বাদল ফরাজি, নামটা এরই মধ্যে আলোচিত। একটি খুনের ‘মিথ্যা’ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়ে ১০ বছর জেল খেটেছেন ভারতের তিহার কারাগারে। অবশেষে দু’দেশের বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় গত ৬ জুলাই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে মুক্তি মেলেনি। পাঠানো হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
তার মুক্তির নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট দায়ের করা হলেও ১১ জুলাই সেটি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার কাউছার রিটটি দায়ের করেছিলেন।
দীর্ঘ সময় পরে হলেও বাদল যে দেশে আসতে পারলেন এবং কারাগারে পরিবারের সাথে দেখা করতে পারলেন, তার পুরো কৃতিত্ব রাহুল কাপুর নামে এক ভারতীয় সমাজকর্মীর, যিনি মূলত কারাগারে বাদলের সন্ধান পান। কারাগারে বাদলের ভালো আচরণ এবং সেখানে বসেই তার পড়ালেখার সূত্র ধরে রাহুল জানতে পারেন বাদল আসলে একটি নামের ইনোসেন্ট ভিকটিম। এরপর তিনি বাদলের মুক্তির জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার শুরু করেন। তিনি এমনকি ভারত সরকারেরও সর্বোচ্চ মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যার ধারাবাহিকতায় বাদলকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও তিনি কবে মুক্তি পাবেন, তা নিশ্চিত নয়। এ প্রসঙ্গে কয়েকটা প্রশ্ন উঠছে, যেমন:
১. বলা হচ্ছে, বাদলকে একটি মিথ্যা খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তাহলে এখন আইনত তার মুক্তির উপায় কী? কেননা বাদল যে নির্দোষ বা তিনি যে মিথ্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, সেটি বাদলের তরফে কিংবা মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে বলা হলেও যতক্ষণ না আদালত তাকে নির্দোষ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত বাদল অপরাধী এবং সাজার বাকি মেয়াদ তাকে জেলেই থাকতে হবে।
২. যদি বাদল সত্যিই মিথ্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তার জীবন থেকে এই যে ১০টি বছর চলে গেলো, তার যে বিপুল ক্ষতি হলো, সেই ক্ষতিপূরণ কি ভারত সরকার দেবে?
৩. গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাদল আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদি তাই হয়, তাহলে ওই মামলায় সম্পৃক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আইনজীবীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কি না?
৪. পুরো ঘটনাটি আদালত সম্পর্কিত এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিরাট প্রশ্নও এখানে জড়িত। ফলে এখন কোনো মানবাধিকার সংগঠন যদি বাদলের পক্ষে দাঁড়ায় এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে সোচ্চার হয়, তাহলে দুদেশের সম্পর্কে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না? বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাস কয়েক আগে এসে বিচার ও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বন্ধুপ্রতিম দু’দেশ বিষয়টিকে কিভাবে মোকাবিলা করবে?
এই প্রশ্নগুলো মুলতবি রেখে আমরা একটু বাদলের গল্পটা জানতে চাই।
বাগেরহাটের মংলা বন্দর সংলগ্ন ফারুকি রোডের বাসিন্দা আবদুল খালেক ফরাজি ও শেফালি বেগমের ছেলে বাদল ফরাজি। ২০০৮ সালে তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ওই বছরের জুলাই মাসে ভারতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বেনাপোল সীমান্ত পার হন। এ সময় তাকে আটক করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। কেননা ওই সময়ে দিল্লির অমর কলোনির এক বৃদ্ধা খুনের মামলায় বাদল সিং নামে এক আসামিকে খুঁজছিলো সে দেশের পুলিশ। ‘নামে নামে জমে টানে’—এই প্রবাদের শিকার হন বাদল। কিন্তু ইংরেজি বা হিন্দি জানা না থাকায় তিনি বিএসএফ সদস্যদের নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি।
সাত বছর কারাগারে থাকেন বাদল। ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট তাকে খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন দিল্লির একটি আদালত৷ এরপর নিম্ন আদালতের ওই রায় বহাল রাখে দিল্লি হাইকোর্টও৷ এরপর বাদলের ঠাঁই হয় দিল্লির তিহার জেলে৷ বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তায় হাইকোর্টের ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন বাদল৷ কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও বাদল ফরাজির আবেদন খারিজ করে দেন৷ এভাবে জেলখানায় কেটে যায় ১০ বছর। এরপর কারাগার পরিদর্শনকালে সমাজকর্মী রাহুল কাপুর সন্ধান পান বাদলের।
দেশে ফিরিয়ে আনার পরে বাদলের মুক্তির নির্দেশনা চেয়ে দায়ের করা রিট খারিজের সময় হাইকোর্ট বলেছেন, বাদলের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক। সরকার পদক্ষেপ নিয়ে বাদল ফরাজীকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। এখন তার মুক্তির ব্যাপারে সরকারই হয়তো কোনো পদক্ষেপ নেবে।
আমরা দেখছি, ভারতের একজন মানবাধিকার কর্মীর অব্যাহত প্রচেষ্টায় বাদল ফরাজির ইস্যুটি আলোতে আসে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সহজ হয়। এখন বাংলাদেশের কোনো মানবাধিকার সংগঠন যদি তার দায়িত্ব নেয় এবং তার পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করে, সেখানে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে তাদের সার্বিক সহায়তা দেয়া। বাদল ক্ষতিপূরণ পাবেন কি না বা সেটি আদায় করা কতটা সহজ হবে, তার আগে বেশি জরুরি তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ তার কারামুক্তি। বিশেষ করে তিনি যে খুনি নন, সেটি প্রমাণ করাই এখন প্রধান কাজ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








