আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ এবং খ্যাতিমান ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গতবছরের আজকের এই দিনে তিনি প্রয়াত হন। তিনি প্রয়াত হলেও রেখে গেছেন এক লড়াকু ইতিহাস।
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক খাতের মহা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। সভা-সেমিনার আর গণমাধ্যমে তিনি সবসময় সত্য উচ্চারণ করতেন। ব্যাংক, শেয়ারবাজার নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন এবং কথা বলতেন। এসব বিষয়ে সরকার এবং রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে তিনি কখনই পিছপা হননি। ব্যক্তিগত অভিলাষ বলে তার কিছু ছিল না। আর তাই তিনি কখনই তোষামোদ করে কথা বলতেন না। উচ্চ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এই মানুষটির একেবারেই অজানা ছিল অযথা কাউকে প্রশংসা বা খুশি করা, অপ্রয়োজনে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা। এসব তিনি একেবারেই জানতেন না, বিশ্বাসও করতেন না। দীর্ঘ ব্যাংকিং ক্যারিয়ার সমাপ্তির পরও এই জগত ঘিরেই ছিল তাঁর জীবন। অবসর নেওয়ার পরও ব্যাংক-বীমা, শেয়ারবাজারসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে তিনি ভীষণ সজাগ এক মানুষ। আর এ কারণেই এসব খাতের অনিয়ম-অন্যায়, অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতেন দায়িত্ব নিয়ে।
রাজনৈতিক এবং নানা ছদ্মাবরণে যখন আর্থিক খাতে বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে একের পর এক দুর্নীতির ঘটনা ঘটতে থাকে তখন সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি সদা সোচ্চার থেকেছেন। দল নিরপেক্ষভাবে দেশ ও দশের মানুষের পক্ষে মনের কথাটি বলেছেন। আর্থিক খাত কেন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, কারা ব্যাংকগুলো থেকে নানা কৌশলে টাকা পাচার করছে এসব বিষয় তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। শুধু আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াই নয়, একই সাথে তিনি অভিযুক্তদের গ্রেফতারের জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করেছেন বারবার। শেয়ার বাজার যতবার লুণ্ঠিত হয়েছে ততবারই তিনি সাহসের সাথে গরিবের পক্ষে কথা বলেছেন। এসব ঘটনার নেপথ্যে কোন অপশক্তি এবং কারা জড়িত রয়েছে সেই মুখোশ তিনি উন্মোচন করেছেন। অনেকসময় ব্যক্তির নাম ধরেও বলেছেন। নির্ভয়ে বলেছেন কোন সিন্ডিকেট শেয়ার বাজার থেকে জনগণের টাকা লুট বারবার লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের সমালোচনা করতে তিনি কখনই দ্বিধান্বিত হতেন না, ভয়ও পেতেন না। বলতেন যেটা সত্য তিনি সেটিই বলেছেন, এর বাইরে আর কিছু নয়। এতে কে খুশি হলো আর কে অখুশি হলো সেটা তার জানা বা বোঝার বিষয় নয়। ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল আর্থিক খাতের অনিয়ম নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় তার একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সাক্ষাৎকারে তিনি নির্ভয়ে, নিঃসঙ্কোচে বললেন, ‘সরকার এখন ঋণখেলাপী বান্ধব।’ একবার আর্থিক খাতের দুর্নীতি প্রসঙ্গে বললেন, ‘আর্থিকখাতের রাঘববোয়ালদের বিচার করা হোক।’ ২০১০ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি উৎঘাটনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাকে। তিনি সত্য রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। কিন্তু সেই রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। ইব্রাহিম খালেদ সে সময় বলতেন ‘আমি যা জেনেছি তাই লিখেছি। যতই চাপ দেওয়া হোক আমি সত্য থেকে সরব না।’ এই রিপোর্টের পর তিনি ফোনে হুমকিও পেয়েছিলেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াননি।
বর্তমান অর্থমন্ত্রীর অনেক পদক্ষেপ তিনি নির্মোহভাবে আলোচনা করতেন। মন্ত্রীর অনেক সিদ্ধান্তকে তিনি তথ্য উপাত্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সিদ্ধান্তগুলো সার্বিকভাবে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। যা করা হচ্ছে তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ঋণ খেলাপীদের পক্ষে বারবার দেওয়া বিভিন্ন সুবিধাদির তিনি প্রতিবাদ করে গেছেন। ব্যাংকে পরিবার তন্ত্রের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। ঢালাওভাবে বেসরকারি অনুমোদন দেওয়ায় আগ্রাসী ব্যাংকিং-এর জন্ম হয়েছে বলেও তিনি একাধিকবার গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ও পুন:নিয়াগ অস্বচ্ছতা বিদ্যমান- তার মতো করে কেউ বলেননি। তিনি প্রায়শই বলতেন ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পেশাদারীত্ব বৃদ্ধি ও একই সাথে তা সংহত করতে হবে।
