মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আগের আসামীদের মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মাথায় তাদের পক্ষে হওয়া রিভিউ আবেদন বাতিল হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই কার্যকর হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
বুধবার সকালে পূর্ণাঙ্গ রায়ের মৃত্যু পরোয়ানা মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীকে পড়ে শোনানোর পর তিনি রিভিউ আবেদন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
নিজামীর জন্য রিভিউ আবেদনের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা মঙ্গলবার থেকেই শুরু হয়েছে। সুতরাং এর মধ্যে রিভিউ আবেদন করার পর আবেদন বাতিল হলে তার কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে সময় লেগেছে দুই মাস ২৫ দিন দিন, কামারুজ্জামানের জন্য ছয় মাস ৮ দিন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর তিন মাস ২৩ দিন এবং আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের লেগেছে পাঁচ মাস ছয় দিন।
মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি রায় দেন আপিল বিভাগ। এর আড়াই মাসের মাথায় ১৫ মার্চ (মঙ্গলবার) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়। সেদিন রাতেই ওই রায়ের কপি কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রাইব্যুানালের তিন বিচারকের সইসহ পাঠানো হয়।
আপিল বিভাগের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। এই মৃত্যুদণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শুধুমাত্র রিভিউ করার সুযোগ পাবেন। তিনি যদি রিভিউ আবেদন করেন তাহলে ওই রিভিউয়ের রায়ের পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।
আসামী পক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সে সময় রিভিউ আবেদন না করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ‘এটা নির্ভর করছে আমাদের ক্লায়েন্টের ওপর,’ বলেও অবশ্য মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
রায়ের পর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, আসামীপক্ষ রিভিউ আবেদন করলে এক ধরণের প্রক্রিয়া, আর না করলে লিখিত রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রায় কার্যকর করার কথা।
নিয়ম অনুযায়ী, আপিল বিভাগ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবেন ট্রাইব্যুনাল। সেই মৃত্যু পরোয়ানা ফাঁসির আসামীকে পড়ে শোনাবে কারা কর্তৃপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবে আসামীপক্ষ।
রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং তাতে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে আসামীকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পর সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন তিনি। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।
কামারুজ্জামান
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুখ্যাত গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সংগঠক মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখেন ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর। পরে রায় পুনর্বিবেচনার(রিভিউ) আবেদন হলে ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল তা খারিজ করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর ১১ এপ্রিল শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আপিল বিভাগের রায়ের পর ৬ মাস ৮ দিন পর কার্যকর হয় তার ফাঁসির রায়।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখেন ২৯ জুলাই, ২০১৫। এরপর রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য আবেদন হলে ১৮ নভেম্বর তা খারিজ হয়। পরে ২২ নভেম্বর রাতে তার ফাঁসি কার্যকর হয়। আপিল বিভাগের রায়ের পর তিন মাস ২৩ দিন পর ফাঁসি কার্যকর হয় তার।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখেন ১৬ জুন, ২০১৫। তিনি রিভিউ আবেদন করলে ১৮ নভেম্বর তা খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। পরে ২২ নভেম্বর রাতে তার ফাঁসি কার্যকর হয়। আপিল বিভাগের রায়ের পাঁচ মাস ছয় দিন পর তার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
কাদের মোল্লা
মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের কর্মের জন্য ‘কসাই কাদের’ নামে পরিচিতি পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। আপিল বিভাগের রায়ের দুই মাস ২৫ দিন পর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে সেসময় আইনে রিভিউয়ের সুযোগ না থাকলেও তিনি রিভিউ আবেদন করেছিলেন। ওই রিভিউ আবেদন বাতিল হওয়ার পরই কার্যকর হয় তার ফাঁসি।







