টাঙ্গাইলের গোপালপুরের ডুবাইল বাজারে নিজ বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তের চাপাতির এলোপাথাড়ি কোপে খুন হন নিখিল চন্দ্র জোয়াদ্দার (৫০) নামের এক দর্জি। এ ঘটনায় ৩জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হলেও এখনো হত্যার রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কথিত আইএস নিখিল হত্যার দায় স্বীকার করলেও আইএস’র অস্তিত্ব মানতে নারাজ প্রশাসন। আর এ ঘটনা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। হত্যার রহস্য উদঘাটনে পিছনের নানা দিক খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে নিখিলের পরিবারের দাবি এই হত্যার পিছনে রয়েছে উগ্র কোন সংগঠনের হাত। দু’দিনের সরেজমিনে সাধারণ মানুষের কথায় বেড়িয়ে এসেছে নানা কথা।
কে এই নিখিল: টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ডুবাইল বাজার এলাকার নলিনী কান্ত জোয়াদ্দারের চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে নিখিল। পেশায় দর্জি। ডুবাইল বাজারের সুতি-কালী বাড়ি রোডের সর্বশেষ দোকানটিই তার। এক স্ত্রী ও দু’মেয়ে কবিতা ও বন্যাকে নিয়ে ছিলো তার সংসার। দর্জি পেশার আয় থেকেই মেয়ে দু’টিকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় মেয়ে কবিতাকে বিয়ে দিয়েছেন শেরপুরে এক কাপড় ব্যাবসায়ী ছেলের সাথে। ছোট মেয়ে বন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন টাঙ্গাইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ছেলের সাথে। নিখিলের অন্য ভাই পেশায় গাড়ি চালক টুংক্কু ৭-৮ বছর আগে আত্মহত্যা ও সিনেমা হলের কর্মচারী ভোলা ২বছর আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। বর্তমানে জীবিত রয়েছেন পেশায় রাজমিস্ত্রি ভোলা নামের এক ভাই। বর্তমানে জীবিত গোপালের একটি মেয়ে। তার বিয়ে হয়েছে মির্জাপুরের এক মনোহারী দোকানীর সাথে। ৪ ভাইয়ের সম্পত্তি বলতে রয়েছে বাড়িতে ৩৩ শতাংশ ও আবাদি জমি ৫৪ শতাংশ। নিখিলের কোন ছেলে না থাকায় তার অংশের সম্পত্তি ২০১২ সালের ওই ঘটনার পর অজানা ভয়ে লিখে দেন দুই মেয়ের নামে।
কেমন লোক নিখিল: ডুবাইল গ্রামের ওহাব নামের এক বৃদ্ধ বলেন, তার অন্য দুই ভাইয়েরা নেশা করলেও নিখিল কোন দিন এসবের ধারে কাছে যায়নি। ও কোন দিন মানুষের সাথে জোর গলায় কথায় বলেনি। আশেপাশের কোন মানুষের বিপদ হলে সবার আগে সেই যেত।
২০১২ সালের ওই ঘটনাটি ছাড়া আর কোন বিষয়ে নিখিলের সম্পর্কে খারাপ বলবে এমন লোক পাওয়া যাবে না। তার মেয়ে বন্যার কথাতেও বেড়িয়ে আসে নিখিল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা। তিনি বলেন, আমার বাবা অনেক হিসেবি লোক ছিলেন। তিনি কারো কাছ থেকে দশ টাকা কর্জ যেমন নেননি কাউকে দশ টাকা কর্জও দেয়নি। তার কাছে কেউ টাকা পয়সা পাবে এমন লোক পাওয়া যাবেনা।
গুজব থেকে গুজব: একটি গুজবের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে স্থানীয় জনতা চড়াও হয় নিখিলের উপর। স্থানীয় জামাত ও হেফাজত ইসলামের ব্যানারে রাস্তা অবরোধসহ নানা কর্মসূচী গ্রহণ করে ভাংচুর করা হয় নিখিলের দোকান ও বাড়ি। এরই এক পর্যায়ে আলম নগর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে গোপালপুর থানায় মামলা দায়ের করলে ২০১২ সালের ২ মে গ্রেফতার করে গোপালপুর থানা পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমান আদালতে ৩ মাসের জেল হয় নিখিলের। ২মাস ২৪দিন হাজতবাসের পর জামিনে বের হয়ে আসেন নিখিল। জামিনে বের হওয়ার পড়ে কিছুদিন পলাতক থেকে এলাকায় আসে সে। অজানা ভয়ে নিজের অংশের সম্পত্তি লিখে দেন দুই মেয়ের নামে। এরপর থেকে