‘খুনী’ শব্দটা কি বন্ধনীর ভেতরে রাখা উচিত? মনে হয় না। শব্দটিকে এখন আর বন্ধনীতে আবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। কারণ যাদের নিয়ে এই প্রতিক্রিয়াটি লিখছি, তারা আসলেই খুনী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকরাও খুনী।
আমাদের দুর্ভাগ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বের রোলমডেল হিসেবে পরিচিত হলেও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত (বস্তুত হত্যা) হওয়া যেন থামাতেই পারছে না।
ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো সড়ক দুর্ঘটনার কোনো সতর্ক সংকেত থাকে না। এটা অনেকটা ভূমিকম্পের মতো। ভূমিকম্প যেমন আৎকা পুরো একটি জনপদ ধসিয়ে দেয়, সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তে একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়। যে সন্তানকে হাজারও বাধাবিপত্তি, অভাব-অনটন আর নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে বাবা মা বড় করছিলেন একদিন সেই সন্তান সংসারের হাল ধরবে, বাবা মা একটু সুখের মুখ দেখবেন—সেই সন্তান এক মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে বাবা মায়ের কী অনুভূতি হয়, তা খান সাহেবদের বোঝার কথা নয়। বোঝেন মিমের বাবা মা, বোঝেন আব্দুল করিমের বাবা মা।
একটা সময় পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়কে বাংলাদেশের জন্য বিশাল বিপদ মনে করা হতো। ১৯৭০, ১৯৯১ এমনকি ২০০৭ সালের সিডরও যে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে, তা লাখ লাখ মানুষের প্রাণহাণির পাশাপাশি বিপর্যস্ত করেছে দেশের অর্থনীতিও। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় এখন আর সেই অর্থে কোনো বড় বিপদ নয়। কারণ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বাংলাদেশের মানুষের যে সক্ষমতা ও সচেতনতা বেড়েছে—তাতে এখন যত বড় ঘূর্ণিঝড়ই হোক, তাতে প্রাণহানি হয় খুবই কম। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এই দেশের মানুষ যত সক্ষমতাই অর্জন করুক না কেন, বিশ্বে যতই রোলমডেল হোক না কেন, সড়কে প্রাণহানি ঠেকানো যাচ্ছে না। কারণ এই দুর্যোগ মানবসৃষ্ট। আরও পরিস্কার করে বললে, এই দুর্যোগ কিছু অশিক্ষিত, মূর্খ, অমানবিক, অদক্ষ এবং লোভী মানুষের খামখেয়ালির পরিণতি—যাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই। সুতরাং ভোটের রাজনীতির স্বার্থে যে অপরাধীদের রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়, সেই অপরাধ বন্ধ হবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
একজন খান সাহেবের বক্তব্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। যিনি দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে নির্লজ্জের মতো বলেছেন, ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় একদিনে ৩৩ জন নিহত হয়েছে, অথচ সে দেশেও এই ইস্যু নিয়ে এত মাতামাতি হয় না, যা বাংলাদেশে দুজন মরলেই হয়।
ফেসবুকে যেসব প্রতিক্রিয়া এসেছে, মানুষ যেভাবে এবং যে ভাষায় গালাগাল করেছে, তার সিকিভাগও যদি খান সাহেবের নজরে এসে থাকে, তাহলে তিনি মানুষ হিসেবে যত নিম্নস্তরেরই হোন না কেন, তার লজ্জিত হবার কথা। ফেসবুকে ক্ষুব্ধ মানুষ এমনও লিখেছে যে, খান সাহেবের কোনো নিকটাত্মীয় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে হয়তো তার বোধোদয় হবে।
আসলে সমস্যাটা খান সাহেবের একার নয়। তিনি রাজনীতিবিদ। ভোটের মাঠে জিততে তাকে অনেক লোকের সঙ্গে খায়-খাতির রাখতে হয়। প্রতিপক্ষ দমনে তাকে অনেক লাঠিয়াল পুষতে হয়। ভোটের রাজনীতি অনেক পয়সারও খেলায়। সুতরাং সেই পয়সা আর সেই লাঠিয়ালদের বড় অংশের জোগানই আসে পরিবহন খাত থেকে—যে ব্যবসার সঙ্গে তিনি নিজেও জড়িত। নৌ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও দেশের সড়ক পরিবহন খাতে একটা গাছের পাতাও যে তার ইশারা ছাড়া নড়ে না, তা সবার জানা। আবার এই খান সাহেব এতই শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী যে, হাজার হাজার পরিবহন শ্রমিকের পেশী ও ভোট এবং কোটি কোটি টাকা চাঁদার সংস্থানও হয় যে খাত থেকে, তাদের তোয়াজ করবে না এমন বুকের পাটা কার?
