‘বসন্ত এসে গেছ’, খালেদা জিয়ার রায় শুনে এই লাইনটি মনে পড়ে গেল। তাছাড়া বিএনপির বদলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের রাস্তা দখল করে মিছিল মিটিং করে (যদিও মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল ডিএমপি সূত্রে) আনন্দ উল্লাস করা দেখে এই গানটি ঘুরে ফিরে আসছে। প্রধানমন্ত্রী, স্যালুট আপনাকে। আপনার আমলেই ইতিহাস রচনা হলো, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী (সাবেক) খালেদা জিয়ার দুর্নীতির বিচার হলো। বেশ কিছু দিন ধরে ভাবছিলাম কি হয়? কি হয়? আদৌ কি ম্যাডাম জিয়ার বিচারের রায় হবে, নাকি বার বার তাকে ফাঁদ দেখানো? যেন বিএনপি ট্যাঁ-ফোঁ করলেই খালেদা জিয়ার মামলা নড়চড় করে ভয় দেখানো। কিন্ত ৮’ই ফেব্রুয়ারি ইতিহাস রচিত হলো, খালেদা জিয়া বন্দিবাসী হলো আদালতের রায়ে, বর্তমানে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় কারাগারের একমাত্র বাসিন্দা তিনি। আপনি তো ন্যায় মাতা হয়ে গেলেন। ২ কোটি ১০ লাখেরও বেশি টাকা আত্মসাত করার বিচারের রায়ে প্রমাণ হয় আপনি ন্যায়ের প্রতীক।
আপনার আমলে কেউ অন্যায় করে পার পাবে না। বিচার হবেই। এইবার নিশ্চয়ই, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটকারীদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। দুই কোটি ১০ লাখ টাকা চুরির রায় যদি পাঁচ বছর হয়, তবে হাজার কোটি টাকা চুরির শাস্তি কত বছরের হবে? অংক করতেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। থাক, এই অংক আমি না করি, বরং অন্যায়ভাবে নিয়োগ পাওয়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে অংক করিয়ে নেয়া ভাল। যাক ভেবে শান্তি লাগছে, দেশে শান্তি আসছে।
রায়ের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আছে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সেটা এবারও প্রমাণিত হলো। রায়ে প্রমাণ হলো বাংলাদেশে বিএনপি আমলে অপরাধীদের যে স্বর্গ ছিল, তার অবসান হয়েছে। এখন এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, অপরাধ করলে বিচার হয় এবং সুষ্ঠু বিচার হওয়ার পর তার শাস্তি হয়।
আহা, আমাদের আইনমন্ত্রীও দেখি আমাদের মনের কথা বলেছেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সামরিক সরকারের আমলে আমরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। সাবজেলে যখন ছিলেন, আমি কাজের সূত্রে প্রায় যেতাম। খুব মন খারাপ হতো। পাহারারত অফিসাররা এসে বলত যে, আপনি নাকি কথা বলতেন পাখির সাথে, বইয়ের সাথে কিংবা পাহারারত নারী পুলিশের সাথে, কিম্বা একা একা। কখনো অভিমান করে বলতেন- আজ আমি কথা বলবো না কারো সাথে, মৌন থাকবো। মনে হতো পাখি হয়ে উড়ে যেয়ে বসি আপনার রুমের বারান্দার রেলিঙে। বসে কথা বলি দিনভর।
একদিন আপনাকে সাবজেল থেকে শুনানির জন্য আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা র্যাবের অফিসার (এখন পুলিশের একজন বড়কর্তা), আপনাকে কথা না বলতে দিয়ে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নিতে নিতে বলে, হাঁটেন হাঁটেন কথা বলার সময় নেই, আপনার আসা-যাওয়ার পথে দাঁড়ানো আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতেই সেই অফিসার এই কাজটি করে। উনাকে আমি পরে জিজ্ঞাসা করলাম, এইভাবে কেন ধাক্কা দিলেন? উনি বলল, আসামীর সাথে কিভাবে আচরণ করবো? আবার তাকে বললাম, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে আর পাতি আসামীর সাথে ব্যবহার কি এক হল? অফিসার হেসে বলেন, সাবেক নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না, ঘামাই বর্তমানে কে আছে তাকে নিয়ে। আর আসামী আসামীই। সেদিন খুব খারাপ লাগলেও মনে মনে ভেবেছিলাম হয়ত দেশে শান্তি কায়েম হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এতো লুটপাট, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর অবিচারের খবরে ভেবেছিলাম দেশের শান্তি কই? কদিন আগে ন্যাশনাল টিভিতে দেখলাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলছেন, দেশে কোন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। ঘটতে পারে না। কারণ দেশের প্রধানমন্ত্রী এখন দেশরত্ন শেখ হাসিনা।