খুন হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত নিজের চলাফেরা সীমিত করে ফেলেন নিখিল। খুনের পর হত্যার বিষয় অন্যদিকে নিতে চলে অপপ্রচার। গুজব ছড়ানো হয় ভাতিজি স্বর্ণার প্রাক্তন স্বামীর মিথ্যা হুমকির বিষয়। এবিষয়ে স্বর্ণার মা পুতুল রানী জোয়াদ্দার বলেন, মেয়ের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর স্বামী মারা গেলে বর স্বর্ণাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে পরিবারের চাপে বিয়ে করলেও তাদের মধ্যে কোন বৈবাহিক সম্পর্ক ছিলো না। বিয়ের কয়েক দিন পর বরের ব্যবসায় অনেক বড় মার খায়। এতে ওই পরিবারের মধ্যে বিশ্বাস জন্ম নেয় আমার মেয়ে অপয়া।
আর বিয়ের তিন মাসের মধ্যে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমরা অনেকবার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে চাইলেও তারা আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি আমরা যতোটাকা পণ দিয়েছিলাম তারা আরো বেশি আমাদের ফেরত দিয়েছে। এতো বছরে যে ছেলে কোনদিন খোঁজ নেয়নি সে কেন হুমকি দিবে আমার মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে? তাছাড়া ওই বিবাহের সময় ও ছাড়াছাড়ির কোন বিষয়েই নিখিল দাদা উপস্থিত ছিলো না। এছাড়াও গুজব ছড়ানো হচ্ছে পারিবারিক কলহ ও জমি সংক্রান্ত বিরোধের কথা। কিন্তু সরেজমিনে প্রতিবেশী সফিকের সাথে দু’মাস আগে বাঁশঝাড় নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটি ছাড়া আর কোন বিষয় জানাতে পারেনি পরিবার ও স্থানীয়রা।
হত্যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কথা: এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে ডুবাইলসহ এর আশেপাশের মানুষ হতবাক হয়ে গেছেন। একেক মানুষ জানাচ্ছেন একেক ধরণের প্রতিক্রিয়া। রবিবার সকালে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে আসেন কৃষক শ্রমিক লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। তিনি এসময় সরকারের কাছে দ্রুত হত্যার রহস্য উদঘাটন ও জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি না খেলার আহবান জানান।এছাড়াও সমবেদনা জানাতে আসেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের গোপালপুর থানা সভাপতি হরিপদ দে মঙ্গল। তিনি বলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন বলছেন আইএস নাই, তাহলে আমরাও বলছি আইএস নাই। তবে এটা কিসের আলামত ?
আমরা হত্যকাণ্ডের ধরণ দেখে চিন্তিত। আমরা বিচার চাই না, নিরাপত্তা চাই। নিহতের শ্যালক অমল ভৌমিক বলেন, একদিনের পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। দিদি জামাই বাবুকে সবসময় নজরে নজরে রাখতো। শুধুমাত্র রান্নার করার এই সময়টুকো দিদি বাড়িতে থাকতো। খুনিরা ওই সময়টাই বেছে নিয়েছে তাকে হত্যা করতে।
নিখিলের হত্যাকাণ্ডে আইএস’র দায় স্বীকার ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকার বলেন, এবিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না। আইএস’র কোন অস্তিত্ব নেই।
এদিকে নিখিলের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। নিখিলের লাশ পোস্টমর্টেম শেষে সৎকারে নিজ বাড়িতে আনা হলে এক নজর দেখার জন্য শ’শ মানুষের ভীড় জমে যায়। এসময় পরিবারের লোকজনের আহাজারীতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। লাশবাহী গাড়ী চলতে থাকে শশ্মানের দিকে। বড় মেয়ে কবিতা বারবার বলতে থাকে ‘ডুবাইলের মানুষ এবার তোমরা খুশি হও’। আর স্ত্রী আরতি মূর্ছা যেতে যেতে দুই হাত উপরে তুলে বলেন ‘উপরওয়ালা শেষবার মুখটাও দেখতে দিলানা, তোমার কাছেই বিচার দিলাম’।







