নব্বইয়ের শেষ দিক। গান মানেই তখন আমার কাছে জেমস, না না গুরু জেমস! তার গানে ঘোরগ্রস্ত তখন। বাজারে তার নতুন কোনো ক্যাসেট এলেই সবার আগে কিনে আনার প্রতিযোগিতা তখন। সেই সময়েই না বুঝে প্রেমে পড়ে গেছি ভরাট কণ্ঠের মানুষটির। এভাবে চলে বহুদিন। কিন্তু একদিন শুনি তিনি আসছেন আমার শহরে! সেকি উচ্ছ্বাস তখন!
২০০৪ সাল। ময়মনসিংহ স্টেডিয়ামে পেপসি কনসার্ট। নিজের শহরেই গুরু জেমসের সাথে আমার প্রথম দেখা। সেটিই ছিলো আমার জীবনে দেখা প্রথম কোনো কনসার্ট! আহা কী মুগ্ধতা! ময়মনসিংহ থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু গুরু আসছেন শুনে দূরত্বের কথা পাত্তা দিলাম না। কনসার্টের দিন আগেভাগেই স্টেডিয়ামে হাজির। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুটা মনক্ষুণ্ণ হলাম। কারণ যাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসি, সেতো শুধু একান্ত আমার; এরকম একটা ধারণা থেকে গিয়ে দেখি একই মানুষকে ভালবেসে আমার থেকেও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে। পুরো স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ!
কনসার্টের শুরুতে হাসান, আইয়ুব বাচ্চু গাইলেন। সব শেষে মঞ্চে উঠে এলেন আকাঙিক্ষত মানুষটি। গুরু জেমস! যার নাম ঘোষণার সাথে সাথেই পুরো স্টেডিয়াম প্রকম্পিত হলো গুরু গুরু ধ্বনিতে! সেকি উন্মাদনা সবার মধ্যে! একে তো জীবনে দেখা প্রথম কনসার্ট, তার উপর গুরুকেও প্রথম দেখা! ভীষণ উত্তেজিত ছিলাম সেই মুহূর্তে। দুই হাত উঁচু করে মঞ্চে এলেন তিনি। আনন্দ আর ধরে না তখন! মঞ্চে উঠে গিটারটা হাতে নিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে তিনি গাইতে শুরু করেছিলেন ‘যেদিন বন্ধু চলে যাবো’! গানটা শেষ করে শুধু তিনি বললেন,‘ধন্যবাদ’।
যার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এলেন, যাকে এক নজর দেখতে আমি কিংবা আমার মত শত শত মানুষ শত মাইল পাড়ি দিয়ে এসেছি; অথচ সেই মানুষটিকে এসে আবিষ্কার করলাম একেবারে নির্বিকার একজন! সারা স্টেডিয়াম জুড়ে উত্তাল জনতার মুখে গুরু গুরু রব, অথচ যাকে ঘিরে এতো উন্মাদনা তার কিছুই এসব স্পর্শ করছে না! নির্লিপ্তভাবে তিনি শুধু একটার পর একটা গান শুনিয়েই যাচ্ছেন। অথচ ভক্তদের মধ্যেও এ নিয়ে কোনো অপূর্ণতা নেই, কোন রাগ বা অভিমানও নেই! অভিযোগতো নেই ই! তারাও গুরুর সাথে গেয়ে যাচ্ছে ‘লেইস ফিতা লেইস’…!
প্রথম কনসার্টেই একটা অভাবনীয় ঘটনারও প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছিলাম এবং স্বচক্ষে দেখিছিলাম গুরু জেমসের শক্তিটাও! যেহেতু কনসার্টটি ছিলো একটি মফস্বল শহরে, তাই কিছুটা বিশৃঙ্ক্ষলা হবে এটা ছিলো অনুমেয়। সেটাই হলো, উপচে পড়া স্টেডিয়ামে আয়োজক ও পুলিশের সাথে হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। যা ধীরে ধীরে হাতাহাতির পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। পরিস্থিতি যখন বেসামাল, তখন মঞ্চ থেকেই ভরাট কণ্ঠে ভেসে এলো একটি কথা, ‘এই তোরা থাম’! অবিশ্বাস্য শোনালেও জেমসের শুধুমাত্র একটি কথা জনতার মধ্যে যাদুমন্ত্রের মতো কাজ করলো! উত্তেজিত জনতাকে যখন লাঠিসোঠার ভয় দেখিয়ে থামাতে ব্যর্থ ছিলো পুলিশ, তখন গুরুর মাত্র একটি কথায় পৃথিবীতে নিরবতা নেমে এল!
আর পরক্ষণই শোনা গেল, ‘হই হই কাণ্ড রই রই ব্যাপার’!সাথে সাথেই পরিবেশ আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলো। এই হচ্ছেন গুরু।
তাঁরমধ্যে সেদিন থেকে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করে আসছি। সেটা হলো, নিজে যা সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই শেষ কথা। গুরু যখন মঞ্চে গাইতে গাইতে মনে করেন যে এটাই তার শেষ গান, তখন ভক্তের ‘ওয়ান মোর’ চিল্লানোতেও আর কাজ হয় না। গুরু ভক্ত সবাই জানেন সেটা! সেই ২০০৪ এর পর যতোবার গুরুকে কোন কনসার্টে দেখেছি ততোবার হয়তো পাঞ্জাবি থেকে টি-শার্ট বা ডেনিম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তাঁর আচরণের তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। সেটা হোক খোলা মঞ্চে বা টিভির সরাসরি অনুষ্ঠানে!
এমন নির্লিপ্ত থাকার পরেও ভক্তদের উপর এমন নিয়ন্ত্রণ পৃথিবীর আর কোনো সুপারস্টারের আছে কিনা জানা নেই।
‘তারকা’ হয়ে টিকে থাকার সময়ে যখন তারকারা স্বউদ্যোগে ফ্যান-ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য নানা কারসাজি অবলম্বন করে ব্যতিব্যস্ত, তখনও নির্লিপ্ত থেকে জেমস হয়ে উঠছেন তারকা থেকে মহাতারকা! জন্মদিনে তাঁকে ভালোবাসা!








