জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি যাদুঘরের এক্সিবিশন গ্যালারিতে শনিবার ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশন’ (সিআরআই) আয়োজিত বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা: যাত্রা, অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ শীর্ষক সেমিনারের আইনমন্ত্রী তার বাবার সাথে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথনের দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করেছেন।
ওই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পহেলা অগাস্ট ১৯৭৫। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। ফিরে এসে এই কথাগুলো আমাকে বললেন। উনি যখন সেখানে গেলেন, তখন ওখানে খোন্দকার মোস্তাক ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর আগে থেকেই বসা ছিল। এরপর তাদেরকে রেখে আমার বাবা ও বঙ্গবন্ধু একটু দূরে বাইরের লনে হাঁটতে গেলেন।
“বঙ্গবন্ধু আমার আব্বাকে বললেন, তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। আমার কাছে খবর আছে যে খোন্দকার মোস্তাক তোমাকে মেরে ফেলবে। আমি তোমার বাসায় গার্ড রেখে দেব। তখন আমার বাবা বঙ্গবন্ধুকে বললেন আমাকে মারলে তো একটা বুলেটের দাম উঠবে না তাহলে আমাকে মারবে কেন? আর আমার বাসায় গার্ড পাঠালে মক্কেলরা আমার সাথে দেখা করতে আসবে না। তখন বঙ্গবন্ধু আবার বললেন, না না না আমি গার্ড পাঠিয়ে দেব। এরপর বঙ্গবন্ধু বললেন খোন্দকার মোস্তাকের চুলের গোড়া থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত হারামিতে ভরা। ওকে বাংলাদেশে আর কেউ চেনে না আমি ছাড়া। তখন আমার বাবা বঙ্গবন্ধুকে বললেন, এটা যদি শুনে থাকো তাহলে আমাকে না তোমাকেওতো মারতে পারে। আমার পিতাকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ওকে কি ধরে ফেলবো? তখন আমার পিতা বললেন, না আরো একটু তদন্ত করে ধরো। এরপর বাবার মুখে শুণেছি যে, আমি কেন বললাম না ধরে ফেলো?
২ অগাস্ট থেকে ১২ অগাস্ট পর্যন্ত অন্তত ৫ বার খোন্দকার মোস্তাককে আমাদের বাসায় আসতে দেখেছি। আর আমার বাবাকে মুখে শুণেছি যে খন্দকার মোশতাক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কী কথা হয়েছিলো। তারপর তো ১৫ আগস্ট এর ঘটনা ঘটলো। আমরা সব বুঝলাম দেখলাম।
তারপর ১৫ অক্টোবর। খন্দকর মোস্তাক আমার বাবাকে এলাকা থেকে খবর দিয়ে ডেকে আনলেন। এই বলে যে সকল এমপি দের সঙ্গে উনি কথা বলবেন। বঙ্গভনে কথা বলবেন। আমার পিতা যখন যাচ্ছেন তখন আমাকে উনি বললেন, ‘আমি একটা গরু। আমাকে জবাই করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম আমার পিতাকে ওখানে কি হয়েছে? তখন আমার পিতা বললেন, বঙ্গভবনে ঢুকার সময় একটা কাগজ দেয়া হল। আমি কাগজটা মুচড়িয়ে রেখে দিয়েছি।
এরপর ডায়াস থেকে বলা হল এখন বক্তব্য দেবেন অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক। তখন আমি উঠে দাঁড়িয়েই বলেছি ‘ইউ আর নট দ্যা প্রেসিডেন্ট অব বাংলাদেশ। ইউ আর এ মার্ডারার।’
রাতে আমি আমার বাবাকে বললাম, আপনি এটা করতে গেলেন কেন? তখন আমার বাবা বললেন, ‘দেখো, আমরা ছোটবেলার বন্ধু। আমার একসাথে মধুমতি নদীটা পার হোতাম। যদি আমি না পারতাম আমাকে টেনে নিয়ে যেত। আর যদি ও না পারত আমি ওকে টেনে নিয়ে যেতাম। এখন ঘুমের মধ্যেও আমার বন্ধু আমাকে বলে বাচ্চু (বাচ্চু আইনমন্ত্রীর বাবার ডাক নাম) তুই ও কি কিছু বলবি না? সেই তাড়না থেকে আমি বলে ফেলেছি।
আলোচনা অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ২১ বছর পরে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মালার এজাহার দায়ের করা হয়। আমি এখানে বলব ২১ বছর পরে যে কোন হত্যা মালার এজাহার দায়ের করা হলে সেই মামলার অনেক সাক্ষী-সাবুদ শেষ হয়ে যায়। আর এই ২১ বছর কারা ক্ষমতায় ছিল? যারা হত্য করেছিল তারা ছিল ক্ষমতায়। তাদের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল রক্ত মুছুক আর না মুছুক অন্তত পক্ষে এই রক্ত যারা ফেলেছে তাদের হাতটা পরিস্কার হয়ে যাক। ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স করেছিল। যাতে কোথাও কন বিচার না হতে পারে। তারপর কূটনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে বিদেশে পাঠান হল। তাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে রাখার জন্য। কারন তাদেরকে ধরে ফেললে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সবার বিষয় চলে আসবে।
“অন্তত ৪ হাজার লোকের ইন্টারভিউ করার পর ৬১ জন সাক্ষী বের করা হল। যারা ছিল প্রত্যাক্ষদর্শী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে ৩২ নম্বরের বাসায় কিন্তু সব ষড়যন্ত্র হয়েছে ক্যান্টনমেন্টে। কুমিল্লার বার্ডে মিটিং হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায় না আসলে এই হত্যার বিচার হত কি না আমার সন্দেহ আছে। আজকে আমরা বিচারটা পেয়েছি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বলেই।”
ওই সেমিনারে অতিথি ও বক্তা হিসেবে আরও ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও সিআরআইয়ের ট্রাস্টি নসরুল হামিদ এমপি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুরা হোসেন, প্রাক্তন সচিব ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘরের কিউরেটর নজরুল ইসলাম খান, দৈনিক জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়, সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন।








