তিন চারমাস আগে আমি ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ সেখানে বেঞ্চে বসে ছিলেন একজন বয়স্কা নারী। ওনার পরনে হিজাব ছিল। হঠাৎ উনি কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে বলে উঠলেন, ‘এইযে আপনি মাথায় কাপড়টা দ্যান। এইভাবে পর্দা ছাড়া চলাফেরা করেন বইলাইতো আপনাদের এত বিপদ হয়।’ আমি এত অবাক হয়ে গেলাম যে প্রথমে কোনো উত্তর খুঁজে পেলামনা। পরে ওনাকে বললাম, ‘আপনি মাথায় কাপড় দিয়েছেন, সেটা দিন। আমিতো আপনাকে কোনো কারণ দেখিয়ে সেটা নামাতে বলছিনা। আপনি কেনো আমাকে মাথায় কাপড় দিতে বলবেন? এটা আমার ইচ্ছা। আর আমার হেফাজতের দায়িত্বও আপনাকে আমি দেইনি। কাজেই নিজেরটা নিয়েই খাকুন।’
তনুর হত্যাকাণ্ডের পর কথাটা হঠাৎ মনে হলো বিশেষ করে এইভাবে পর্দা ছাড়া চলাফিরা করেন বইলাইতো আপনাদের এত বিপদ হয়– এই অংশটুকু। তাহলে তনুকে কেনো ধর্ষিত ও নিহত হতে হলো? ঐ ছোট্ট মেয়েটিতো পর্দার মধ্যেই ছিল যা কাজকর্ম করার তাতো সে এভাবেই করছিল। পর্দা প্রথা মেনেও কতগুলো নরপিশাচের লোভের বলি হতে হলো তনুকে। কারণ তনু একজন নারী। তাকে খুব সহজেই হয়রানি করা যায়, যায় তাকে ঘরে বন্দী করা, মারধর, বকাঝকা, অশ্লীলতা, ধর্ষণ সব, সবকিছু করা যায়। এমনকী হত্যা করাও খুব কঠিন কিছু নয়।
ঘটনা প্রসঙ্গে যে কথাটি আবার মনে পড়লো, প্রায় বছরখানেক আগে একটি বিয়ের আসরে গিয়ে আমারতো নিজেকে ভিনগ্রহের একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। ঐ অনুষ্ঠানে হাতেগোনা কিছু নারী বাদ দিয়ে প্রায় সবাই বোরখা বা হিজাব পরা ছিল। এমনকী ৩/৪ বছরের শিশু পর্যন্ত। সম্ভবত ঐ প্রথম আমি শিশুদেরকে হিজাব পরা দেখেছিলাম কিন্তু এখন অনেককেই দেখছি। তবে উল্লেখ যে আসরে সাজগোজেরও কোনো কমতি ছিলনা।
এ্ইসব দেখে থাকতে না পেরে আমি পরিচিত একজনকে অনেকটা গায়ে পড়ে জিজ্ঞাসাও করে বসলাম, কীরে তোর এই ছোট্ট মেয়েটাকে কেন হিজাব পরালি? তুইতো হিজাব ধরলি সেদিন। কেয়াতো এখন মাত্র ক্লাস থ্রিতে পড়ে। উত্তরে ও বললো, কেয়াতো হিজাব পরতেই চায়না। কিন্তু আমি জোর করে পরাচ্ছি। আমার ছোট মেয়েটাকেও পড়াচ্ছি। ওর বয়স ৬। আমি আবার জানতে চাইলাম কিন্তু কেনো এত ছোট্ট দুটি মেয়েকে তুই পর্দা করাচ্ছিস? পর্দা করার বয়সতো পড়েই আছে। ও বললো, নারে দিনকাল ভালোনা মেয়েরা যদি খোলামেলা হয়ে বেড়ায়, তাহলেতো ওদেরই বিপদ তাই আমি আর ওর বাবা, এখন থেকেই পর্দা করানো শুরু করেছি। বুঝলাম নারীকে ‘সংরক্ষণ’ করার সেই একই ধারণা, সেই একই পদ্ধতি। সময়, যুগ পাল্টেছে কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টায়নি, বরং আরো সনাতন হয়েছে ।
যাক প্রসঙ্গে ফিরে আসি, তনু কারো উপর নির্ভর না করে নিজের পড়ার খরচ নিজেই যোগাড় করার চেষ্টা করেছে, মেয়েটি বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে আর সবার মতই অংশ নিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে কিন্তু এই সমাজ তাকে পারলোনা নিরাপত্তা দিতে, পারলোনা বাঁচতে দিতে। হয়তোবা তার ধর্ষণকারী ও হত্যাকারীদেরও কোনো শাস্তি দিতে পারবেনা।
যখনি কোনো নারীকে লাঞ্চিত হতে হয়, তখনই বলা হয় মেয়েটি বেশরম, বেপরোয়া, বা তার চলাফেরা ভালোনা, অসময়ে ঘরের বাইরে যায়, সাজগোজ করে, পুরুষের সামনে বের হয় ইত্যাদি নানা ধরণের নানা অপ্রাসঙ্গিক কারণ বা অছিলা। তাহলে তনুর ক্ষেত্রে এই অভিযোগ কাজ করলোনা কেনো? নারী অপমানিত, নির্যাতিত, হয়রানি, সহিংসতার শিকার যাই হোক না কেন, সমাজ সারাটা সময় নারীকেই দায়ী করে যায়। অথচ একবারও এই সমাজ পুরুষকে দায়ী করেনা বা তাকে তার চোখের ও পুরুষাঙ্গের পর্দা মেনে চলতে বা নারীকে সম্মান করতে শেখায়না।
কোনো মেয়ে সুন্দরী না অসুন্দরী, ধনী না দরিদ্র, পর্দা মানে কী মানেনা, বাইরে কাজ করে কি করেনা, ভালো না মন্দ এটা কোনো বিচার্য বিষয় নয়। শুধু সে একজন মেয়ে, তার শারীরিক শক্তি কম, তাকে দেখা হয় অধীনস্ত হিসাবে এবং সর্বাপরি তাকে দিয়ে যৌন বাসনা মেটানো যায়– এটাই বড় কথা। তাই বোধহয় এদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মেয়েকে তার পরিবারেই সহিংসতার শিকার হতে হয়। যেদেশে পরিবারই একজন নারীর কছে নিরাপদ নয়, সেদেশে আর কোথায় একটি মেয়ে বেঁচে থাকার আশ্বাস পাবে?
আমি জানিনা, সত্যিই জানিনা মেয়েরা কবে এই সহিংসতার হাত থেখে মুক্তি পাবে, কীভাবে পাবে, কবে তারা যথাযথ সম্মান পাবে, কবে একজন নারীকে অসম্মানিত হতে দেখলে সমাজ তাকে দায়ী না করে বরং প্রতিবাদ করবে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা কবে অপরাধীকে তার বা তাদের কৃতকর্মের জন্য কোনো ছাড় না দিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