এই সৎ-সাহসী মানুষটির সাথে আমার রয়েছে অনেক ব্যক্তিগত স্মৃতি। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ মৃত্যু অব্দি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে চরের মানুষের উন্নয়নে কর্মরত নাগরিক জোট ‘ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স’-এর সভাপতি ছিলেন। ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. আতিউর রহমান। ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেলে শ্রদ্ধেয় খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সভাপতির দায়িত্ব নেন। ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স(এনসিএ)-এর সদস্য সচিব হওয়ার কারণে ইব্রাহিম খালেদ স্যারের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এনসিএ-এর বেশিরভাগ সভা, সেমিনারে ‘খালেদ স্যার’ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এই জোটের ব্যানারে চরের মানুষের উন্নয়নে নীতি-নির্ধারণ পর্যায়ে যত অনুষ্ঠান হতো স্যার প্রতিটি অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ করতেন। শুধু অংশগ্রহণই নয়, তিনি সঠিক সময়ে এসে উপস্থিত হতেন। কখনও উপস্থিত হতে দেরি হলে আগেই ফোনে জানাতেন। অজুহাত বলে কোনো শব্দ তার অভিধানে ছিল না। আর যেটা তিনি পারতেন না, সেটা তিনি আগেই নাকচ করে দিতেন। তিনি কখনই মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে কথা বলতেন না।
ইব্রাহিম খালেদ স্যারের সাথে অনেক মন্ত্রী, সচিবের দফতরে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখেছি তাকে কতোটা সম্মান করা হয়। খালেদ স্যার যেখানেই গিয়েছেন প্রচুর সম্মান পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের উপসর্বাধিনায়ক এ কে খোন্দকার পরিকল্পনা মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একবার ইব্রাহিম খালেদ স্যারসহ দেখা করতে যাই। গিয়ে দেখি খালেদ স্যারের জন্য মন্ত্রী মহোদয় দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। মন্ত্রী মহোদয়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খালেদ স্যার নিজেই যেন একটু বিব্রত হলেন। মন্ত্রী বললেন, ‘খালেদ ভাই আপনি এসেছেন, আমি কৃতার্থ।’ এরকম আরো অনেক ঘটনা দেখেছি। ‘খালেদ স্যার’ পোশাকে আর চলাফেরায় ছিলেন ভীষণ সাদামাটা। কমদামের শার্ট-প্যান্ট পরতেন। পায়ের স্যান্ডেলটাও দেখেছি একই রকমের। কিন্তু স্যারের যে কোনা কথা বা কোনো বিষয়ে মন্তব্য সবসময়ই গুরুত্ব বহন করেছে। স্যারের সাথে অনেকবারই নিবিড় ভাবে আলাপ-আলোচনার সুযোগ হতো। আর্থিক খাতের অনিয়ম, লুটপাট নিয়ে সবসময় ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। এ বিষয়ে একদিন কথা বলতে বলতে মুচকি হেসে বললেন, ‘সত্য বলতে অসুবিধা নেই। আমি সত্য কথা বলে যাবো। এ কারণে মন্ত্রী, এমপি বা রাজনীতিক কেউ বিরাগভাজন হলে আমার কিছু করার নেই।’
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ চলে গেছেন সত্য কিন্তু রেখে গেছেন সৎ ও সাহসের গল্পগুলো। রেখে গেছেন মানুষ কতোটা নির্লোভ হতে পারে তার জলজলে উদাহরণ। রেখে গেছেন সাহসী শব্দের সব উচ্চারণ। কোনো ব্যক্তি নয়, দেশের কল্যাণেই তিনি বলেছেন সত্য কথা। সেই কথাগুলো এখনও ভেসে বেড়ায় সর্বত্র। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সত্যিকার একজন শক্ত ভক্ত ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল ব্যবস্থা সমর্থন করতেন এবং বক্তব্যও দিতেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভুল তিনি কখনই সমর্থন করতেন না। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ চলে যাওয়ার আর্থিক খাতের অনিয়ম নিয়ে এখন সেই অর্থে কথা বলার কোনো মানুষ নেই। স্পষ্টভাষী, সত্যবাদী এই মানুষটিকে এখনও তাই খুঁজে ফেরেন সবাই। আর্থিক খাতের অনিয়ম নিয়ে তাঁর সত্য উচ্চারণগুলো প্রতিদিনই প্রাসঙ্গিক। তাঁর প্রথম মৃত্যৃবার্ষিকীতে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








