেখাপড়া করেন। আগে থাকা ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর তুলনায় এই ‘ট্রেন-বাসা’য় নিজেকে খুব স্বাধীন মনে হয় লিওনির। তিনি বলেন, ‘ট্রেনগুলোকে আমার নিজের বাসা মনে হয়। অনেক শান্তি পাই আমি এখানে থাকতে। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে আমি বন্ধুদের সাথে দেখা করতে পারি, বিভিন্ন শহর ঘুরে বেড়াতে পারি। ব্যাপারটা অনেকটা সবসময় ছুটি কাটানোর মতো।’
২৩ বছর বয়সী এই নারীর ভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রার কথা উঠে এসেছে জার্মানির গণমাধ্যমগুলোতে। ‘আমি পড়ি, লিখি, জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকি আর নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হই,’ একটি জার্মান টিভি স্টেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন লিওনি, ‘ট্রেনের ভেতর সবসময়ই কিছু না কিছু করার থাকে।
যেহেতু এখান থেকে সেখানে ঘুরে বেড়াতে হয়, সেহেতু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়েই ঘোরেন লিওনি। চলার পথে ছোট একটা ব্যাকপ্যাকে থাকে কিছু কাপড়-চোপড়, ট্যাবলেট কম্পিউটার, কলেজের দরকারি বইখাতা আর স্যানিটারি সরঞ্জামের একটা ছোট্ট পুটলি।
লিওনি কখনো রাত কাটান ট্রেনের বগিতে। কখনো আবার স্টেশনে নেমে কাছাকাছি কোনো বন্ধুর বাড়িতে চলে যান। মাঝে মাঝে আবার রাতে থাকেন দাদী বা বয়ফ্রেন্ডের বাসায়। এতে তাদের সাথে সম্পর্ক আরো গাঢ় হচ্ছে বলে মনে করেন লিওনি।
সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ ভ্রমণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কিন্তু লিওনির বর্তমান জীবনধারা গবেষণার সম্পূর্ণ বিপরীতটাই প্রমাণ করে।
শুধু তাই নয়, এতে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন লিওনি। এভাবে ট্রেনে চলাচলে থাকার ভাড়ার পেছনে মাসে তার খরচ হয় ৩শ’ ৮০ মার্কিন ডলার। যেখানে আগের অ্যাপার্টমেন্টে তার মাসিক ভাড়া ছিলো ৪শ’ ৫০ ডলার। কেবল আর্থিক সাশ্রয়ই লিওনির ট্রেন-জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। নিজের জীবনধারার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষকে বোঝাতে চান, প্রচলিত সাধারণ জীবনই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা নয়। ভিন্নভাবে থেকেও স্বাভাবিকভাবে, বরং আরো ভালোভাবে বাঁচা যায়।ভিন্ন একটি অ্যাকাডেমিক উদ্দেশ্যও রয়েছে এই জীবনের। ট্রেনে কাটানো অভিনব জীবনের বিভিন্ন ভালোমন্দ অভিজ্ঞতা লিওনি টুকে রাখছেন নিজের ব্লগে। একজন আধুনিক ‘রেল-যাযাবর’ হিসেবে হওয়া অভিজ্ঞতা নিয়ে স্নাতক শ্রেণীর গবেষণাপত্র তৈরি করবেন তিনি।
ট্রেন থেকে ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো, থাকা-খাওয়া, সব নিয়েই সন্তুষ্ট লিওনি। সমস্যা শুধু একটাই… ‘আশপাশের শব্দ থেকে বাঁচতে সারাক্ষণ সঙ্গে হেডফোন নিয়ে ঘুরতে হয়!’