ফলে সড়কে অদক্ষ-অশিক্ষিত-মূর্খ-লাইসেন্স নেই বা পাওয়ার অযোগ্য চালকরা উন্মাতাল গতিতে গাড়ি চালিয়ে পথচারী কিংবা পুটপাতে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের গায়ে উঠিয়ে দেবে দানবীয় চাকা—তাতে ওই চালকের কী আর হবে? তাদের শাস্তি বাড়ানোর দাবি উঠলেও তার বিরোধিতা হবে। বলা হবে, শাস্তির পরিমাণ বাড়ালেই সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না। তাহলে কী করলে সড়কে এমন জীবনের অপচয় রোধ করা যাবে?
তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরেরা বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী চালকের বিচার হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দিতে উচ্চআদালতের নির্দেশনা এসেছে। রাজধানীর একটি কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্ট রুল দিয়েছেন। ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে রাজধানীতে দুই বাসের চাপায় প্রাণ হারানো রাজীবের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণের আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু প্রতিদিন সারা দেশে এরকম তো আরও অনেকের রক্ত ঝরে। আদালত কতজনের ব্যাপারে রুল দেবেন? কতজনকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলবেন? এটা কি কোনো টেকসই সমাধান?
আমরা কার হাতে স্টিয়ারিং তুলে দিচ্ছি? অর্ধশত মানুষ নিয়ে যে ড্রাইভার মহাসড়কে ছুটে চলেন, সকালে-সন্ধ্যায় কিংবা গভীর রাতে—সেই মানুষটির পড়ালেখা যাই থাক, তিনি যে কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেই কাজটি সঠিকভাবে শিখেছেন কি না, তাকে যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সেটি সঠিক নিয়ম মেনে দেয়া হয়েছে কি না অথবা তার লাইসেন্স আদৌ আছে কি না—সেই প্রশ্ন তোলাই তো এক বিস্ময়!
একজন সাংবাদিক কম শিক্ষিত হলে তাতে ক্ষতিটা তার নিজের এবং বড়জোর তার প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু তার এই অযোগ্যতার ফলে অকালে কোনো মানুষের প্রাণ ঝরবে না। একজন ব্যাংকার, একজন অন্য পেশার শ্রমিক বা কর্মজীবীর লাইসেন্স বা শিক্ষা- দিক্ষা কিংবা মানবিক বোধ কিছুটা কম থাকলেও তাতে একসঙ্গে ২০-৩০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটাবে না। কিন্তু একজন ড্রাইভার যদি কম দক্ষ হন, তার মধ্যে যদি মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি থাক, তিনি যদি অন্যের আগে পৌঁছানোর জন্য মহাসড়কে পাল্লা দেন, তিনি যদি বাড়তি ট্রিপের লোভে ট্রাফিক আইন ভেঙে বেপরোয়া গতিতে ছুটতে থাকেন, তখন বিপন্ন হয় তার পেছনে বসা সব মানুষ। সেই বাসে থাকতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, চিকিৎসক এমনকি ওই ড্রাইভারের কোনো স্বজন।
আমরা বলছি সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা নয়, বরং হত্যাযজ্ঞ চলছে এবং হত্যাযজ্ঞের জন্য যারা দায়ী তারা খুনী। কিন্তু খুব ব্যতিক্রম ছাড়া এই খুনের বিচার হয় না। আবার গণপরিবহনে যৌন-হয়রানির অভিযোগও ওঠে মাঝেমধ্যে। সেখানেও খুব আলোচিত ঘটনা ছাড়া বাস চালক বা হেলপারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার নজির কম। খোদ মালিকরাও এটা স্বীকার করেন যে, পরিবহন শ্রমিকদের একটা বড় অংশই মাদকাসক্ত। ফলে পরিবহনে তারা যাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করে থাকে।
পরিবহন শ্রমিকদের বিচারের আওতায় আনা যেসব কারণে কঠিন তার মধ্যে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে পৃষ্ঠপোষকতার বাইরেও আইনের সঠিক প্রয়োগ, বিচারের ধীর গতি এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজারে তাদের চাহিদা। দেশে যে পরিমাণ গণপরিবহন, সেই পরিমাণ দক্ষ চালক তৈরি হয় না। ফলে মালিকরা তাদের ব্যবসার স্বার্থে সব সময়ই পরিবহন শ্রমিকদের তোয়াজ করে চলেন। মালিকরা একটু কঠোর হলেই তারা চাকরি ছেড়ে দেন। ফলে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কায় মালিকরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের অন্যায় মেনে নেন। আবার অনেক সময় মালিকের অতিলোভ, শ্রমিকদের ঠকানো ইত্যাদি কারণেও চালক ও হেলপাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ সমস্যাটা দ্বিমুখী। ফলে এইসব সমীকরণ যতদিন থাকবে, ততদিন গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধের জন্য রাস্তায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মাঝেমধ্যে গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, টেলিভিশনে টকশোতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা কিংবা পত্রিকার পাতায় বড় বড় নিবন্ধ ছাপা হবে ঠিকই—সড়ক-মহাসড়কে জীবনের অপচয় রোধ করা কঠিন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