সভাপতির কনফিডেন্ট দেখে ঘাবড়ে গেলাম, আর কদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে পারছেন না বললেন। তাহলে মন্ত্রী কি মিথ্যা বললেন? কিসের মধ্যে কি? খালেদার জিয়ার বিচার রায় নিয়ে কথা বলতে যেয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কথা বলছি।
অনেকেই বলছেন, খালেদা জিয়ার আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বন্ধু দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকলেও তার শাসনামলে খালেদা জিয়া দুর্নীতি করেছেন তার কোন প্রমাণ নেই। আবার কেউ কেউ বলছে, এতো টাকা পয়সার মালিক কেন মাত্র দুই কোটি ১০ লাখ টাকা দুর্নীতি করতে যাবে। কেউ একথাও বলছে আগামী নির্বাচন করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করার জন্য জেলে যেতে হলো, গত নির্বাচনে যেতে চায়নি ফলে মামলা নিয়ে তেমন একটা শোরগোলও হয়নি। এইবার গেলে গত নয় বছরে সংঘটিত হওয়া দুর্নীতির কারণে বিএনপি-জামায়াত জোটের পক্ষে মানুষ থাকবে, এই ভয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার এই রায়। কেউ কেউ আবার বলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা করা হয় ২০০৮ সালের ৩রা জুলাই, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, সে সময় আরো অনেক মামলা হয়েছিল যার কিছু ছিল আপনার বিরুদ্ধে। সেসব খারিজ হলে খালেদা জিয়ার গুলি হলো না কেন? যে ক্ষমতায় সে অপব্যবহার করেই বাংলাদেশে। বাদ দেন, দুষ্টু লোকে তো কত কথাই বলবে। কিন্তু আপনাকে তো লৌহমানবীর ন্যায় শক্ত অবিচল থাকতে হবে ন্যায়ের প্রতীক হয়ে, আপনার আশেপাশে হবে না কোন অন্যায়। ছাত্রলীগের সভাপতির সাইফুর রহমান সোহাগের মত কনফিডেন্ট নিয়ে বলতে হবে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কোন দুর্নীতি হতেই পারে না, কারণ দেশরত্ন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। সোহাগ বলেছে প্রশ্নপত্র নিয়ে আর আমরা বলবো বাকি সব দুর্নীতি নিয়ে।
আগামী কয়েকমাস কি তাহলে বাকি হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের মামলার ধরপাকড় শুরু হবে। আদালতের তো নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকবে না এতো দুর্নীতির মামলা পরিচালনা করতে করতে।
হু হু লুটেরা মিয়া-বিবিরা সাবধান, ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাত করে রেহাই পাইলো না তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রীত্ব অর্জনকারী খালেদা জিয়া আর হাজার কোটি টাকা লুটপাটকারীরা তো সে তুলনায় চুনোপুঁটি। সো সাবধান। খুব শিগগিরই ধরা হবে দেশের সব লুণ্ঠনকারীদের।
এক নজরে গত কয়েক বছরে কিছু আর্থিক লুটপাটের চিত্র দেখা যাক।

উপরের এই চিত্রের পরিবর্তন চাই। আগামী নির্বাচনের আগে এই ধরনের সব অপরাধের যথাযথ বিচার না হলে মানুষ আপনার উপর আস্থা হারাবে। মানুষ ভোট দেবার আগে দশবার ভাববে। আর যদি জনগণের ভোট না লাগে তাহলে তো কিছু বলার নাই। আমাদের ভবিষ্যত আপনার হাতে, আপনি যেমন রাখবেন তেমনি থাকবো। শুধু একবার কি মায়া করে ভাববেন, অনেক তো হলো। এই দফা সুশাসন প্রতিষ্ঠা হোক। আগামী পাঁচ বছর হোক ন্যায় নীতির বছর, সকল দুর্নীতিবাজদের নির্মূলের বছর। ঘটে যাওয়া ছোটবড় সব ধরনের অন্যায়ের প্রতিকারের বছর। জনগণের কাছে আসার, তাদের প্রতি প্রকৃত সহানুভূতিশীল হবার বছর। শুধু ভাষণের জন্য না বলে করে দেখানোর বছর। অতিষ্ঠ আমজনতার উন্নয়নের বছর, তবেই আপনি হবেন ন্যায়ের প্রতীক। এই রায়ের পর যদি কেউ ভাবে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবে না বা বিএনপি শেষ হয়ে গেছে। সো তাদের সরকারের চির বসন্ত এসে গেছে। তাহলে তো আর কোন আশা নেই আমাদের সুবিধাবাদী ন্যায়বিচারের হাত থেকে। নাকি আমরাও গাইবো ‘বসন্ত এসে গেছে, যখন ন্যায়ের প্রতীক শেখ হাসিনা।’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







