বিরোধীপক্ষের শত হুমকি ও বাধা উপেক্ষা করে শেষ পযন্ত নির্বাচনী মাঠে টিকে থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারে এমন হেভিওয়েট প্রার্থীদের বাছাই করছে বিএনপি।
দলটির ধারণা, প্রশাসন, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশন কেউ অনুকূলে নেই। সবাই সরকারি নির্দেশ মেনে কাজ করবে। আর প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা অবাধে নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবে- এসব বিষয়গুলো ভেবেই বিএনপি প্রার্থীতা বাছাই করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও সাক্ষাতকার দেয়ার সময় এই বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রেখেই নিজেদের উত্তর দিচ্ছেন। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে আনার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করছেন।
ভিডিও কনফারেন্সে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডন থেকে জোর দিচ্ছেন নির্বাচনে টিকে থাকার লড়াইকে। প্রতিপক্ষের হুমকি শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে পারবে এমন প্রার্থীই বেছে নেয়া হবে।
সাক্ষাতকার শেষ করে বিভিন্ন আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বেরিয়ে এসে বলছেন, মনোনয়ন বোর্ড এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, লড়াই করে টিকে থাকার মতো প্রার্থীকেই বাছাই করা হবে। নিজ নিজ এলাকায় প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে শক্তি সামর্থ্যে পেরে ওঠতে পারে এমন প্রার্থীদের গুরুত্ব দেয়া হবে।

বিএনপির যুক্তি হলো, ‘জনগণ তাদের পক্ষে আছে। তারা জনগণকে নির্বিঘ্নে ভোট দেয়ার সুযোগ করে দিতে পারলেই ধানের শীষের বাজিমাত হবে’।
সাক্ষাতকারের শুরুতে প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে তারেক রহমানের স্পষ্ট বক্তব্য ছিলো এরকম: এই নির্বাচন বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী শক্তির অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন, দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নির্বাচন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার নির্বাচন। এই নির্বাচনে ব্যর্থ হলে সকল কিছু ব্যর্থ হয়ে যাবে। আর তাই, যেকোনো কিছুর বিনময়ে নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। জনগণের ভোট নিশ্চিত করতে হবে এবং সেরকম হেভিওয়েট প্রার্থীদেরকেই বাছাই করা হবে’।
এক্ষেত্রে দল থেকে যাকে মনোনয়ন করা হবে তার পক্ষে কাজ করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে দলের সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দিকেও ইঙ্গিত দেয়া হয়ছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও নিজেদের দলীয় ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে সেভাবে আশ্বস্ত করেছেন যে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার মতো লড়াই করবেন এবং বিজয়ের জন্য সকল ঝুঁকি গ্রহণ করবেন। আর এক্ষেত্রে দল যাকে মনোনয়ন দেবেন তার পক্ষেই সবাই একত্রে কাজ করবেন।
বরিশাল-৪ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান সাক্ষাতকার শেষে বলেন, সরকারের সকল বাধা, ঝুঁকি এবং হুমকিকে উপেক্ষা করে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় ছিনিয়ে আনার ব্যাপারে তারেক রহমানের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি। আমি কথা দিয়েছি, ধানের শীষকে বিজয়ী করতে, দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে, আমাদের চেয়ারপার্সন বেগম খালদা জিয়াকে মুক্ত করতে, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা সকল ঝুঁকি, হুমকি গ্রহণ করবো’।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ বরিশাল-৫ আসন থেকে সাক্ষাতকার দিয়ে বলেন, এবার নির্বাচনে যাচ্ছি পিছিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, শেষ পযন্ত লড়াই করে যাওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তারেক রহমানকে। এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই, টিকে থাকার লড়াই। এই লড়াইয়ে জিততেই হবে। চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনার মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের বিজয় হবে । কোনো চাপ, কোনো ষড়যন্ত্র জনতার ঐক্যের কাছে টিকে থাকবে না এবার’।
বাগেরহাট-৪ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমাদের সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় তারেক রহমান যুক্ত হওয়ায় প্রেরণা পেয়েছি। উৎসাহ এবং শক্তি পেয়েছি। এই শক্তি দিয়ে জনগণের ভালবাসা নিয়ে নির্বাচনের মাঠে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকব। এই ঐক্য আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত করবে’।
ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন প্রত্যাশী জাসাসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সংগীত শিল্পী মনির খান।
তিনি বলেন, তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে। এই নির্বাচনে জয় লাভ করলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য কাজ করতে বলেছেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার কথা বলেছেন। আমরাও সেভাবে কথা দিয়েছি। এই নির্বাচনের জন্য আমরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার কথা জানিয়েছি’।
ভোলা থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দীন আলম বলেন, এবার আমরা ছাড় দিয়ে কথা বলছি না। দল যাকে মনোনয়ন দেবেন, তার হয়ে লড়াই করব। এই আন্দোলনে আমাদের জিততে হবে। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং গণতন্ত্রের জন্য আমাদের জিততে হবে’।
নির্বাচন বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজার (অব:) হাফিজউদ্দীন আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনে এমন ক’জন নির্বাচন কমিশনার বসিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে। পুলিশের সহায়তায় সরকার নির্বাচন বানচাল করে একটি বানোয়াট ফলাফল উপস্থাপন করার লক্ষে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না। আমরা আমরা নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো এবং দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবো’।

সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিএনপি। সকাল ১০টায় বরিশাল ১ আসনের প্রার্থীদের সাক্ষাতকারের মাধ্যমে দ্বিতীয় দিনের সাক্ষাতকার গ্রহণ শুরু হয়। বরিশাল বিভাগের সাক্ষাতকার গ্রহণ শেষে বিকালে খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর প্রার্থীদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়।
সকালে বরিশালের ২১ টি আসন থেকে ১৮৩ জনের সাক্ষাতকার এবং দুপুর থেকে খুলনার ৩৬টি আসনের ৩০০ এর মতো মনোনয়ন প্রত্যাশীর সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত চলে এ সাক্ষাতকার গ্রহণ।
এর আগে রোববার প্রথমদিনে রংপুর বিভাগে ৩৩ আসনে ১৫৮ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয় এবং রাজশাহী বিভাগে ৩৯ আসনে ৩৬৮ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানদণ্ড কি হচ্ছে বিএনপির এমন প্রশ্নেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন: নিঃসন্দেহে যার দলের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য বেশি থাকবে, যারা বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট প্রতিষ্ঠা করতে চায়, এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভোটে টিকে থাকার লড়াই করবে সেসব প্রার্থীরাই এখানে নমিনেশন পাবে। বেশিরভাগ প্রার্থী আমাদের এই বিষযটির প্রতি একমত, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে। এই নির্বাচনকে আমরা আন্দোলনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছি।
মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগ এবং বেলা আড়াইটা থেকে রাত পর্যন্ত কুমিল্লা ও সিলেট বিভাগের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হবে। পরদিন বুধবার সকাল ৯ টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুর এলাকা এবং বেলা আড়াইটা থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের প্রার্থীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হবে।

এদিকে সোমবার দুপুর ৩টা থেকে বিটিআরসি থেকে গুলশান কার্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।
বিএনপির অভিযোগ, তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সে যেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করতে না পারে তার জন্য এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে সরকার।
এবিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সোমবার রাতে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।







