‘নিজেকে ছোট না ভেবে নিজেকে গড়ে তোলো, তাহলেই সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে’, নতুন প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের প্রতি এই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার ২৭ জুলাই বিকেলে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারো, তাহলেই আমরা ভবিষ্যতে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—গ্যালারিতে যে হাজার হাজার ছোট বন্ধুরা তোমরা বসে আছ, তোমাদের মধ্য থেকেই এই দেশের ভালো ডাক্তার, ভালো স্থপতি, ভালো প্রকৌশলী, ভালো ক্রিকেটার, ভালো সাঁতারু ও ভালো টেনিস খেলোয়াড় তৈরি হবে।
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্য থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রের সেরা খেলোয়াড় ও গুণী ব্যক্তিত্ব বের হয়ে আসবে। আজ তোমরা সেটিই প্রমাণ করে দেখিয়েছ। তোমাদের মধ্য থেকেই এমন ভালো মানুষ তৈরি হবে, যারা এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কাজেই নিজেকে কখনো ছোট ভাববে না, নিজেকে বড় করে গড়ে তুলতে হবে। তুমি যত শক্তভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে, তোমার বাংলাদেশকেও তত সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারবে।

গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিডিয়ার ভাই যারা এখানে উপস্থিত আছেন—সেটি ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়া যাই হোক—আপনাদের এবং আপনাদের সম্পাদকদের কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। আমরা সব সময় দেখি, পত্রিকায় বা খবরে বিভিন্ন বিষয়কে হাইলাইট বা ‘লিড নিউজ’ করা হয়। তবে আজ আপনারা যে ইভেন্টটি দেখে গেলেন, সেটিই মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তিনি আরও বলেন, ‘যারা প্যান্ডেলের নিচে বসে আছে, যারা গ্যালারিতে বসে আছে তারা হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, যত খবরই থাক না কেন, আগামীকাল আপনাদের পত্রিকা ও সম্প্রচারমাধ্যমে এই শিশুদের খেলার সংবাদটি যেন ‘লিড নিউজ’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। আশা করি, আজকের রাতের সংবাদে ও আগামীকালের পত্রিকায় আমাদের এই ভবিষ্যৎদের সুন্দরভাবে তুলে ধরবেন।
দেশের সমস্যা ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আমাদের বাংলাদেশে অনেক সমস্যা রয়েছে, আমরা তা অস্বীকার করছি না। তবে এই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা দেখছি—বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে কোথায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা জানি, বহু স্কুলে এখনো প্রয়োজনীয় সুব্যবস্থা নেই; অনেক শ্রেণিকক্ষে হয়ত ফ্যানও সঠিকভাবে চলে না। আপনাদের এই সরকার সেসব সমস্যা দূর করতে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে বিদ্যালয়গুলোকে ধাপে ধাপে আরও উন্নত করে গড়ে তোলা যায়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার এই কাজ তখনই সার্থক হবে, যখন গ্যালারি ও সামনের সারিতে বসে থাকা তোমরা নিজেদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারবে। আজকের এই নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ইভেন্ট থেকে আমি তোমাদের কাছে একটি অঙ্গীকার নিতে চাই—তোমরা যদি নিজেদের গড়ে তোলো, তবেই আমরা একযোগে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

‘বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে কে কে কাজ করবে?’—অনুষ্ঠানে উপস্থিত কিশোর-কিশোরীদের কাছে এমন প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী তাদের জবাব জানতে চান। তিনি বলেন, কারা আমার সঙ্গে আছ, কারা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাও—হাত তোলো। এ সময় পুরো গ্যালারির হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী একযোগে হাত তুলে সম্মতি জানালে প্রধানমন্ত্রী তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। পড়াশোনা ও খেলাধুলার প্রতি গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পড়ার সময়ে মন দিয়ে পড়তে হবে, আর খেলার সময় একইভাবে মনোযোগ দিয়ে খেলতে হবে। পরিবেশবান্ধব দেশ গড়ার বিষয়ে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশটা আমাদের সবার। এই দেশের আলো, বাতাস ও পরিবেশ যদি আমরা সবাই মিলে ঠিক রাখি, তবেই আমরা একটি সুন্দর পরিবেশে বাঁচতে ও পড়াশোনা করতে পারব। তিনি আরও বলেন, তোমাদের কাছে আমার একটি বিশেষ অনুরোধ—রাস্তায় বা বাসার আশপাশে, এমনকি পুকুর-নদীনালায় কাউকে প্লাস্টিকের বোতল বা ময়লা ফেলতে দেখলে তোমরা তাকে বারণ করবে। প্রয়োজন হলে সেই ময়লাটি তোমরা নিজেরা তুলে নিয়ে নির্ধারিত স্থানে ফেলবে।
নদী-পুকুরের পরিচ্ছন্নতা ও বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যুক্ত করেন, কেউ জলাশয়ে ময়লা ফেললে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করবে, যাতে নদী ও পুকুরের পানি পরিচ্ছন্ন থাকে এবং মানুষ তার পাড়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারে। এছাড়া আমার আরেকটি চাওয়া হলো—তোমরা প্রতিবছর বাড়ি বা স্কুলের আশপাশে অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে। আমরা যদি গাছ লাগাতে পারি, তবে আমাদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন হবে এবং আমরা সবাই বুক ভরে বিশুদ্ধ শ্বাস নিতে পারব। শিশুদের সার্বিক বিকাশে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তোমাদের পাশে আছি। তোমরা যারা পড়াশোনা করতে চাও, সরকার থেকে আমরা সেই ব্যবস্থা করব যাতে সবাই ভালোভাবে পড়ালেখা করতে পারো। এছাড়া যারা গান গাইতে, ছবি আঁকতে কিংবা খেলাধুলা করতে চাও—সরকারের পক্ষ থেকে তোমাদের সব ধরনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়ে তিনি আরও বলেন, তবে তোমাদের সঠিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আজ তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তোমরা যদি নিজেদের যোগ্য করে তোলো, তবেই আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। এই গড়ার কাজ হয়তো আমরা শুরু করেছি, কিন্তু একে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল দায়িত্ব তোমাদেরই।
অনুষ্ঠানে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ও বিজয়ীদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে খুদে খেলোয়ারদের অভিভাবকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিযোগিতায় এই পর্যন্ত আসার ক্ষেত্রে সন্তানদের পেছনে যাদের অবদান রয়েছে—সেই বাবা-মা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সহায়তাকারী কোচদের আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অনুষ্ঠানে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে ফুটবলের ফাইনালে বিজয়ী দল বালকদের মধ্যে সিলেট অঞ্চল এবং বালিকাদের মধ্যে রংপুর অঞ্চল। বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেন এবং প্রতিযোগিদের হাতে ক্রেস্ট –মেডেল ও চেক প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৫-২৬ সমাপনি অনুষ্ঠান হয়। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলম বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ছাড়া অর্থমন্ত্রী মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ, মীর হেলাল, সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ছিলেন।
এর আগে গত ২ মে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আঞ্চলিক পর্যায়ে সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ক্ষুদে ক্রীড়াবিদ আটটি ডিসিপ্লিনে ধারাবাহিক প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়। জাতীয় পর্বের খেলাগুলো হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন ভেন্যুতে।

