ছিনতাইরোধে ঢাকা মহানগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশি পেট্রোলিং বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপি। অপরাধবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পুলিশি নজরদারিটা সঠিকভাবে হচ্ছে না, অনেক সময় ছিনতাইকারী চক্রের সঙ্গে পুলিশেরও যোগসাজস থাকে।
১৮ ডিসেম্বর সকালে রাজধানীর ওয়ারীর দয়াগঞ্জে ছিনতাইয়ের সময় রিকশা থেকে পড়ে সাত মাসের শিশু আরাফাতের মৃত্যু হয়।
গত ৮ অক্টোবর ওয়ারীর কেএম দাস লেনে বাসা থেকে বের হওয়ার পর একশ’ গজের মধ্যে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খন্দকার আবু তালহা। এর আগে ৩০ জুন দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে জালাল নামে এক তরুণ খুন হন ওয়ারী এলাকায়।
২৭ অক্টোবর কদমতলীতে হেলাল উদ্দিন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় সাড়ে চার বছরের শিশু রুহি করিমকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদরদপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে জানা যায়, শুধু এ পাঁচটি হত্যার ঘটনায় নয়, ঢাকা মহানগরে পুলিশের আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে ওয়ারীতে। এ বিভাগের সাতটি থানা এলাকায় গত তিন বছরে খুনের ঘটনা ঘটেছে ১১৯টি। শিশু নির্যাতনের ঘটনাও এখানেই বেশি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, রাজধানীর ওয়ারী ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সেখানকার ভৌগলিক অবস্থান ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে অপরাধগুলো সংগঠিত হয়।

অপরাধের ভিন্নতার কারণ নির্ণয়ে আমাদের দেশে কোন গবেষণা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোন গবেষণা নেই। আমাদের বিভাগটি নতুন। আমরা ভবিষ্যতে অপরাধের কারণ নির্ণয়ে গবেষণা করব।
তিনি বলেন, যে এলাকায় উচ্চবিত্তরা থাকে সেই এলাকায় এক ধরনের অপরাধ হয় এবং যে এলাকায় নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ থাকে সেখানে আরেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। অপরাধ প্রতিরোধে কতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেটিই আসল বিষয়।
‘আমরা সবাই জানি রাজধানীর সোনারগাঁও মোড়ে প্রায়ই মুঠোফোন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, আশে পাশে পুলিশও থাকে, তবে তারা নীরব ভূমিকা পালন করে। দেখা যায়, ওই এলাকার টহল পুলিশের সঙ্গে ছিনতাইকারীদের যোগসাজস থাকে। এসব ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতা আরো বাড়াতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ছিনতাইকারীরা অধিকাংশই মাদকাসক্ত থাকে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মাদকাসক্তদের বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে যারা এসব ছিনতাই করে থাকে। মাদকাসক্ত থাকায় মানসিকভাবে তাদের বিচার করার ক্ষমতা থাকে না বলেই সাত মাসের শিশু আরাফাতসহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে, পুলিশের নজরদারি ঠিকমতো হচ্ছে না, এসব রুখতে পুলিশকে আরো সক্রিয় হতে হবে।
মাদকাসক্তরাই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম কাজ করে থাকে জানিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রধান ডা. মোহিত কামাল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: নেশায় পুড়ে যায় তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ। তাই তাদের হত্যা ও ধর্ষণের মতো কাজে বুক কাঁপে না।

বাংলাদেশে মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে জানিয়ে তিনি বলেন: আমাদেরকে মাদক জিনিসটা নিয়ে জরুরীভাবেই ভাবতে হবে। যদি না ভাবি তবে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের ভয়াল ছোবলে শেষ হয়ে যাবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে খুন ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ওয়ারীতে। ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দুই বছর ১০ মাসে এ বিভাগের সাতটি থানা এলাকায় খুনের ঘটনা ঘটেছে ১১৯টি এবং শিশু নির্যাতনের সংখ্যা ১২৫টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ওয়ারী বিভাগটি ঘনবসতিপূর্ণ এবংএখানে ভাসমান লোকজনও বেশি। এ কারণে সেখানে সাধারণত অপরাধ বেশি হয়ে থাকে।

ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ারী বিভাগ ছাড়াও অন্যান্য এলাকাগুলোতে অপরাধ প্রতিরোধে ডিএমপি’র পক্ষ থেকে কতোটুকু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: ঘনবসতিপূর্ণ ও ভাসমান জনসাধারণের যেসব অঞ্চলে বসবাস সেসব অঞ্চলে ডিএমপি’র পেট্রোলিং ব্যবস্থা আরো বাড়াতে হবে।
‘এসব অঞ্চলে আমাদের যারা সিনিয়র পুলিশ অফিসার রয়েছেন, তাদের নজরদারিতা বাড়াতে হবে।’
এছাড়াও এসব এলাকাগুলোতে সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে অপরাধ অনেকাংশেই কমে যাবে বলে মনে করি।








